অকল্যান্ডের পথে
২০১৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ন্যাশভিল থেকে রওনা দিয়ে ১৩ তারিখ নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড পৌঁছাই। ফিজি এয়ারওয়েজে আমার ফ্লাইট-রুট ছিল ন্যাশভিল-লস অ্যাঞ্জেলেস-নন্দি-অবশল্যান্ড। ফিজিয়ানরা যদিও শব্দটাকে লেখে Nadi, কিন্তু উচ্চারণ করে নন্দি। নন্দি হলো ফিজির পর্যটনশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। আর তাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাজধানী সুভা–তে না করে, তারা করেছে নন্দি-তে। লস অ্যাঞ্জলেসে গিয়ে চেক-ইন করে সিকিউরিটি এরিয়া পার হয়ে যখন গেট এরিয়াতে হাজির হলাম, তখনো হাতে প্রচুর সময়। তিন ঘণ্টা লে-ওভার। এবারকার সফরের কথা আমার দুই মেয়ে নাজলা-নায়লাকে বলা হয়নি, তাই ভাবলাম ফোন সুইচ-অফ করার আগে তাদের অন্তত একটা টেক্সট করে যাই। দুজনের কাছে বার্তাটা এভাবে লিখে পাঠালাম। ‘Maamoni, Abbu is now in Los Angeles airport, waiting for the onward flight to New Zealand - the land of sheep, wool, and 'kewyee'. Did I spell it correct?'
কিছুক্ষণ পর নায়লা উত্তর দিল, ‘Have a safe trip, Abbu.’ ব্যস, নায়লার কথা সংক্ষেপে এখানেই শেষ। প্রায় সাথে সাথে পরপর নাজলার দুটো এসএমএস পেলাম। প্রথমটা আবেগ ও ভালোবাসামাখা- লিখেছে, ‘Abbu, you are the cutest, but you spelled 'kiwi' wrong!’ দ্বিতীয়টা অন্য রকম। এর মাঝে শাসনের একটা সুর আছে 'Abbu, why do you have to travel so much? Its not safe now a days! মেয়ে হলে কী হবে, মাঝেমধ্যে সে আমাকে এমনভাবে শাসায়, আমার মা-ও কোনো দিন আমাকে এভাবে শাসন করেননি। আমি মেয়ের শাসন খুব উপভোগ করি। এতে মজা পাই। তার কথা বেশির ভাগ সময় মানিও। প্রসঙ্গটি এখানেই এভাবে শেষ করে দিলে ছোট মেয়ে নায়লার প্রতি একটু অবিচার করা হয় বৈকি। তার টেক্সট অনুযায়ী, তাকে যতটা নীরস এবং আবেগহীন মনে হচ্ছে, আসলে তা কিন্তু ঠিক নয়। মা-বাবার প্রতি নায়লারও দরদ ও ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। তবে তার প্রকাশভঙ্গি একটু অন্য রকম। নায়লা যখন বাড়িতে আসে, তখন আমাদের জন্য ভালো উপহার নিয়ে আসে। কোনো সময় দুই বোনে শেয়ার করে কেনে। কোনো সময় তাদের বড় ভাই আসাদের কাছ থেকেও চাঁদা তোলে। একই মা-বাবার সন্তান, একই ঘরে, একইভাবে, একই সময়ে বড় হয়েছে, তবু তারা ভিন্ন। দুজনের মন ও মনন, ব্যক্তিত্ব ও প্রকাশের ধরন সম্পূর্ণরূপে আলাদাভাবে গড়ে উঠেছে। এটাই স্বাভাবিক। এটাই বাস্তবতা। এটাই আল্লাহর নিয়ম।
‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ক্রু আসতে দেরি হওয়ায় ফ্লাইট ছাড়ল নির্ধারিত সময়ের আধঘণ্টা পর। ফিজি এয়ারওয়েজে এটাই আমার প্রথম আকাশপথ পাড়ি দেওয়া। বিমানে আরোহণ করেই ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ। ফিজি মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের একটা ছোট্ট দ্বীপ দেশ। তারা ইন্টারন্যাশন্যাল রুটে সুন্দর একটা এয়ারলাইনস চালাচ্ছে। ধীরে ধীরে তাদের ফ্লিট বড় হচ্ছে। রুট প্রসারিত হচ্ছে। ব্যবসা স্ফীত হচ্ছে। মুনাফা বাড়ছে। অথচ আশ্চর্য, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ, আপন ন্যাশন্যাল ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ার, ‘বিমান’-কে চালাতেই পারছে না। ২০০৮ সালে আমি মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের একটা ফ্লাইটে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর গিয়েছিলাম। সেবার অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ করলাম, ফ্লাইটে একটা সিটও খালি নেই এবং প্রায় ৯৯ শতাংশ যাত্রীই বাংলাদেশি। এ রমরমা ব্যবসা কেন বিমান ধরতে পারল না, এ প্রশ্নের কোনো জবাব আমি কারও কাছে পাইনি।
বিমানে উঠে বসে থিতু হওয়ার পর দেখতে পেলাম পাশের সিটের সহযাত্রী এক তরুণ চৈনিক। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া-লস অ্যাঞ্জেলেসে (ইউসিএলএ) ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্র। ভাবলাম, লম্বা ফ্লাইট, তার সাথে গল্প করে অন্তত কিছু সময় ভালো যাবে। সেও যাচ্ছে অকল্যান্ডে মা-বাবার সাথে ছুটি কাটাতে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বেড়ানোর জন্য তুমি অকল্যান্ডকে বেছে নিলে কেন? সে বলল, ‘আমি নয়, ওটা আমার মায়ের পছন্দ। তারপর জানতে চাইলাম, আর কে আসবে? সে উত্তর দিল, ‘বাবাও আসবে। তোমার ভাই-বোন কেউ নেই? আবার আমার প্রশ্ন। এবার সে হেসে দিয়ে জবাব দিল, ‘তা কী করে হয়, তুমি জানো না আমাদের দেশের এক-সন্তান নীতির কথা?’ আমি বললাম, জানি। বলো তো নীতিটা কেমন? তার উত্তর শুনে একটু অবাক হলাম। মজাও পেলাম। সে বলল, ‘দেশের জন্য কেমন তা জানি না, তবে আমার কাছে অবশ্যই ভালো!’ আমিও মাথা নাড়লাম। কারণ, এক সন্তান হওয়ার জন্য একাই সে মা-বাবার আদর-যত্ন পুরোটাই পেয়েছে। আগামী দিনে তাদের রেখে যাওয়া বিষয়-সম্পত্তিও তাকে কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হবে না। আমার তরুণ সহযাত্রী আরেকটা কথা বলল, একা থাকার কেবল সুবিধাটাই সে ভোগ করেছে, একা হওয়ার একাকিত্ব তাকে কোনো দিন স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ সে একই জায়গায় তুতোভাইদের নিয়ে একসঙ্গে বড় হয়েছে।
বিমানে উড়ালকালে প্রায় সময় আমি হাঁটাহাঁটি করি। কিচেন এরিয়ার দিকে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। হাত–পা নাড়ি। হালকা ব্যায়াম করি। এবার দাঁড়িয়ে থাকার সময় এক ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলাম। তাকে বললাম, তোমাদের তো দেখতে আমাদের মতোই লাগে। তোমরা কি ভারতীয়? জবাব পেলাম, ‘না, আমাদের দেশে ভারতীয় আছে, তবে আমরা ভারতীয় নই, আমরা ফিজিয়ান; ভালো করে চেয়ে দেখো, আমার মাথার চুল কোঁকড়ানো। ভারতীয়দের চুল সোজা হয়। এ ছাড়া আমাদের নিজস্ব ভাষা আছে। সংস্কৃতি আছে। আমরা কেন ভারতীয় হতে যাব।’
বুঝলাম, ফিজিয়ান বলতে তারা বেশ গর্ব বোধ করে। তার কথা থেকে আরও জানলাম- ইদানীং তারা তাদের দেশের ট্যুরিজম এবং এভিয়েশন খাতের উন্নতির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সফলতাও পাচ্ছে। আরেকটা বিষয় আমি তার সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে প্রসঙ্গ আর ওঠাইনি। ছোটবেলা স্কুলে থাকতে ‘সুখ না দুঃখ’ শিরোনামে রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীয় এক প্রবন্ধে পড়েছিলাম, ফিজির আদিবাসীরা বাপ-মা বুড়ো হলে তাদের জবাই করে খেয়ে ফেলত। এ ছাড়া এক ফিজিয়ানের কাছে শুনেছিলাম, তাদের উপজাতীয় দলপতির মাথার চুল কেউ ছুঁয়ে ফেললে তাকেও তারা কেটে খেয়ে ফেলত। অনেক আগে তাদের দেশে এক ইংরেজ মিশনারির জীবনের পরিণতি নাকি এমনই হয়েছিল। এরা সেই নরখাদকদের উত্তরসূরি। ওই ফিজিয়ান ভদ্রলোক সেদিন স্বীকার করেছিলেন, তাদের দেশে ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ মিশনারিদের কাজ, মানুষের গোশত খাওয়া থেকে তাদের উত্তরণ অনেক সহজ ও ত্বরান্বিত করেছিল।
ফিজি এয়ারওয়েজের যাত্রীসেবা ও খাওয়াদাওয়ার মান আমার কাছে খুব সন্তোষজনক মনে হয়েছে। ফ্লাইটে মোটামুটি সময় ভালোই কাটল। প্রায় সাড়ে ১১ ঘণ্টা ওড়ার পর, স্থানীয় সময় সকাল পৌনে ছয়টার দিকে নন্দি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমরা নামলাম। নন্দি বিমানবন্দরে ট্রানজিট লাউঞ্জে যাওয়ার পথে সিকিউরিটি এরিয়াতে আমার একটা সমস্যা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ হাতের ব্যাগ তালাশ করে পায় একটা ধাতব চামচ। চামচখানা আমার খুব প্রিয় এবং প্রয়োজনীয়। ভ্রমণের সময় এটা সব সময়ই আমার সাথে থাকে। পৃথিবীর বড় বড় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে নির্দ্বিধায় পেরোতে পারলেও ফিজিতে এসে হতভাগা চামচখানা ধরা খেয়ে গেল। অত্যন্ত মামুলি হলেও চামচটা আমি কোনোক্রমেই হাতছাড়া করতে চাইনি। তাই এ ব্যাপারে আমি সিকিউরিটি অফিসারের সাথে সাধ্যমতো ওকালতিও করলাম, কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি। দেশের আইন সবার জন্য সমান। তিনি আমাকে চামচ নিয়ে এককদম এগোতে দেবেন না। তখন ওই অফিসারের কাছে আমি একটা অভিনব আরজি পেশ করলাম, Trivial, but yet it is very favorite to me. Please don't throw it away, use it. আমার কথায় হেসে দিয়ে সিকিউরিটি অফিসার ইতিবাচকভাবে মাথা নাড়লেন। তার অভিব্যক্তি যদি সত্যি হয়, তাহলে চামচ হারালেও একজন মানুষের মনে একটা স্থায়ী জায়গা করে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এ যাত্রা আমি খুশি মনে সিকিউরিটি এরিয়া থেকে বেরিয়ে এলাম।
এখানেও তিন ঘণ্টা লে-ওভার। লাউঞ্জে এসে ফজরের নামাজ সেরে এক আরামের ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখলাম চারদিকে দিনের আলো ফুটছে। এদিক–ওদিক তাকিয়ে লক্ষ করলাম, একটা নতুন দেশ। দেখতে ভালোই লাগল। সবই সুন্দর। সবই নির্মল। কতক্ষণ ফিজির পাহাড় আর প্রকৃতি দেখে এসে বসলাম। মনে হলো একটু খিদে পাচ্ছে। সাথে গাজর, কলা এবং আঙুর ছিল। সেগুলো খেলাম। কারণ এ বছরের এপ্রিল মাসে যখন সিডনি গিয়েছিলাম, তখন অস্ট্রেলিয়ান কাস্টমস ও তাদের কুকুর, হ্যান্ডব্যাগে তাজা গাজর পেয়ে একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল। তাই এবার সে রকম আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাইলাম না। ব্যাগের খাবার নিরাপদে পেটেই পুরে রাখলাম। এবার ফিজি বিমানবন্দরে আরেকটা বড় বিড়ম্বনা ঘটতে গিয়েও ঘটেনি। গিফট শপে গিয়ে ছোট্ট একটা স্যুভেনির কিনে ক্যাশিয়ার কাউন্টারে এসে ওয়ালেট খুলে দাম বের করে দিয়েছি। মেশিন কাজ করছে না, তাই সেলস গার্ল আমাকে এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে যেতে বললেন। আমি তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি রিসিটসহ জিনিসটা প্যাক করে হাতে তুলে দিলেন। এমন সময় আমার খেয়াল হলো এবং পকেটে হাত দিয়ে দেখি ওয়ালেট নেই! আমার তো মাথায় বাড়ি! নিশ্চয়ই ওই কাউন্টারে ওয়ালেট ফেলে এসেছি! এখন হবেটা কী? ওয়ালেটে ৭০০ ডলার, একাধিক ক্রেডিট কার্ড, আরও জরুরি কাগজপত্র! দুরু দুরু বুকে ভাবলাম, কোনো বোকা লোকের হাতে না পড়লে এটা আর পাওয়া যাবে না। ঠিক ওই সময় দেখি, দোকানের আরেকজন কর্মচারী ওয়ালেট হাতে নিয়ে আমার দিকে ধেয়ে আসছেন। আমি ওয়ালেট পেয়ে এত খুশি হলাম, টাকাপয়সা সব ঠিকঠাক আছে কি না, তা না দেখেই ওয়ালেট পকেটে পুরে রাখলাম। আমার চিন্তাশক্তি যখন একটু স্বাভাবিক হয়ে এল, তখন পরখ করে দেখলাম সব ঠিকঠাকই আছে। অকারণ ভাবনার দরকার নেই। মনে মনে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আবার মেয়েটার কাছে এসে তাকে বারবার ধন্যবাদ দিলাম। তার নাম জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘আশিকারা।’ আশিকারা আমার প্রাথমিক ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। সে বোকা নয়। সে একজন মানুষ। ভালো মানুষ। সৎ মানুষ। ফিজির নিরাপত্তা কর্মকর্তা যেমন আমাকে ভুলবেন না, তেমনি বাকি জীবনভর আশিকারার কথাও আমার মনে থাকবে। আরও ঘণ্টাখানেক পর অরল্যান্ডের পথে সমাপনী ফ্লাইটে গিয়ে ওঠার আগে আশিকারাকে আরেকটা ধন্যবাদ দিয়ে এলাম।
টেক–অফ এবং ল্যান্ডিংয়ের সময় নন্দি এবং অকল্যান্ডের দৃশ্যাবলি দেখার জন্য এ ফ্লাইটে উইন্ডো সিট নিয়েছিলাম। সেভাবেই গিয়ে জায়গামতো বসলাম। সিটবেল্ট কোমরে বেঁধে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছি—কীভাবে নীল সাগর, সবুজ পাহাড়ের সাথে এসে মিশেছে।
এমন সময় এক কলেজপড়ুয়া ভারতীয় তরুণ এসে বসল পাশের সিটে। হাতে নীল হ্যান্ড টাওয়েল, দেখে সন্দেহ হলো, কিন্তু কিছু বলিনি। যখন দেখলাম সে নাক টানছে আর তোয়ালে দিয়ে অনবরত নাকের পানি মুছছে, তখন অচেনা পাশের যাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি ফ্লু হয়েছে? বলল, ‘হ্যাঁ।’ যদিও আমার ফ্লু প্রতিশেধক ইজেকশন নেওয়া আছে, তবুও আমি কোনো ঝুঁকি নিতে চাইলাম না। যদি আমাকে ফ্লুতে ধরে, তাহলে কনফারেন্স আর করতে হবে না। জান নিয়েই পড়বে টানাটানি। আমি সাথে সাথে সিট ছেড়ে উঠে গেলাম। ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টকে গিয়ে বললাম, আমি ফ্লু রোগীর কাছে কোনোক্রমেই বসতে পারব না, আমার বিশেষ অসুবিধা আছে। আপনি দয়া করে একটা ব্যবস্থা করে দিন। ওই সময় গ্রাউন্ড ম্যানেজার বিমানের ভেতরেই ছিলেন। তিনি বললেন, ‘Sorry, flight is full, we cannot do anything.’ আমার মাথায় আবার বাড়ি! ম্যানেজার চলে গেলেন। বিমানের দরজাও বন্ধ হয়ে গেল। ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্ট বললেন, ‘দাঁড়াও, আমি দেখি, কী করতে পারি।’ তিন-চার মিনিট পর তিনি ফিরে এসে জানালেন, আরও পেছনে তোমার জন্য আয়ল সিটে একটা ব্যবস্থা হয়েছে।’ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বসলাম গিয়ে ওই আয়ল সিটে। জানালা দিয়ে বহির্বিশ্ব দেখা হলো না বলে আর কোনো আফসোস করলাম না। দূর থেকে যত দূর দেখা যায়, নয়ন ভরে তাই দেখলাম।
সময়মতো অকল্যান্ডে এসে নামলাম। ইমিগ্রেশন পার হয়ে এলাম কাস্টমস এরিয়াতে। আমি দাঁড়ালাম এক ভারতীয় অফিসারের লাইনে। যখন ডাক পড়ল, তখন হাতে একটা ব্রাউন ব্যাগে রয়ে যাওয়া কয়েক পিস কালো চকলেট এবং কয়েকটা রোস্টেড বাদাম তুলে দিয়ে বললাম, আমার কাছে আর কোনো খাবার নেই। তিনি বললেন, ‘শুকনা খাবারে কোনো সমস্যা নেই। তুমি যাও, সামনে মেশিনের ভেতর দিয়ে তোমার লাগেজ পাস করে সোজা বেরিয়ে যাও।’ মনে মনে স্বস্তি পেলাম, তবে চোখের সামনে পুলিশের সাথে কুকুর, আর তার হাতে কুকুরের ঘাড়ে বাঁধা দড়ি দেখে ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাঁৎ করে উঠল! এপ্রিলে সিডনি বিড়ম্বনার কথা মনে হলো। এসব কুকুর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তারা ঘেউ ঘেউ করে না। কাউকে কামড়ায়ও না। তবু তাদের দেখলে যমের মতো ভয় লাগে। এবার তো ভয়ের কোনো কারণ নেই। তবু যেন কিসের ভয়। ভয়ে ভয়ে স্যুটকেস এবং হ্যান্ডব্যাগ মেশিনের ভেতর দিলাম। নিরাপদে বেরিয়ে এল। এবার আমি মুক্ত!
বুক ফুলিয়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে, স্যুটকেস হাতে টেনে টেনে লম্বা কদমে বেরিয়ে যাচ্ছি। ওমা, দুই পা সামনে যেতে না যেতে দেখি, পেছন থেকে পুলিশ আমার হাত ধরে টানছে। আর কুকুর আমার হ্যান্ডব্যাগ ছাড়ছে না। নারী পুলিশ আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন মেশিনের কাছে। হ্যান্ডব্যাগ খুলে তন্নতন্ন করে ঘাঁটাঘাঁটি করে কিছু পেলেন না। তবে বের করে আনলেন তিনটা খালি প্লাস্টিকের স্যান্ডউইচ ব্যাগ। আমাকে বললেন, ‘এগুলোর মধ্যে কী ছিল?’ আমি বললাম, গাজর ও আঙুর। সেগুলো তো কবে আমি খেয়ে ফেলেছি। কী হয়েছে? “ও! এ জন্যই কুকুর তোমার পিছু ছাড়ছিল না’, বলে পুলিশ অফিসার হেসে দিলেন। স্যান্ডউইচ ব্যাগগুলো সযত্নে রেখে দিয়ে আমাকে মুক্তি দিলেন। মানুষ হিসেবে বুদ্ধির বড়াই করি বা না করি, কুকুরের ঘ্রাণ শক্তির কাছে হেরে গিয়ে অকল্যান্ড এয়ারপোর্টে সেদিন মুহূর্তের মধ্যে বেকুব বনে গেলাম। বুঝলাম, আমার মতো বোকা ন্যাড়া বেলতলায় একবার নয়, বারবার যায়।
*লেখক: আবু এন এম ওয়াহিদ; অধ্যাপক-টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর- জার্নাল অব ডেভলপিং এরিয়াজ