আমার বাবা
‘আমার বাবা সত্যজিৎ’ বইটি লিখেছেন তাঁরই পুত্র সন্দীপ রায়। সন্জিদা খাতুন আপা লিখেছেন—‘আমার বাবা: কাজী মোতাহার হোসেন’।
একজন বাবার জন্য বিষয়টি অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের ব্যাপার। স্বর্গীয় পিতার জন্য মর্ত্যে পুত্রের এই স্মরণ অবিস্মরণীয়। আমার মতে পিতার জীবদ্দশায়ই পুত্র-কন্যার লেখা উচিত। তা হলে পিতা শুধু অনুভব করে নয়, তিনি সরাসরি দেখবেন পুত্র-কন্যার হৃদয়ে তাঁর বসবাস। মাকে নিয়ে বই লেখা হয়েছে অনেক, পড়েছি সেসব। বাবাকে নিয়ে লেখা কোনো বই পড়িনি। এখন অনেকেই লিখছেন। বাবাকে নিয়ে লেখা বই পড়ার অপেক্ষায়।
আমার বাবাকে নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে হয়তো দুই-চার লাইন লিখতে পারি, বই লেখা হয়ে উঠবে না। বাংলাদেশে জন্মসনদ এখন খুবই জরুরি বিষয়। এই জন্মসনদ ছাড়া এখন এনআইডি কার্ড পাওয়া যাবে না। এর ফলে এখন আর বয়স নিয়ে কোনো রকম গোঁজামিল চলবে না। আমার মেয়ে জিজ্ঞেস করেছে, বাবা তোমার দুইটা জন্মতারিখ কেন? ১৯৬৭ সালে আপার প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে আব্বা বড়দাকে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় ভাগনে তপুর জন্মনিবন্ধনের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তখন থেকেই পৌরসভায় জন্মনিবন্ধন করার নিয়ম ছিল। হয়তো অনেকেই সেটি জানতেন না অথবা জানলেও নিয়ম মানতেন না। কারণ, আমরা নিয়ম ভাঙার দলে। আব্বার এই কাজটি অনুসরণ করে ঢাকায় আমার মেয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আমি নগর ভবনে গিয়ে জন্মনিবন্ধন করে জন্মসনদ নিয়ে আসি। নগর ভবনের ইস্যু করা জন্মসনদটি দেখে অগ্রজের বন্ধু বিস্ময় প্রকাশ করেন।
১৯৬৭-৬৮ সালে দেখেছি, মা বাসায় গৃহকর্মী রাখলে আব্বা গৃহকর্মীর নাম-ঠিকানা তাঁর নোট বুকে লিখে রাখতেন। তখন বলেছিলেন, বাসায় গৃহকর্মী রাখলে তাঁর ছবিসহ বায়োডেটা নিকটস্থ থানায় জমা দেওয়ার নিয়ম। এখন টিভি নিউজ ও পত্রিকায় দেখি গৃহকর্মীর মাধ্যমে দুর্ঘটনার সংবাদ। গৃহকর্মী হয়ে যান লাপাত্তা লেডিস। শৈশবে (১৯৬৭-৬৮ সালে) রেডিওতে হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রচারিত হতো। আব্বা আমাকে নিয়মিত এ বিষয়ে সচেতন করতেন। কিছুদিন আগেও প্রথম আলোয় ছেলেধরা বিষয়ে সংবাদ দেখেছি। আব্বা আলাদা একটি নোটবুকে সবার জন্মতারিখ লিখে রাখতেন। আমাদের পরিবারে শিশু ভূমিষ্ঠ হলে আব্বা তাঁর নোট বুকে লিখতে দেরি করতেন না। জন্মতারিখ লিখে রাখার নোটবুকটিকে বলা হতো ‘কোষ্ঠীনামা’। ৬০ বছর আগে আব্বার কর্মকাণ্ড আজও অনুসরণীয়। এ জন্য হয়তো প্রবাদ রচিত হয়েছে, পুরান চাল ভাতে বাড়ে। ইংরেজিতে বলে, ওল্ড ইজ গোল্ড।
বিক্রমপুরবাসীদের একটি ঐতিহ্য ছিল, কাঁঠালপাতার পিঠা। কাঁচা কাঁঠালপাতা সংগ্রহ করার পর পাতা ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে চালের গুঁড়ি গুলে ফানেল বা কর্কের মাধ্যমে পাতায় আলপনা করা হতো। আলপনা আঁকার পর সেই পাতাটি চুলায় পাতিলে রেখে বাষ্পে সেদ্ধ করা হতো ভাপা পিঠার মতো। এরপর পাতা থেকে পিঠা বা আলপনাটি আলতো করে তুলে আলাদা করে রোদে শুকানো হতো। রোদে শুকানোর পর শক্ত হলে টিনের কৌটায় সংরক্ষণ করা হয়। বাড়িতে মেহমান এলে তখন এই পিঠা টগবগে গরম তেলে ভেজে পিঠার ওপর সামান্য চিনি ছড়িয়ে দেওয়া হতো। মচমচে খুবই সুস্বাদু পিঠা। যখন ফাস্ট ফুডের প্রচলন ছিল না, তখন এই কাঁঠালপাতার পিঠা ছিল খুবই আদরণীয়। বাসায় আব্বার মেহমান এলে তাঁদের এই পিঠা পরিবেশন করলে তিনি তাঁদের পিঠা তৈরির কৌশল ও রেসিপি জানিয়ে বেশ আনন্দ পেতেন।
আব্বা জমির দলিলসংক্রান্ত কাগজপত্র পাঠোদ্ধার করতে পারতেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি, আপনি কীভাবে এসব পড়া শিখলেন? বললেন, চাচা মিয়ার (দাদার অনুজ) কাছ থেকে শিখেছি। আব্বা তাঁর চাচাকে পিতৃতুল্য ভালোবাসতেন। চাচা–ভাতিজার মধ্যে গুরু–শিষ্য সম্পর্ক ছিল। তিনি আব্বাকে সাত্তার নামের পরিবর্তে ডাকতেন—ছত্তর (আব্বার নাম—এ সাত্তার মিয়া)। বলতেন, ছত্তর হুঁকা জ্বালাও। আব্বা হুঁকা তৈরির পর তাঁকে দিলে তিনি বলতেন—তুমি আগে টান দাও। আব্বা তাঁর এই চাচার ছেলেকেও (চাচাতো ভাই) আপন ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন। আব্বা হজে যাওয়ার আগে দেখেছি, তাঁর এই চাচাতো ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন। আব্বা তাঁর পিতা ও পিতৃতুল্য এই চাচাকে হজ পালনের জন্য সৌদি আরব পাঠিয়েছিলেন। মাকে সঙ্গে নিয়ে আব্বা হজে যাবেন এটাই ছিল তাঁর আকাঙ্ক্ষা। মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার পর আব্বা একাই হজ পালন করেন। আব্বা সৌদি আরব যাওয়ার পর ডাক্তার শরফুদ্দিন ভাই বাসায় এসে প্রতিদিন মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতেন। আব্বা সৌদি আরব থেকে প্রতিদিন ল্যান্ড ফোনে ডাক্তার শরফুদ্দিন ভাইয়ের বাসায় ফোন করে মায়ের স্বাস্থ্যের সংবাদ নিতেন। এই তথ্যটি আমার জানা ছিল না। ডাক্তার শরফুদ্দিন ভাইয়ের কাছ থেকেই শুনেছি।
আব্বা চাচা ও ফুপুদের পাশাপাশি মামা ও খালাদেরও ভালোবাসতেন। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে সবার পারিবারিক সব কাজে সাহায্য–সহযোগিতা করতেন। বড় মামা নারায়ণগঞ্জ জয়গোবিন্দ হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আমাদের বাসার যেকোনো অনুষ্ঠানের আগে আব্বা আমাকে বলতেন, তোর বড় মামাকে ডেকে নিয়ে আয়। একই সঙ্গে আব্বা দুলাভাইকেও খুব ভালোবাসতেন। যেকোনো সমস্যা নিয়ে দুলাভাইয়ের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। পারিবারিক কোনো ব্যাপারে আব্বা দ্বিমত প্রকাশ করলে অথবা গররাজি হলে দুলাভাই আব্বাকে সেই বিষয়ে রাজি করিয়ে নিতেন। অর্থাৎ কোনো কোনো ক্ষেত্রে একমাত্র দুলাভাই আব্বার মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন। মা ও আব্বার স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনে তিনজন চিকিৎসকের আসা–যাওয়া ছিল আমাদের বাসায়। তার মধ্যে চিকিৎসক মাহবুবুর রহমান বাসায় এলে আব্বার সঙ্গে দেশ, রাজনীতি ও ধর্মের প্রসঙ্গ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতেন। ডাক্তার সাহেব যতক্ষণ আমাদের বাসায় উপস্থিত থাকতেন পুরো সময়টাই রিকশা বাসার গেটে অপেক্ষায় থাকত। মসজিদের ইমাম ও মহল্লার সিনিয়ররাও বাসায় এলে আব্বার সঙ্গে আলাপে মশগুল হতেন। আব্বার ব্যক্তিগত সংগ্রহের বই তাঁদের পড়ার জন্য দিতেন এবং বইয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে গল্প করতেন। স্বাধীনতার পর থেকেই দেখেছি, মসজিদের ওস্তাদজি আব্বার কাছে তাঁদের উপার্জিত অর্থ জমা রাখতেন। ওস্তাদজিরা প্রতিবারই ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার আগে বাসায় এসে সঞ্চিত অর্থ নিয়ে যেতেন। আব্বা কথা বলতে ও গল্প করতে খুব ভালোবাসতেন।
গ্রামে দাদার পাটের ব্যবসা ছিল। আব্বা গ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে পাটের ব্যবসা করতেন। শীতলক্ষ্যায় তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অফিস ছিল। নাম—কামাল ভাই অ্যান্ড কোম্পানি। তখন এই অফিসকে গদি বলা হতো। পাটের গুদাম ছিল বন্দর। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে মিলাদ ও মিষ্টির আয়োজন করা হতো। এবং লালসালুতে মোড়ানো নতুন হালখাতা কেনা হতো ব্যবসায়িক প্রয়োজনে। আব্বা বলেছিলেন, লক্ষাধিক টাকা প্যান্টের পকেটে নিয়ে ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে রাত কাটিয়েছেন পাট কেনার উদ্দেশ্যে। কখনো কোনো ক্ষতি হয়নি। তিনি কখনো বলেননি, আমার টাকা হারিয়ে গেছে অথবা পকেটমার হয়েছে। কিংবা চশমা বা কলম হারিয়ে গেছে, খুঁজে পাচ্ছি না। এই জাতীয় নিখোঁজ সংবাদ আমরাই এখন হররোজ উচ্চারণ করে স্ত্রী ও সন্তানদের বিব্রত করি।
আব্বাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি দাদাকে স্বপ্নে দেখেন? বললেন, হ্যাঁ যখন বিপদগ্রস্ত হই বা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হই তখন বাবাকে স্বপ্নে দেখি। এরপর আমার সমস্যা কেটে যায়। স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, বাবা ছিলেন তাঁর মেন্টর। আব্বা বলেছিলেন, তোর দাদা রোজ দুপুরে ভাত খাওয়ার পর আড়াই সের রসগোল্লা খেত। আমার স্ত্রীর বড় ভাই আমাকে বলেছেন, তাঁর দাদা প্রতিদিন পাঁচ সের দুধের কাঁচা ছানা খেতেন। এই দুইটা ঘটনা সত্যি বিস্ময়কর! আমরা আজ তাঁদের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলে আমাদের পেট ঢলঢলা হয়ে লেজেগোবরে অবস্থা হবে!
স্বাধীনতার আগে আব্বার অফিসে পুরোনো আমলের টাইপরাইটার দেখেছি। স্বাধীনতার পর আব্বা পোর্টেবল নতুন টাইপরাইটার মেশিন কিনেছিলেন। মাছ শিকার, বন্দুক, পিস্তলের পাশাপাশি টাইপরাইটার মেশিনের প্রতিও আব্বার দুর্বলতা ছিল বেশ। এই টাইপরাইটার মেশিনে আব্বা বন্দুক পিস্তল নবায়নের জন্য চালান টাইপ করে আমাকে দিয়ে ব্যাংকে পাঠাতেন। আমি মাস্টার্সের পর এই টাইপরাইটারে অনেক চিঠি টাইপ করেছি দুই হাতের অনামিকার সাহায্যে। দুলাভাই ও মেজদা দুজনকেই দেখেছি, এই টাইপ রাইটারে পেশাদার টাইপিস্টদের মতো চিঠি টাইপ করতেন।
১৯৬৫ সালে আব্বার জন্ডিস হয়। প্রায় ছয় মাস গৃহবন্দী হয়ে ভুগেছিলেন তখন। চিকিৎসক মাহবুবুর রহমান আব্বার ট্রিটমেন্ট করতেন। একই সঙ্গে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাও চলত। হলুদ, মরিচ, তেল ছাড়া খাবার রান্না হতো আব্বার জন্য। এক লোক বাসায় এসে আমগাছের বাকল ও চুনের পানি দিয়ে আব্বার হাত ও পা ধুয়ে দিতেন। বাসার কাছেই থাকেন এক ভদ্রলোক, তিনি উববুত লাকরা নামের গাছের ডাল কেটে মালা বানিয়ে দিয়েছিলেন। আব্বা সুস্থ হওয়ার পর তাঁর কাছ থেকে এই মালা তৈরির পদ্ধতি ও নিয়মকানুন শিখে নেন। বড়দাকেও আব্বা মালা তৈরির নিয়ম শিখিয়েছিলেন। সূর্যাস্তের সময় শিকড়সহ গাছ তুলে এনে ঘরের চালের ওপর রাখতে হবে অর্থাৎ মাটিতে আর রাখা যাবে না। ভোরে ফজর নামাজের পর গাছের ডাল এক ইঞ্চি দৈর্ঘ্যে ৯৯টি টুকরা করে মালা তৈরি করতে হবে। মালা তৈরি শেষ হলে কোরআনের দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দেবে। রোগী মালাটি মাথার তালুতে নিয়ে বসে থাকবে ও একটু পর পর হাতের তালুর সাহায্যে ঘোরাবে। এভাবে ঘোরানোর পর মালা গলায় নেমে আসবে। মালাটি একটু বড় হয়ে নেমে এলে প্রথম ডান হাত এরপর ক্রমান্বয়ে আরও বড় হলে বাঁ হাত প্রবেশ করাবে। পরিহিত লুঙ্গির গিঁট খুলে দিলে শরীর বেয়ে নেমে আসবে। এরপর গোসল সেরে খাবার খাবে। মালা শরীর থেকে নেমে না যাওয়া পর্যন্ত শুধু পানি বা ফল খেতে পারবে। মালা পর্ব শেষ হতে অনেক সময় বিকেল বা সন্ধ্যা হয়ে যেত। অনেক সময় অসতর্কতার জন্য মালা ছিঁড়ে যেত। তাহলে আবার আরেক দিন নতুন মালা দিয়ে শুরু করতে হবে। অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত গাছ খুঁজে পাওয়া যেত না। মাস্টার্সে পড়াকালে আমার জন্ডিস হলে বড়দা আমাকে মালা দিয়েছিলেন। আব্বা ও বড়দা জন্ডিসে আক্রান্ত অনেককেই এই মালা দিয়েছিলেন বিনা পারিশ্রমিকে। মেজদার কাছে শুনেছি, গ্রামে দাদা ফ্রি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা দিতেন। ভোরে গ্রামে দাদার বাড়িতে মানুষের ভিড় হতো।
খুব ভোরে (১৯৬৭-৬৮ সালে) আব্বা ঘুম থেকে ডেকে তুলে বললেন, চল পাখি শিকারে যাই। আমি আজও দেখি, শীতের সকালে আব্বার মোটরবাইকে আমি তাঁর পেছনে বসে আছি। কভারে আবৃত দোনলা বন্দুকটি আব্বার পিঠে ঝোলানো। বাবা এক বিশাল বটবৃক্ষ। এই বটবৃক্ষের ছায়ায় আমরা নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠি। রৌদ্রতাপ দগ্ধ এই পৃথিবীতে ছায়াটি চিরতরে সরে গেলেই আমাদের টনক নড়ে তাঁর আগে নয়। বাবা সন্তানের জন্যই বেঁচে থাকেন।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]