যথাসময়ে জুরিখ ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরে নামলাম। সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত অন্য দুটি শহর হলো জুরিখ ও জেনেভা। বার্ন সুইজারল্যান্ডের রাজধানী। জুরিখের দিকের লোকেরা জার্মান এবং জেনেভার দিকের লোকেরা ফরাসি ভাষায় কথা বলেন।

বিশ্বের পর্যটকদের জন্য এটি বিশেষ আকর্ষণীয় একটি দেশ। দেশটির কোনো নিয়মিত সেনাবাহিনী নেই। দেশটির রাজনৈতিক অবস্থা ভারসাম্যমূলক ও অত্যন্ত সুস্থির। সুইস সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিবছর ১ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট পরিবর্তিত হয়। ছয় বছরের জন্য গঠিত মন্ত্রিপরিষদের একেকজন মন্ত্রী পালাক্রমে এক বছরের জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

সুইজারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে নয়; তবে সেনজেন কান্ট্রির সঙ্গে জড়িত। সুইস জাতি তাদের নিজেদের গতিতে চলছে। তাদের জীবনের মান নিঃসন্দেহে উন্নত পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায়। এখানকার সবকিছু খুবই ব্যয়বহুল তুলনামূলকভাবে অন্য দেশের চেয়ে। আমরা জুরিখে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির সঙ্গে দুপুরের খাবার সেরে জুরিখ থেকে ট্রেনে প্রথমে সুইজারল্যান্ডের বাসেল, পরে আমাদের গন্তব্যস্থল ফ্রাইবুর্গে পৌঁছালাম সন্ধ্যা আটটায়।

হোটেলে ঢুকে জিনিসপত্র রেখে ডিনারের জন্য শহরে বেরিয়ে পড়লাম। সেই ২৬ বছর আগে যেসব জায়গা ভালো লেগেছিল, সেসব জায়গা ঘুরে দেখা এবং শেষে ডিনার সেরে ফিরে এলাম হোটেলে।

দ্বিতীয় দিন

সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে এবং সারা দিনই হবে। আবহাওয়া খারাপের কারণে আমাদের প্ল্যানের পরিবর্তন করলাম। স্টেশনে এসে ফ্রাঙ্কফুর্টের টিকিট কিনতে দেখি সামারে ট্রেনে ভ্রমণ করা খুবই ব্যয়বহুল! কী করি ভাবছি! হঠাৎ মারিয়া বলল, গাড়ি ভাড়া করতে।

গাড়ি ভাড়া করলাম ফ্রাইবুর্গ থেকে সরাসরি ফ্রাঙ্কফুর্ট যেতে। ইউরো কার অফিসে বসে আছি। এক ভদ্রলোক হঠাৎ নিজের থেকে এসে পরিচয় দিয়ে বলল, ‘হাই, আমি মাইকেল, এটা আমার শহর। দুঃখিত যে তোমরা চলে যাচ্ছ, কাল এখানকার আবহাওয়া ভালো হবে। চলে যখন যাচ্ছই এবং তোমাদের যখন গাড়ি আছে, তাহলে ফ্রান্স হয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট যাও। পথে নতুন কিছু দেখতে পারবে এবং তোমাদের কোনো অতিরিক্ত সময় নষ্ট হবে না।’

মাইকেল থাকে আমেরিকায়। জার্মানি থেকে আমেরিকায় চলে গেলেও তার মা–বাবা এখনো ফ্রাইবুর্গেই থাকে, তাই সে প্রতিবছর এ সময় বাড়িতে বেড়াতে আসে। গাড়ি ভাড়া করার সময় সে আমাদের কথা শুনে জানতে পেরেছে, আমরা স্টকহোম থেকে এসেছি। তাই তার কৌতূহল জেগেছে আমাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার।

যা–ই হোক, মাইকেলের সাজেশন অনুযায়ী ফ্রান্সের কোলমার হয়ে যাত্রা শুরু করতে রাজি হয়ে গেলাম। কোলমার স্ত্রাসবুর শহর থেকে ৬৮ কিলোমিটার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে, রাইন নদী থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে ফ্রান্স-জার্মান সীমান্তের কাছে। ফ্রান্সের একটি ছোট্ট সুন্দর শহরটিকে ক্ষুদ্র ভেনিস বলা হয়। আঙুর চাষ ও ওয়াইন তৈরির জন্য বিখ্যাত। নিউইয়র্ক শহরের বিখ্যাত স্ট্যাচু অব লিবার্টির অর্থাৎ ‘মুক্তির মূর্তি’-র ভাস্কর ফ্রেদেরিক-ওগুস্ত বার্তোল্দি ১৮৩৪ সালে কোলমার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। কোলমার একটি নদীবন্দরও। এটি অনেক খালের মাধ্যমে রাইন নদীর সঙ্গে সংযুক্ত।

কোলমার ভ্রমণ শেষে ফ্রান্সের ভেতর দিয়ে গাড়িতেই পরের শহর সেলেস্তাত এবং শেষে স্টার্সবুর্গ আসতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। লাঞ্চ সেরে জার্মানের কার্লসরুহে হয়ে মানহেইম, তার পরে ফ্রাঙ্কফুর্টের উদ্দেশে রওনা দিলাম। বেশ লম্বা ভ্রমণ। তবে মজার ব্যাপার হলো, ফ্রান্স ও জার্মানি সীমান্তে তেমন কোনো চেকিংয়ের ব্যবস্থা নেই, দিব্যি ঢুকে গেলাম এক দেশ থেকে অন্য দেশে; আবার বেরিয়ে গেলাম কোনো কন্ট্রোল ছাড়াই। সারা দিন গাড়িতে বসে ফ্রান্স ও জার্মানির ছোট–বড় অনেক নতুন শহর দেখতে দেখতেই সময় পার হয়ে গেল।

যা–ই হোক, সারা দিনের সফর শেষে হাজির হলাম ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে। হোটেল বুকিং দিয়েছি বুকিং ডটকমের মাধ্যমে। ফ্রাঙ্কফুর্ট রেলস্টেশনের কাছে, কিন্তু গলিতে ঢুকতেই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। কারণ, রাস্তার দুই পাশে যৌনকর্মীদের আনাগোনা। মনটা খারাপ হয়ে গেল।

সঙ্গে সঙ্গে বুকিং বাতিল করে অন্য একটি হোটেলে ঢুকে গেলাম। নতুন হোটেল বেশ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন। হোটেলে ঢুকে চেকিংয়ের পর্ব সেরে চলে গেলাম ফ্রাঙ্কফুর্টের মাইন নদীর ধারে। সুন্দর সুন্দর ব্রিজ দেখতে পেলাম।

নদীর এপার–ওপারের মধ্যে অপূর্ব এক যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছে এই ব্রিজগুলো। নদীর দুই ধার দিয়ে যেমন শহর গড়ে উঠেছে, তেমন হেঁটে যাওয়ার জন্য সত্যি এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।

মারিয়া আর আমি হাঁটতে হাঁটতে বহুদূরে চলে এলাম; বলতে গেলে হারিয়ে গেছি বিশ্ববিখ্যাত মাইন নদীর মধ্যে। প্রসঙ্গত, রাইন ও মাইন—এ দুই নদী জার্মানির কবলেনজ শহরে মিলেছে, তারপর তাদের মিলিত ধারা ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের মধ্য দিয়ে মাইন নদী নামে বয়ে চলেছে এবং শহরটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তৃতীয় দিন

আজ আমাদের ছেলে জনাথানের খেলা। তাই সকাল হতেই রওনা দিলাম ভেটজলারের উদ্দেশে। ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দুরে। ৪০ মিনিট ড্রাইভের পর এসে পৌঁছে গেলাম ভেটজলার টেনিস ক্লাবে। জনাথানের খেলা শেষে বেরিয়ে পড়লাম শহর ঘুরতে।

জার্মানির এক শহর থেকে অন্য শহরের বেশ তফাত নানা বিষয়ে। গ্রীষ্মের সময়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো মেলা বসে এখানকার বিভিন্ন শহরে। এদের মেলার ধরন দেখে ছোটবেলায় বাংলাদেশের মেলার সঙ্গে কিছুটা মিল খুঁজে পেলাম। যেমন নেই কোনো দ্বন্দ্ব, নেই পুলিশ কিংবা নেই কোনো গোলমাল, বেশ মধুময় মিলনমেলা, যা দেখে সত্যিই মন ভরে গেল।

চতুর্থ দিন

ভেটজলার ছেড়ে চলে এলাম ভাইনহেমে। এদের অপূর্ব ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ। অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো, জার্মানদের সঙ্গে জমে উঠল আমাদের আড্ডা। সুইডেনের প্রতি জার্মান জাতির সব সময় আলাদা একটা দুর্বলতা রয়েছে, যা আমি এর আগেও লক্ষ করেছি। সুইডেন সম্পর্কে জানতে তাদের আগ্রহের শেষ নেই। এদিকে ভাইনহেমের আবহাওয়া কিন্তু ঠিক বাংলাদেশের মতোই, বিশেষ করে গ্রীষ্মে (সামারে), যা এই শহরে ঢুকতেই অনুভব করেছি। ভাইনহেম শহরটি ফুলে ফলে ভরা। জার্মানরা শুধু টেকনোলজি নয়, ফার্মিংয়ের ওপরও তাদের যথেষ্ট পারদর্শিতা রয়েছে; তার প্রমাণ এ শহরেই দেখলাম। বিশাল আয়তনের এ দেশ যেখানে কোনো কিছুরই অভাব নেই বলে মনে হলো। দেশ গড়ার পেছনে তাদের অবদান দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি।

পঞ্চম দিন

আমাদের ছেলের খেলা শেষ। সে আজ মিউনিখে চলে গেল; সেখানে তার আরেকটি খেলা রয়েছে। আর আমরা ফিরে এলাম ফ্রাঙ্কফুর্টে। ফ্রাঙ্কফুর্টই জার্মানির একমাত্র শহর, যা প্রথম ১০টি ‘আলফা ওয়ার্ল্ড সিটি’র একটি। মাইন নদীর তীরে গড়ে ওঠা মেলার শহর ফ্রাঙ্কফুর্ট যেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। পৃথিবীর বড় বড় ‘ইন্টারন্যাশনাল মোটর শো’, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইমেলা এবং সংগীতের বিভিন্ন সরঞ্জাম, লাইটিং, রেকর্ডিং এবং সাউন্ড রিইনফোর্সমেন্ট ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মেলা তাই এখানে চলছে আনন্দ আর উৎসব, যা দেখে আমার কিছুটা হিংসা হলো। কারণ, এরা এত সুখ–স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছে অথচ পৃথিবীর অনেক দেশেই এখনো মানুষের খাবার জোটে না।

দেশ–বিদেশে ভ্রমণে এতটুকু বুঝেছি, সেটা হলো জীবনে কিছু পেতে হলে দরকার কঠিন পরিশ্রম, সততা, নিষ্ঠা, সুশিক্ষা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সর্বোপরি দেশের পরিকাঠামো ও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা একটি বিশেষ দিক, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেসব জাতি সব বিষয়ে বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে, তাদের মধ্যে একটি জিনিসের খুব মিল, তা হলো পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা। জাপান, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জার্মানি উল্লেখযোগ্য।

ভ্রমণের শেষ দিনে ফ্রাঙ্কফুর্টের মাইন নদীর স্রোতের সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে বাংলাদেশের নদীগুলোর পরিবেশ যদি এমনটি হতো! কোনো নোংরামির চিহ্নমাত্র নেই। নদী ঝলমল, পানি টলমল এক পরিষ্কার নদীর দৃশ্য, যা মনে করিয়ে দিল ছোটবেলার নবগঙ্গাকে, যেখানে সাঁতার কেটেছি প্রতিদিন। তবে সত্যিই মাইন নদীকে দেখে মন ভরে গেল।

লেখক: রহমান মৃধা, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]