‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আচ্ছা, শুনেছি লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন প্রতিদিন মিলিয়ন মিলিয়ন যাত্রী বহন করে, তারপরও এখানে কি প্রায়ই এমন ধর্মঘট হয়?’
‘কি আর বলব, মাঝেমধ্যে এমনটাই ঘটে! আর তাতে যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়।’
আবির মনে মনে ভাবল, তাহলে তো পরিবহন ধর্মঘট শুধু বাংলাদেশেই না, বিশ্বসভ্যতার অন্যতম তীর্থস্থান লন্ডনেও ঘটে! যাহোক, আবির একটা দোতলা বাসে উঠে ফিন্সবুরি পাতাল রেলস্টেশনের উদ্দেশে রওনা হলো। সে দেখল, বাসটির সামনে ও পেছনে দরজা রয়েছে। সামনেরটি দিয়ে যাত্রীরা উঠে ভাড়া পরিশোধ করে, আর পেছনেরটি দিয়ে গন্তব্যে নেমে পড়ে। সে আরও দেখল যে বয়স্ক, বাচ্চাসহ মা-বাবা এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য সামনের দিকে নির্ধারিত আসন রয়েছে। এ ছাড়া বাসটি হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যাত্রীদের জন্য উচ্চতা কমাতে পারে যাতে করে তারা সহজেই বাসে উঠতে পারে। সে আরও দেখল, বাসচালকের পেছনে বড় আকারের ব্যাগ রাখার জায়গা রয়েছে, যেগুলো যাত্রীদের পক্ষে আসনের পাশে বা নিচে রাখা সম্ভব নয়। আবিরের খুবই ভালো লাগল বাসের এসব কাঠামোগত ডিজাইন দেখে এবং ভাবল, আহা, আমরাও কি বাংলাদেশে এমন ডিজাইনের বাস চালাতে পারি না! বাসের নিচতলাই যথেষ্ট ভিড় দেখে আবির উপরে উঠল এবং দোতলায় সামনের দিকে একটি বসার আসন পেয়ে নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করল।

স্টেশন এলাকা থেকে বাসটি চলা শুরু করার কিছুক্ষণ পরই আবির লন্ডন শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পেল এবং খুবই মুগ্ধ হলো আর মনে মনে ধন্যবাদ দিল আজকের ধর্মঘটকে। চারদিকে অনেক পার্ক, খেলার মাঠ, গাছপালা দেখতে পেল, যদিও শীতের কারণে ঘাসগুলো বাদামি রং আর গাছপালাগুলো পাতাহীন অবস্থায় ছিল। অধিকাংশ বাড়িঘর, দালানকোঠা বেশ পুরোনো, যা কিনা এ শহরের আদি ঐতিহ্য বহন করছে। আবির ভাবল, আহা, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে পার্ক, খেলার মাঠ, গাছপালা আর আদি ঐতিহ্য কেন যে আমরা দ্রুত হারিয়ে যেতে দিচ্ছি, এটা কি আমরা কোনোভাবেই ঠেকাতে পারি না!

অবশেষে আবিরের বাসটি ফিন্সবুরি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে পৌঁছাল। স্টেশনটি বেশ বড়। তাই খানিকটা সময় লাগল উডগ্রিন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনগামী বাসটির স্টপেজ খুঁজে পেতে। এরই মধ্যে আবির স্টেশনের বিভিন্ন জায়গায় লন্ডন পুলিশের লেখা নোটিশ দেখতে পেল, যেখানে লেখা ছিল, ‘পকেটমার থেকে সাবধান, কারণ, এরা এই এলাকাতে খুবই সক্রিয়।’ এমন লেখা আবিরকে একাধারে ভীত আর অন্যদিকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। তার পাশে দাঁড়ানো এক সহযাত্রীকে পকেটমারসংক্রান্ত নোটিশটি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘আচ্ছা, এটা কি লন্ডন পুলিশের ভদ্রতা, নাকি অপরাধ দমনের ব্যর্থতা! তারা যদি নিজেরাই ব্যর্থ হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ কীভাবে নিজেদের রক্ষা করবে!’
‘আপনি ভালোই বলেছেন। দিন দিন আইনশৃঙ্খলার যে অবস্থা হচ্ছে, তাতে করে লন্ডন তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে। আপনি যদি পূর্ব লন্ডনের কিছু জায়গায় যান, তবে আপনার কাছে অবস্থা আরও খারাপ বলে মনে হতে পারে।’

‘আমি তো এত দিন ভাবতাম, পুলিশের ব্যর্থতা শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা যায়!’
হঠাৎ কি মনে হলো, আবির দ্রুত প্যান্টের পেছনের পকেটে রাখা মনিব্যাগটা এতক্ষণে যথাস্থানে আছে, নাকি হাওয়া হয়ে গেছে পরীক্ষা করল। মনিব্যাগটার উপস্থিতিতে সে খুশি হলেও, সেটাকে সে তখনই প্যান্টের সামনের পকেটে নিয়ে এল। তার এ অভ্যাস আজকের নয়, এটা বহুদিনের। কেননা বাংলাদেশে যখনই বাসে চলাফেরা করত, তখনই এটা করত। আজ সে সত্যিই খুশি, কারণ, তার পুরোনো অভ্যাস লন্ডন শহরেও বাসে চলাফেরা করতে কতটা উপকারী।

প্রায় ১৫ মিনিট অপেক্ষার পর আবির একটা উডগ্রিন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনগামী দোতলা বাসের দেখা পেল। বাসে উঠে সে দ্রুত দোতলায় চলে গেল। একেবারে সামনের দিকে সে দেখল একটাই আসন ফাঁকা, তা-ও আবার একবারে বাংলা ভাষায় যাকে বলে অষ্টাদশী শ্বেতাঙ্গিনী তরুণীর পাশে। মনে মনে খুশি হলেও আবির অনুমতি নিয়ে তরুণীর পাশে বসল। বাসে সে দেখল অনেক যাত্রী ম্যাগাজিন, বই বা খবরের কাগজ পড়ছে আবার কিছু যাত্রী সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত। অধিকাংশ যাত্রীর আলাপের মূল বিষয় ছিল,‘আজকের আবহাওয়া’। সেই সূত্র ধরেই আবির তরুণীকে প্রশ্ন করল—
‘আচ্ছা, এই ফেব্রুয়ারিতে কি সব সময় আজকের মতো সুন্দর তাপমাত্রা আর রোদেলা আকাশ দেখা যায়?’

‘আরে না না, অধিকাংশ সময়ই আকাশ থাকে মেঘে ঢাকা, মাঝেমধ্যে বৃষ্টি, আর ঝোড়ো হাওয়া’

‘তাহলে তো আমি সত্যিই ভাগ্যবান। কারণ, লন্ডন আমাকে সুন্দর আবহাওয়া দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে।’

‘আপনি তাহলে লন্ডনে নবাগত?’
‘দেখছি, আপনি তো ঠিকই ধরেছেন!’

আবির তরুণীর সঙ্গে আলাপ বেশ উপভোগই করছিল। কিন্তু সে হঠাৎ খেয়াল করল শুধু তার বাসই না কোনো যানবাহনই রাস্তায় নড়াচড়া করছিল না। আবির এটাতে খুবই অবাক হলো এবং তরুণীকে আবারও জিজ্ঞাসা করল,
‘আচ্ছা, আপনাদের লন্ডনে কি প্রায়ই এ রকম যানজট হয়?’
মৃদু মাথা নেড়ে তরুণী বলল,
‘ইদানীং এ ধরনের যানজট প্রায়ই ঘটে আর আমরা লন্ডনবাসীরা এতে খুবই বিরক্ত। তবে আজ যানজটটা একটু বেশি আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মচারীদের ধর্মঘটের জন্যে।’
‘আচ্ছা, এ সমস্যার কি কোনো সমাধান নেই?’

‘লন্ডন কর্তৃপক্ষ চিন্তাভাবনা করছে যে শহরে ব্যক্তিমালিকানাধীন বা বেসরকারি যানবাহন প্রবেশের ক্ষেত্রে দিনের বেলা যানজট বাবদ অর্থ প্রদান করতে বাধ্য করা হবে। এটা করতে পারলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এ ধরনের যানজট কমতে পারে।’
‘সত্যি বলতে কি, আমি গত কয়েক বছরে এশিয়ার বেশকিছু বড় শহরে যেমন কুয়ালামপুর, ব্যাংকক, দিল্লি, কলকাতা, হায়দরাবাদ গিয়েছিলাম, সবখানেই অফিস শুরু আর শেষ হওয়ার পর বেশ যানজট দেখেছি। তাই ভাবতাম, যানজট হয়তো এশিয়ার সমস্যা, এখন দেখছি তিলোত্তমা লন্ডনেরও কোনো ছাড় নেই!’

আবির ভাবল সত্যি তো আমরাও যদি ঢাকা শহরে দিনের বেলা বিশেষ করে অফিস শুরু আর শেষ হওয়ার পরপরই ব্যক্তিমালিকানাধীন বা বেসরকারি যানবাহনের ক্ষেত্রে যানজট বাবদ অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে পারি, হয়তো আমাদেরও যানজট অনেকাংশে কমতে পারে। আমাদের উচিত গণযোগাযোগ ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানো আর জনগণকে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত করা। এ ছাড়া আমরা সিঙ্গাপুরের মতো ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি বা বেসরকারি যানবাহনের ক্ষেত্রে সনদের ব্যবস্থা করতে পারি, যা কিনা শহরের রাস্তার বহন ক্ষমতার সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণতা বজায় রাখবে।

যাহোক, বাস যেমন চলছিল শামুকের গতিতে আর তেমনি গতিতে চলছিল আবির আর তরুণীর আলাপচারিতা। হঠাৎ তরুণীটি রাস্তার পাশে একটা আধা পোড়া চারতলা ভবন দেখিয়ে আবিরকে বলল,
‘জানেন, ভবনটি একটি নির্মম ধর্মঘটের শিকার।’
‘তাই নাকি! একটু খুলে বলুন তো।’

‘কয়েক মাস আগে, একদিন ফায়ার সার্ভিসের কর্মচারীদের ধর্মঘট চলছিল। আর সেদিনই এই ভবনে কোনো এক ইলেকট্রিক তারের সংযোগ থেকে আগুন লেগে যায়। ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করা হলো, কিন্তু বিধিবাম! তারা তো ধর্মঘটে ব্যস্ত! তাই বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য এল এই অবস্থা সামলাতে। কিন্তু তাদের হাতিয়ার হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি, যা দিয়ে দোতলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাই তারা আগুন নিভাতে আংশিক সফল হয়। ফলে ভবনটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মন্দের ভালো যে, কোনো মানুষ ওই ঘটনায় মারা যাননি।’

‘সত্যি মর্মান্তিক। তা সেনাবাহিনী তো ফায়ার সার্ভিসের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারত, তাই না?’

‘অবশ্যই। তবে সেনাবাহিনীর তো ওই সব আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের না আছে প্রশিক্ষণ, না আছে অভিজ্ঞতা। আর এখানে প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো যন্ত্র ব্যবহার করার অনুমতি নেই।’

‘জানেন তো, আমার দেশ বাংলাদেশ যদিও ধর্মঘটের জন্য খুবই বিখ্যাত, তবু আমাদের ফায়ার সার্ভিস হরতাল বা ধর্মঘট ডাকতে পারে না।’

‘আমরাও মনে করি, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা যেন ধর্মঘট ডাকতে না পারেন।’
অবশেষে আবিরের বাসটি উডগ্রিন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে পৌঁছাল। বাস থেকে নামার সময় আবির তরুণীকে বলল,
‘আমি সত্যিই আপনার সাহচর্য উপভোগ করেছি। আপনার দিনের বাকিটা সময় ভালো যাক।’

‘আমারও আপনার সাহচর্য ভালো লেগেছে এবং বাংলাদেশের একজনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুবই খুশি হয়েছি। যাহোক, আপনার দিনের বাকিটা সময় ভালো কাটুক আর আপনার লন্ডনবাস শুভ ও আনন্দময় হয়ে উঠুক।’

তরুণীর সাবলীল আলাপচারিতা আবিরের এতটাই ভালো লেগেছিল যে সে ভাবছিল এর আগে কখনোই কি এমন সাবলীলভাবে কোথায়ও সে কোনো অপরিচিত তরুণী সহযাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে কিনা। এর আগে এমন কোনো ঘটনা অতীতে তার জীবনে ঘটেছে কি না, তা স্মরণ করতে ব্যর্থ হলো।

উডগ্রিন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে পৌঁছে আবির মনে মনে আনন্দিত হলো, কেননা, এটাই তার যাত্রার শেষ অংশ। এবারে সে একটা একতলা বাসে উঠল। কারণ লন্ডনের এই এলাকাতে জনবসতি তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এখানে দোতলা বাস চলাচল করে না। তবে সে লক্ষ করল, দোতলা বাসের সব বৈশিষ্ট্য যেমন বাসটির দুটি দরজা, বয়স্ক, বাচ্চাসহ মা-বাবা এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য সামনের দিকে নির্ধারিত আসন, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যাত্রীদের জন্য উচ্চতা কমানোর ব্যবস্থা, আর ড্রাইভারের পেছনে বড় আকারের ব্যাগ রাখার জায়গা রয়েছে। বাসে ওঠার পরপরই সে দেখল যে কিছু পথচারী পারাপার বাদ দিয়ে এলোপাতাড়ি রাস্তা পার হচ্ছিল। এটা দেখে তার আদৌ বিশ্বাস হচ্ছিল না। আর মনে হচ্ছিল, সে হয়তো স্বপ্ন দেখছে! কয়েকবার তাই হাত দিয়ে চোখ কচলিয়ে আশ্বস্ত হলো যে সে যা দেখছে সবই বাস্তব। কোনো রকম কল্পনা নয়! তার মনে হলো, বাংলাদেশে এভাবে রাস্তা পারাপার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, যা প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আজ তার মনে হলো, হয়তো ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকাতে এমনভাবে রাস্তা পারাপার আর দুর্ঘটনা একটি বৈশ্বিক ব্যাপার।

যাহোক, বাস চলতে শুরু করল আর আবির ভাবল, যাক অনেক হয়েছে এবার একটু আশপাশটা দেখা যাক। সে দেখল রাস্তাঘাটে গাড়ি-ঘোড়ার পরিমাণ তুলনামূলক কম, তাই সে ভাবল, এ ধরনের এলাকাতে বাসাভাড়া করবে, যাতে করে যানজটের দেখা মিললেও যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে। বেশ কিছুটা দূরত্ব পার হওয়ার পর আবির দেখল যে অধিকাংশ মূল রাস্তার মিলনস্থলে একদিকে পানশালা আর অন্যদিকে গির্জার অবস্থান। এটা দেখে সে মনে মনে ভাবল আহা, লন্ডনবাসীরা দেখছি বেশ ধর্মপ্রাণ।

যেমনি আমাদের ঢাকা শহরে প্রায় প্রতিটি মহল্লায় মসজিদ গড়ে ওঠা আমাদের ধর্মপ্রাণ জনগণের আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন। এরই মধ্যে বাসটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের স্টপেজে পৌঁছাল আর আবিরের মনের গভীর থেকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এল।

বাস থেকে নেমে খুব বেশি খোঁজাখুঁজি ছাড়াই আবির তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটির দেখা পেল। কিন্তু একি! এটা যে একটি বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিল্ডিংকে রূপান্তর করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সৃষ্টি! এর আগে আবির বিশ্বের অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গেছে, তবে কখনোই এ রকম ক্যাম্পাস সে দেখেনি। যাহোক, বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কা কাটাতেই হাতঘড়ির দিকে নজর দিল। দুপুর ১২টা বাজতে মাত্র মিনিট দশেক বাকি। সময় দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সে ক্ষুধা অনুভব করল। সেই সকাল সাড়ে ছয়টাই দিকে সে নাশতা খেয়ে বেরিয়েছে, আর এর মধ্যে কোনো দানাপানি পেটে পড়েনি। বিল্ডিং সর্বস্ব ক্যাম্পাসের এক কোণে সে ক্যাফেটেরিয়া দেখতে পেল এবং ভাবল আগে তো লাঞ্চ সারা যাক, তারপর ডিপার্মেন্টে গিয়ে রিপোর্ট করা যাবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। বেশ আরাম করে সে লাঞ্চ করল আর পরপরই সে এক কাপ দুধ-চিনি ছাড়া কালো কফিও পান করল। কফি পানের পরপরই সে হাতঘড়ি দেখে বুজল আর মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই লাঞ্চ সেরে সবাই যার যার ডেস্কে ফিরবে। সে অফিসের দিকে এগিয়ে গিয়ে ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজারের কক্ষে প্রবেশ করল। সে দেখল ম্যানেজারটি একজন মাঝবয়সী নারী, তারপরও সে দেখতে যথেষ্ট সুন্দরী, স্মার্ট আর কর্মপটু বলে মনে হলো। ম্যানেজার আবিরকে স্বাগত জানিয়ে বলল,
‘আমার মনে হয় আজ ধর্মঘটের জন্য আপনার এখানে আসতে খুব কষ্ট হয়েছে। যাহোক, আসুন আলাপচারিতার আগে যোগদান-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকঠাক করে ফেলি, নাহলে হয়তো আজকে আপনার যোগদান প্রক্রিয়াটা শেষ করা যাবে না।’

আবির মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। খুবই দ্রুত কর্মে যোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পূর্ণ করার পর ম্যানেজার নারীটি বললেন,
‘আগামীকাল আপনি সকালে অফিসে এসে মানবসম্পদ বিভাগে গিয়ে দেখা করবেন। তারা আপনাকে আরও অন্যান্য বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে। যাক, এবারে বলুন তো আমাদের ক্যাম্পাস আপনার কাছে কেমন লাগল?’

আবির যদিও হতাশ হয়েছে ক্যাম্পাস দেখে, তবু ও ভাবল এটা সরাসরি বলাটা হয়তো শোভন হবে না। তাই সে বলল,
‘হ্যাঁ, ভালোই। তবে একটা জিনিস আমার খুবই জানতে ইচ্ছা করছে।’
‘অনুগ্রহ করে বিনা সংকোচে বলুন।’

‘আসলে, আমার কৌতূহল এক বিল্ডিং এক ক্যাম্পাসের রহস্যটা কী?’
‘আরে এই প্রশ্ন? এর উত্তর আমাকে প্রায়ই দিতে হয়, বিশেষ করে লন্ডনের বাইরে থেকে আগত ব্যক্তিদের। সত্যি বলতে কী, এই লন্ডন শহরের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস হলো আমাদের মতোই এক বিল্ডিংয়ে। এর কারণ হলো, আমাদের গভর্নমেন্ট ১৯৯২ সালে একযোগে বহু পলিটেকনিক, ইনস্টিটিউট আর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করে। ফলে বড় বড় ক্যাম্পাস তৈরি করা একেবারেই অসম্ভব। বিশেষ করে লন্ডন শহরের সীমার মধ্যে। কেননা শহরে জমির সংকট রয়েছে।’
‘ও তাহলে জমির সংকটই মূল কারণ।’

আবির ভাবল, ইংল্যান্ডে জমির সংকট! তাহলে বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই সংকট তো আরও প্রকট! তারপরও কেন যে আমরা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির ক্ষেত্রে ঢাকায় একরের পর একরের জমির কথা বলি! এটা হয়তো নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঢাকা শহরের বাইরে পাঠানোর একটা প্রচেষ্টা হতে পারে। আবিরের ভাবনায় ছেদ পড়ল, যখন ম্যানেজারটি বললেন,
‘তো আবির, আপনাকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশা, এখানে আপনার কর্মকাল সুন্দর ও ফলদায়ক হোক।’

‘আমার বিশ্বাস, আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান ও ধারাবাহিক উন্নতিতে অবদান রাখতে পারব।’

‘আবার কাল দেখা হবে। দিনের বাকি সময়টাতে আপনি ভালো থাকুন’—এই বলে আবির সেই দিনের মতো ক্যাম্পাস ত্যাগের জন্য পা বাড়াল।

ক্যাম্পাসের বাইরে এসে আবির দেখল সূর্যটা অস্তাচলের প্রায় কাছাকাছি, অথচ হাত ঘড়িটা বলছে সময় তখনো বিকেল ৪টা বেজে ১০ মিনিট। আর তখনই মনে পড়ল মাধ্যমিক স্কুলে ভূগোল পাঠের কথা, উত্তর মেরুর কাছাকাছি দেশগুলোতে শীতের সময়ে সূর্য তুলনামূলক কম সময় আকাশে থাকে। যাহোক, আবির মনে মনে ভাবল, তার লন্ডনবাস যেন আগামী দিনগুলোতে নতুন নতুন জিনিস দেখার ও জানার সুযোগ এনে দেয়, যা কিনা তার বাকি জীবনের জন্য পাথেয় হয়ে উঠবে।