ভালোবাসার ওজন
মজনু কাজ থেকে ঘরে ফিরে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছে। কথা ছিল, আজ তুষারপাত হবে। কিন্তু তা হয়নি। নিজেই দরজা খুলে ভিতরে ঢোকে সে। স্ত্রী কে দেখতে না পেয়ে, তার নাম ধরে ডাকে। লাইলি রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল। মজনুর ডাক শুনে এগিয়ে আসে সে। মজনুর হাতে একগুচ্ছ গোলাপ দেখে চমকে ওঠে সে।
-বিষয় কী? তোমাকে বলেছিলাম, ঘরে ডিম প্রায় শেষ। আর তুমি আনলে ফুল!
-শোন লাইলি। ডিমের কথা ভুলে যাও। ট্রাম্পের এই জমানায়, আমেরিকায় ডিমের দাম সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে! তারপরে দেখ না, আরও কত কী হয়!
-আর তাই ফুল নিয়ে এলে বুঝি? তা, সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করে; ফুলের দাম আজ বুঝি সবচেয়ে কম?
-আরে নাহ্! তোমার কি মনে আছে আজ কী দিবস?
-কী দিবস আবার? কথা ছিল, তুষার পড়বে। আজ তুষার-দিবস হয়নি! আমাদের নিজেদের দিবসটিবসও পার হয়ে গেছে!
-তাহলে তো ভালোই হতো। কাজে যেতাম না। এবারের ভ্যালেন্টাইন ডে ভালো করেই উদ্যাপন করতাম।
-ও! আজ বুঝি তোমার ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’?
-হ্যাঁ গো! শুধু আমার নয়। তোমারও! আমাদের আজকের দিনটা শুধুই ভালোবাসার। এই নাও, তোমার জন্য একরাশ ফুলেল শুভেচ্ছা!
লাইলির হাতে ফুলের গুচ্ছ তুলে দিয়ে মজনু বলে, ‘আশ্চর্য! দিন শেষে তুমি আমাকে এই প্রশ্ন করছ? হ্যাঁ। আজ ভ্যালেন্টাইন ডে! আমাদের মতো বিশ্বের তাবৎ প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্যই এই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস!’ আচ্ছা, আমি ফ্রেশ হয়ে আসি আগে। তুমি গরম চায়ের ব্যবস্থা কর।’
-ধন্যবাদ তোমার ভালোবাসার জন্য। এখন আমি আমার পক্ষ থেকে, তোমার জন্য ভালোবাসার ব্যবস্থা করছি।
মজনু চলে যায় তাদের রুমে। এদিকে লাইলিও রান্না ঘরে ফিরে যায়। সে তার মোবাইলে ইন্দ্রাণী সেনের মোহনীয় কণ্ঠে ‘ভালোবাসি! ভালোবাসি!’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভলিউম বাড়িয়ে দেয়।
-বেশ তো ভালোবাসার মূর্ছনায় রাঙিয়ে দিলে ভ্যালেন্টাইন দিবসের সান্ধ্যকাল!
মজনু ড্রয়িং রুমে এসে বসে। সেও ইন্দ্রাণীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলায়, ‘এই সুরে, কাছে দূরে। জলে স্থলে বাঁজায় বাঁশি। দিগন্তে কার, কালো আঁখি। আঁখির জলে যায় ভাসি …!’
টেবিলের ওপর গরম চটপটি আর চা দেখে; আমোদিত হয় মজনু। সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘রবীন্দ্রসংগীত সহযোগে, গরম চটপটি, চা। বাহ্! ভালোবাসার দারুণ আয়োজন তো!’ লাইলি এসে মজনুর পাশে বসে। সে তার মোবাইলের বাটন টিপে ইন্দ্রাণীর কণ্ঠ মৃদু করে দেয়।
-শোন লাইলি!
মজনুর কথা শুনে তার চোখে, চোখ রাখে লাইলি।
মজনু বলল, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি। এই শুনছো, আই লাভ ইউ!’
লাইলি মোবাইল-ফোনে চোখ রেখে হেসে বলে, ‘বিশ্বাস করি না! আগে খাও তো।’
মজনু চটপটির বাটি হাতে নিয়ে, এক চামচ মুখে দিয়ে বলে, ‘ওহ্! দারুণ তো!’
-ধন্যবাদ।
-আমাদের ১২ বছরের দাম্পত্য-জীবনে, ভালোবাসা টের পাওনি তুমি?
বাঁকা হাসি মজনুর ঠোঁটে। ‘দাঁড়াও। আগে চটপটিটা শেষ করি।’
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে মজনু বলে, ‘আচ্ছা। তা বল, মজনু কী করলে, লাইলি বিশ্বাস করবে তুমি?’
-আমি লাইলি, তা কী করে টের পাবো, বল। মজনু, তোমার কাছ থেকে; তেমন কিছুই তো দেখতে পাইনি।
-কী বল! এই যে আমাদের দুটি সন্তান আছে। তারা কি আমাদের ভালোবাসার নিদর্শন না?
-না!
-না কেন? তা হলে তুমি কি বলতে চাও, তোমার আমার মধ্যে ভালোবাসা নেই? তুমি বল, এমনি এমনি করেই তারা আমাদের ঘর আলো করেছে?
-শোন। সন্তান তো সন্তানই।
-হ্যাঁ। আর সন্তান মানেই তো ভালোবাসা।
-তাই বলে, তুমি কি ভালোবেসে তাদেরকে দান করেছ?
-আমার ভালোবাসা না থাকলে, তুমি মা হতে পারতে না। ঠিক কি না?
-শোন। আমরা মা-বাবা হওয়া, সেটা অন্য বিষয়।
লাইলি বলে, ‘এখানে নিখুঁত, খাঁটি ভালোবাসা বলতে …।’
-হ্যাঁ। বলতে কিছু থাকে না। তাই তো?
-ইতিহাসে গল্পে সিনেমায়, তোমার ওই ভালোবাসার জন্য জীবন দেয়ার বিস্তর গল্প-কাহিনি আছে।
- তা তো জানি। আবার বাস্তবেও আছে অনেক।
-অনেক মানে?
-শুনেছ তো, মালেকা বানুর জন্য মনু মিয়া কেমন করে ট্রেনের নিচে জীবন দিল। মোবাইল ফোনে মালেকা বানুর সঙ্গে গল্প করতে করতে, দিন-দুনিয়ার কথা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিল সে। আর ওদিকে হুইসেল দিয়ে ট্রেন আসছে, তাও টের পায়নি মনু মিয়া।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার দম নেয় মজনু। সে বলে, ‘টিভিতে দেখেছি, মালেকা বানু বুকফাটা আর্তনাদ করে বলেছে, আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলাই হয়েছে তার কাল। এ কী করলাম আমি! কেন ওই কুক্ষণে কল করলাম মনু মিয়াকে!’
-তো? মনু মিয়ার এই দশার জন্য তো মালেকা বানু নিজেই দায়ী। ঠিক কিনা।
-তা তো অবশ্যই। আরে শোন না। আবার দেখ শাজাহান। সে মমতাজকে কেমন ভালোবাসল! সেও তার জীবন দিয়ে তার প্রমাণ দিল!
-তোমার ওই শাজাহান কী যেন করেছিল?
লাইলি বাড়িয়ে প্রশ্ন করে, ‘তার প্রেমিকা মমতাজের জন্য গলায় দড়ি দিয়ে, কচু গাছে ঝুলে পড়েছিল! নাকি?’
-আরে ধুর! মমতাজের সঙ্গে বিয়েতে, তোমার ওই শাজাহানের বাবা-মা রাজি হয়নি। তাই সে আর বিয়েই করেনি। কী আচানক! তার জীবনের সব উপার্জন ব্যয় করে।
-তাজমহল বানিয়েছে! এই তো?
-আরে নাহ্! এতিমখানা বানিয়েছে।
-তা তুমি পারবে?
-আবার জিজ্ঞেস করে। দুটিই পারব। তোমার জন্য, মরতেও পারব। আবার তোমার নামে ওই এতিমখানার; স্যরি তাজমহলের রেপ্লিকা লাইলিমহলও বানাতে পারব।
মজনু লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, ‘থাক বাবা। আবারও আমি বলছি, আই লাভ ইউ! আমি তোমাকে …। বিশ্বাস কর। আজীবন বলেই যাব।’
-ওগুলো তো, অতি সাধারণ সংলাপ। নাটক সিনেমায় চলে।
-তবে অসাধারণ সংলাপ; কী শুনতে চাও তুমি বল?
-বুঝেছি বাবা। তুমি যদি সত্যই আমাকে ভালোবেসে থাক, তবে আমি যা বলব, তা তোমাকে করতে হবে।
-হ্যাঁ। তাই করব আমি।
-সত্যি?
- একদম সত্যি।
-পারবে তো?
-কেন নয়? বললাম তো, তোমাকে আমি ভালোবাসি। বিয়ের ১২ বছর পর তার প্রমাণ যখন চাইছ …! প্রয়োজনে যে কোন ত্যাগই স্বীকার করতে পারি। তোমার জন্য, মরতেও পারি! হ্যাঁ!
-আচ্ছা ঠিক আছে। তো বলি?
-বল।
-আমার বড় ভাই মাসুদকে তুমি যে পাঁচ লাখ ।
-ও সেই টাকা?
-হ্যাঁ। সেই টাকা।
-তা হলে পুরো পাঁচ লাখ, সুদাসল মিলিয়ে সে মিটিয়ে দিচ্ছে?
-না। দেবার কথা বলছি না। তার এই পরিস্থিতিতে; এখন সে দেবেই বা কীভাবে!
-শোন লাইলি। টাকাটা তো আমি নগদও চাইছি না। টাকা না পার, জমি দেবে। সোজা হিসাব।
-আমি বলছি।
-হ্যাঁ, বল।
-আমি বলছি কি, তুমি যদি সত্যই আমাকে ভালোবাস।
-তা হলে?
-তোমার সেই টাকাটা।
-লাইলি! আমাদের ভালোবাসাকে তুমি; অর্থমূল্যের আকার আয়তনে ওজন করবে কেন? এখানে টাকার প্রসঙ্গ কেন?
-তুমি তো বলেছ, আমি যা করতে বলবো।
-বুঝেছি। তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে আমি টাকাটা নিয়ে, আমাদের পরিবারের প্রয়োজনে তা ব্যয় করি; তা তুমি চাও না!
-না। তা নয়।
-লাইলি। টাকাপয়সা প্রসঙ্গ, আমাদের দুজনের ভালোবাসার মধ্যে টেনে আনবে না। প্লিজ। আর শোন। আজ আমি তোমাকে বলছি, কোনো কিছুর বিনিময়ে সেই টাকার দাবি আমি ছাড়বো না! হ্যাঁ!
লাইলি লক্ষ করল, মজনুর দুই ঠোঁট কাঁপছে! চায়ের শূন্য কাপ, পিরিচের ওপর উল্টে রেখে মজনু বলে, ‘কারণ, তুমি ভালো করেই জানো তোমার ভাই মাসুদকে যখন টাকাটা দিয়েছিলাম, তখন আমাদের পরিস্থিতি কেমন ছিল!’
গা ঝাড়া দিয়ে লাইলি উঠে দাঁড়ায়।
-উঠলে যে! বসো লাইলি।
মজনুও দাঁড়িয়ে বলে, ‘আজ তো, ভ্যালেন্টাইন ডে! বিশ্ব-ভালোবাসা-দিবস!’
-না। কাজ আছে। থাকুক তোমার …!
লাইলি ঠোঁট বাঁকা করে বলে, ‘তোমার ওই ডে, দিবস সামনে আরও আসবে!’
-কিন্তু আমি যে বললাম, তোমাকে ভালোবাসি। আই লাভ ইউ। তার কী হবে?
-শুনলাম তো! কী আর হবে?
-তো!
-তো আর কী? তোমার ওই ভালোবাসার ওজন কত তা তো বুঝেছি!
-আই লাভ ইউ লাইলি! বিশ্বাস কর। সত্যি, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। জীবন দিয়ে!
-ওকে। থ্যাংকস! তোমার ওই শর্তহীন প্রাণপণ ভালোবাসার জন্য, লটস অব থ্যাংকস! ও বাপস! চুলায় আমার ডাল উপচে পড়েছে! তোমার বেশি ভালোবাসার ঠেলায় এতক্ষণ ঠিকই, ডালের বারোটা বেজে গেছে!
-যাও আগে তোমার ডাল সামলাও গিয়ে। তার আগে শুনে যাও, সত্যি আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি লাইলি! আমিও তোমার ভালোবাসার ওজন বুঝে গিয়েছি!
ততক্ষণে নিজেকে সামলাতে, রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে লাইলি।