স্মৃতিগদ্য: পদ্মার ঢেউ
মোশন সিকনেস, এয়ার সিকনেস, সি সিকনেস—এই তিনটাই মোশন সিকনেস। জন্মভূমি পদ্মার গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেছেন, একটা মানুষের তিনটা মা—জন্মভূমি, মাতৃভাষা ও গর্ভধারিণী। শ্বশুরজি বললেন, চলো, গ্রামের বাড়ি যাই, পদ্মায় সব নিয়ে যাচ্ছে। সস্ত্রীক শ্বশুরের সঙ্গে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সেটাই একমাত্র স্মৃতি। মাত্র দুই যুগের ব্যবধানে যাওয়া-আসার সেই স্মৃতিটাও আজ ঝাপসা হয়ে গেছে।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে আমরা তিনজন লঞ্চে উঠেছি। লঞ্চের ছাদের ওপরে ছোট্ট রুমটিতে বসেছি। এই ছোট্ট রুমটিকে আপার ক্লাস বলে। লঞ্চ কোনো ঘাটে ভিড়লে খাবার বিক্রেতাদের শব্দে লঞ্চ মুখর হয়ে ওঠে। ডিম শব্দটি ঢিম, ঢিম উচ্চারিত হয়। ঝালমুড়িই, চা-এ, আমড়া–আ। দুজনে ঝালমুড়ি খাই, চা একাই খাই। এরপর টাইটানিক ছবির নায়ক–নায়িকার মতো লঞ্চের মাথায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পারলে মজা হতো। ভাবলাম, চায়ের পর সিগারেট খেলে মন্দ হতো না।
পদ্মায় উথালপাতাল ঢেউ, লঞ্চ অনেক উপরে ওঠে আবার নিচে নেমে আসে। মনে হয়, রাগ করে তুলে একটা আছাড় দিল। ডানে বা বাঁয়ে কাত হতে গিয়ে এতটাই কাত হয় যে মনে হয়, এই বোধ হয় উল্টে গেল। লঞ্চ মিয়া হয়তো গাইছে—‘ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে, আমি নদীর ফুল গো।’ আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া অবস্থা আরকি! আমার কিছুই হয়নি, এমন ভাব নিয়ে সহধর্মিণী আমার বা হাত ঠেসে ধরে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। হয়তো ম্যাডাম মনে মনে জপ করে বলছেন, ‘আল্লাহ, মরলে যেন সহমরণ হয়।’ আমার ডানে শ্বশুরজি চোখ বন্ধ করে ভাবলেশহীন, পান চিবাচ্ছেন। তাঁর হৃদয় সুর তুলছে, ‘পদ্মার ঢেউরে, মোর শূন্য হৃদয়পদ্ম নিয়ে যা যা রে।’ আমি দোয়া ইউনুছ পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে বললাম, আব্বা, নেক্সট স্টপেজে নেমে যাই। আর যাব না। তিনি ধ্যানী বুদ্ধের মতো চোখ বন্ধ রেখেই বললেন, আরে, কিছু হবে না, বোসো। মা তুল্য জন্মস্থান দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করাটাই বোধ হয় ভুল হয়েছে, ‘ভুল সবই ভুল এই জীবনের পাতায় পাতায়।’
বিক্রমপুরের গাওদিয়া গ্রামে দাদাবাড়ি ও নানাবাড়ি পাশাপাশি। কাকতালীয়ভাবে আমার শ্বশুরবাড়ি এই একই গ্রামে। আমার দাদা-নানার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব ১৫ মিনিটের। বলা যায়, সবাই সবার পূর্বপরিচিত এবং একে অপরের সহপাঠী ও বন্ধু। বিয়ের আগে এই সবই আমার অজানা ছিল।
দাদাবাড়ি থেকে উচ্চ স্বরে গলা ছেড়ে কাউকে ডাকলে নানাবাড়ির উঠানে এসে পৌঁছায়। ওই সময়ে ওয়াকিটকি বা ইন্টারকম থাকলে গলার স্বরের পরীক্ষা দিতে হতো না। নানাবাড়ির উত্তর দিকে দাদাবাড়ি। দাদার বাড়ির পশ্চিম দিকের শেষ প্রান্ত দিয়ে হেঁটে নানার বাড়িতে নানার প্রতিষ্ঠিত মসজিদে ফজর নামাজ পড়তে যেতাম একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়। জুম্মার নামাজের পর অনেকেই বাতাসা বা গুড়ের পায়েস নিয়ে আসতেন। পায়েস খাবার জন্য ছোট ছোট কলাপাতার টুকরা সবার হাতে দেওয়া হতো। ডান হাতের তালুতে কলাপাতার টুকরা নেওয়ার পর তার ওপর পায়েস দেওয়া হতো। খেজুরের গুড়ের পায়েসের ঘ্রাণ মিছিল করে আমার পিছু নেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ক্লাস এইটের কিশোর। ছুটন্ত ঝরনার মতো বর্ষার পানি ছুটছে দাদাবাড়ির প্রবেশপথ বেয়ে। বন্ধুতুল্য বয়োজ্যেষ্ঠ জানে আলম (প্রয়াত) কাকা বললেন, ভাবির কাছ থেকে পুরোনো মশারি চেয়ে নিয়ে আয়, মাছ ধরব। মা হয়তো অপেক্ষায় ছিলেন, চাইতেই দ্বিধাহীন চিত্তে মা আমাকে মশারিটা কেটে টুকরা টুকরা করে দিলেন, যেন ‘চাহিবামাত্র বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’। মশারির কাপড় কঞ্চিতে বেঁধে ত্রিকোণাকৃতির কয়েকটি জাল বানিয়ে নিলেন কাকা। সন্ধ্যার মধ্যে ছোট বালতি, পাতিল ভরে উঠল ছোট ছোট মাছে। সন্ধ্যায় আজান হলে মা বললেন, সবার ঘরে গিয়ে মাছ দিয়ে আয়। সারা রাত বৈশাখী ঝড়, ভোরে আজানের পরই বড় চালের বস্তা ও ছোট বোন বেবীকে সঙ্গে নিয়ে ছুটলাম আম কুড়াতে। অন্ধকার মিলিয়ে যেতে যেতে দুটি বস্তা আমে ভরে উঠল।
চারদিকে পতনের শব্দ, পানির শব্দ, ভাঙনের শব্দ। পদ্মায় বাড়ি ভাঙছে। আমরা তিনজন খোলা, ছোট্ট কোষা নৌকায় এ-বাড়ি, ও–বাড়ি যাই। যে যতটুকু পারছে, ভাঙনের হাত থেকে সংসার, ঘর সরিয়ে নিচ্ছে। আত্মীয়দের ব্যস্ততা দেখি। শব্দহীনভাবে স্মৃতিরা ভিড় করছে আমার চারপাশে। কে যেন পিছু ডেকে জিজ্ঞাসা করছে, ভাঙন থামলে তুমি কি আসবে, কামাল আবার কবে আসবে?
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]