সিমরান

২০০০ সাল। সিমিন বাসা থেকে কাউকে কিছু না বলে আস্তে করে বের হলো। কেবলই ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে...বেশ দ্রুত হাঁটছে সে। অনেকক্ষণ ধরেই হাঁটছে তো হাঁটছেই, পথ আর শেষ হয় না...অনেকক্ষণ পর দূরে রেলস্টেশন দেখতে পেল। এর মধ্যে কতক্ষণ সময় গেছে, সে জানে না। কোথায় যাবে, তা-ও জানে না। জীবনের ওপর ভীষণ বিরক্ত সে। কিছুই ভালো লাগে না, কাউকে ভালো লাগে না। কেউ তাকে বুঝতেও পারে না, বুঝতে চায়ও না। সবার থেকে হারিয়ে যেতে মন চায়, দূরে...বহু দূরে।
স্টেশন একা দাঁড়িয়ে আছে সিমিন। ট্রেনের সময় দেখল। এক্ষুনি ট্রেন এসে পড়বে। বলতে বলতে ট্রেন এসেও পড়েছে। সিমিন ট্রেনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবছে, কেন তার সঙ্গেই বারবার এমনটা হয়। এখন সে কোথায় যাবে!

এই সকালেও চারপাশ বেশ কোলাহলে পরিপূর্ণ। অনেক শব্দ। সিমিনের কানে কিছুই যাচ্ছে না। সে ধীর কিন্তু দৃঢ়ভাবে বাঁ হাত দিয়ে ট্রেনের দরজার হাতল ধরে ডান পা বাড়িয়ে দিল ট্রেনের বগিতে ওঠার জন্য...ঠিক তখনই কে যেন পেছন থেকে তার ডান হাতটা ধরে ফেলল। খুবই বিরক্তি নিয়ে পেছন ফিরে দেখে ইমরান! দৌড়ে এসেছে, রীতিমতো হাঁপাচ্ছে।

ইমরান বলে উঠল, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ একা একা? আমিও যাব তোমার সাথে..., ঠিক আছে? যা বলার পরে বোলো, এখন না বলবে না প্লিজ...আমি বের হয়েছিলাম সকালে খেলার প্র্যাকটিসের জন্য, হঠাৎ দেখি তুমি বেশ দ্রুত হেঁটে কোথাও যাচ্ছ...তাই তোমাকে ফলো করছিলাম...’
অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সিমিন...
ইমরান তাদের বাসার দুই গলি পরে কোনো এক বাসায় থাকে। একসঙ্গেই পড়ে তারা। দুই-চারবার দেখা হয়েছে, কিন্তু আগে কোনো দিন কথা হয়নি...
ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল, সিমিন উঠে পড়ল ট্রেনে...সঙ্গে ইমরান।
সে শক্ত করে ধরে আছে সিমিনের হাত।

...
মাঝে কেটে গেছে ২২টি বছর।
২০২২
চারপাশে পাখিদের কিচিরমিচির আর ঘন সবুজ পাহাড়ের ঢালের উপত্যকায় বিকেলের নরম রোদে সবুজ ঘাসের বিছানায় সিমিন শুয়ে আকাশের মেঘ গুনছে। মেঘগুলোর আজ বেশ তাড়া, বেশ দ্রুতই দৌড়াচ্ছে যেন! গোনার আগেই হাওয়া, ঠিক জীবনের মতো।
পাশেই আধশোয়া হয়ে চশমা চোখে ইমরান খুব মনোযোগ দিয়ে কী একটা বই পড়ছে। ইমরানের এখন চশমা লাগে।
হঠাৎ সিমিন উঠে বসে বলল...
‘আচ্ছা, তুমি সেদিন আমার পিছু নিয়েছিলে কেন?
তুমি তো আমাকে আগে থেকে জানতে না!’
ইমরান বই থেকে মুখ তুলে সিমিনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘কী বলছ এসব...কবে আবার আমি পিছু নিলাম তোমার? আমি তো তোমার পাশেই থাকি সব সময়।’

সিমিন মুখে কিছুটা বিরক্তির ভাব নিয়ে বলল, ‘আরে ওই যে সেদিন...ভুলে গেলে! স্টেশনে এসে যে পেছন থেকে আমার হাত ধরলে...’
ইমরান এবার হেসে ফেলল, হাতের বইটা ঘাসের ওপর রেখে উঠে বসল। সিমিনের দুই হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘আমি তোমার হাত না ধরলে তো তুমি আমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে! আমাকে তাহলে কে শেখাত...
‘ছাতা ফেলে দিয়ে ঝুম বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বাড়িফেরা...মধ্যরাতে ঘুম ভাঙিয়ে খোলা আকাশের নিচে এসে তারা গোনা...শীতের সকালে উঠতে গিয়েও আবার হ্যাঁচকা টানে লেপের ভেতরে ঢুকে পড়া...পূর্ণিমার রাতে সব আলো নিভিয়ে দিয়ে চাঁদের আলোতে বই পড়া...অথবা এই যে ঘাসের বিছানায় শুয়ে শুয়ে মেঘ গোনা...আর তুমিইবা কার জন্য ভোরবেলা শিউলিতলা থেকে ফুল তুলে এনে মালা গাঁথতে, আমি ছাড়া আর কেউ ছিল?’
ইমরান মুখ হাসি হাসি করে তাকিয়ে আছে সিমিনের দিকে....
গভীর মায়ায় ভরা দুনয়ন...অপার রহস্যে ঘেরা...সিমিনের দুচোখে অশ্রুর ঝরনাধারা...
ইমরান এখনো ধরে আছে সিমিনের হাত অনেক শক্ত করে, ঠিক ২২ বছর আগের মতো।