ওসাকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৈশাখী মেলা ১৪৩৩
জাপানের ওসাকায় প্রবাসের মাটিতে বাঙালিয়ানার এক অনন্য জাগরণ—প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে আয়োজিত হলো নববর্ষ বরণ ও বৈশাখী মেলা। ওসাকার সেনরি মিনামি পার্কে গত ২৬ এপ্রিল বিপুলসংখ্যক অংশগ্রহণকারীর সমাগমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবের উচ্ছ্বাস আর গভীর আবেগের ঢেউ। “কানসাই বৈশাখী মেলা কমিটি”-র সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই আয়োজনটি পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
গানে, নাচে, আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের রঙিন আয়োজনে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। প্রবাসের দূরত্ব ভুলে সবাই যেন ফিরে গিয়েছিল নিজের শিকড়ে—বাংলার চিরচেনা নববর্ষের সেই আবহে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ—সবাই অংশ নেন আনন্দের এই মিলনমেলায়, যা প্রবাসে বসেও এক টুকরো বাংলাদেশের অনুভূতি এনে দেয়।
ওসাকা জাপানের একটি প্রিফেকচার বা প্রশাসনিক বিভাগ। ওসাকার পাশাপাশি আশপাশের বেশ কয়েকটি প্রিফেকচার নিয়ে গঠিত অঞ্চলটি সম্মিলিতভাবে ‘কানসাই’ রিজিয়ন নামে পরিচিত। হিরোশিমা, টোকিও বা ফুকুওকার মতো বিখ্যাত শহরগুলোর তুলনায় কানসাই অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী হওয়ায় এখানে একটি সর্বজনীন বৈশাখী উৎসবের আয়োজন দীর্ঘদিন ধরে সময়ের দাবি ছিল।
ওসাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রী। পাশাপাশি রয়েছেন চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও গবেষকেরা। প্রবাসী এই কমিউনিটির সঙ্গে রয়েছে নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। মূলত তাদের কথা বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশের ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং প্রবাসে নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়।
এ অঞ্চলে এত বড় পরিসরে বাংলাদেশিদের সমাবেশ এই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়। ফলে সব বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে এবং শিশু-কিশোরদের আনন্দমুখর উপস্থিতিতে ওসাকার মিনামি সেনরি পার্ক পরিণত হয় এক উৎসবমুখর মিলনমেলায়। গানে, নাচে ও বাঙালি ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমাহারে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। অনেকের কাছেই এ আয়োজন যেন এক মুহূর্তের জন্য ঢাকার রমনার বটমূলের আবহ ফিরিয়ে আনে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জাপানি নাগরিকের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
অনুষ্ঠানের সূচনাতেই বাংলার বর্ষবরণের চিরায়ত আবেশে আসা সবাইকে আপ্যায়ন করা হয় পান্তা-ইলিশের অনন্য স্বাদে। সঙ্গে ছিল ভালোবাসায় মাখা ব্রকলিভর্তা, আলুভর্তা, শুকনা মরিচ আর সবার প্রিয় শুটকিভর্তা—যেন প্রতিটি পদেই লুকিয়ে ছিল আপন ঘরের ছোঁয়া। হাতে হাতে পান্তা-ইলিশের প্লেট আর সাউন্ড সিস্টেমে ভেসে আসা ‘এসো হে বৈশাখ’-এর মন্ত্রমুগ্ধ সুর এক অপূর্ব আবহ তৈরি করে। সেই সুরের মায়ায়, সেই স্বাদের টানে, যেন বিগত বছরের সব কষ্ট আর গ্লানি মিলিয়ে যায় দূর আকাশে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে, এই মিলনমেলা সবার মনে জাগিয়ে তোলে নতুন করে শুরু করার স্বপ্ন, ভালোবাসা আর এক অনির্বচনীয় আশার আলো।
এরপর জাতীয় সংগীতের গম্ভীর অথচ আবেগঘন সুরে সূচনা হয় সাংস্কৃতিক পর্বের। সেই পবিত্র আবহে, এ অঞ্চলের প্রখ্যাত শিল্পী রুমি খন্দকার-এর সুরেলা কণ্ঠে গানগুলো যেন হৃদয়ের গভীরে নরম করে ছুঁয়ে যায়। গানে গানে, নৃত্যের মুগ্ধতায় আর সম্মিলিত পরিবেশনায় ধীরে ধীরে রঙিন হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন—একটি পরিপূর্ণ উৎসবের আবহে।
দ্বিতীয় পর্বে ছিল মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন। সুগন্ধি মাটন বিরিয়ানি ও পানীয় দিয়ে সবার আপ্যায়নে ছড়িয়ে পড়ে আন্তরিকতার উষ্ণতা। কানসাই–এর অন্যতম পরিচিত মুখ রফিক আজিজ এবং সাজ্জাদ হোসেনসহ সবার খাবার বণ্টন ও আতিথিয়েতা ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
জাপানি নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের অতিথিরা প্রথমবারের মতো এই স্বাদ আর সংস্কৃতির মেলবন্ধন অনুভব করেন, যা তাঁদের মনে রেখে যায় এক অনন্য স্মৃতি। খাবার শেষে র্যাফল ড্র ও উপহার বিতরণে যোগ হয় নতুন উত্তেজনা। হাসি, উচ্ছ্বাস আর ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্তে ভরে ওঠে চারপাশ। পরিশেষে কানসাই বৈশাখী মেলা কমিটির পক্ষ থেকে সবার প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় এই হৃদয়ছোঁয়া আয়োজনের। এ আয়োজনের পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ওসাকার সামাজিক পুরুষখ্যাত নিপুণ, সাজ্জাদ হোসেন, গায়ক ও সংগঠক রুমি খন্দকার, শ্রদ্ধেয়জন রফিক আজিজ, তরুণ সমাজের প্রতিনিধি মিরাজ হোসেন (বাইক), স্নেহের মিরাজ হাওলাদার, পৃষ্ঠপোষক জাহিদুর রায়হান প্রমুখ।
ভবিষ্যতে এই কমিটি আরও বৃহৎ পরিসরে এমন আয়োজনের মাধ্যমে প্রবাসে বাঙালির সংস্কৃতি, ভালোবাসা আর শিকড়ের টানকে আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর—যেন দূর দেশেও বাংলার বসন্ত চিরদিন এভাবেই হৃদয়ে ফুটে থাকে।