মনে রাখার মতো

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

দেশে বেড়াতে গেলে সময় এত কম থাকে যে সবার সঙ্গে দেখা করা যায় না কিন্তু মন পোড়ে সবার জন্য। বিদেশে আসার পর দ্বিতীয়বার দেশে গেছি বিয়ে করব—এমন প্রস্তুতি নিয়ে। চাচাতো বোনের দাওয়াতে মোহাম্মদপুর থেকে উত্তরা যাচ্ছি সিএনজিতে, একটা গলি ঘুরতেই দেখি জটলা!! অনেকেই ঝামেলা দেখলে এড়িয়ে যায়, সেটাই ভালো এবং ঝামেলাহীন থাকার সঠিক পন্থা। কিছু মানুষ কাজটা করবে না, তারা যে মানুষ হিসেবে উন্নত এমন নয়, ঝোঁকের মাথায় অন্যের ভেজালে নিজেকে জড়ায়। কীভাবে যেন আমি এমন। এর খেসারতও দিই, তবু কেন যেন হেবিট চেঞ্জ হয় নাই। আর হবেও না।

সিএনজি থামিয়ে দেখি এক ভদ্রমহিলা খালি পায়ে ছোটাছুটি করছে বাচ্চা কোলে নিয়ে। সবাই তামাশা দেখছে আর একজন আরেকজনকে বলছে একটা কিছু করেন। আমি নেমে জানতে চাইলাম কী হয়েছে?

ও ভাই গো আমার ছেলেরে বাঁচান।

কোলের বাচ্চাটা হা করে আছে। বোঝা যাচ্ছে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

কিছু না বুঝেই বললাম, ওঠেন সিএনজিতে। ড্রাইভারকে বললাম, শিশু হাসপাতাল যান। যৌক্তিক কাজ। মহিলার সঙ্গে একটা ছোট মেয়ে আর কিশোর ছেলেও উঠল। উনি কাঁদছেন আর চিৎকার করছেন। শান্তভাবে বললাম, নো চিল্লাচিল্লি, নো কান্না!! ছেলেকে বাতাস লাগতে দেন। চেপে ধরে থাকবেন না। শুনল।

শিশু হাসপাতালে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেলাম। দেশের সরকারি হাসপাতালে কাজ হয় না এমন যাঁরা বলেন, তাঁরা খুব ভুল। হয় এবং ভালোই হয়। আমি গুছিয়ে বলতে পেরেছিলাম ডাক্তারকে, বলতেই বুঝল।

এটা একটা নতুন ভাইরাস আরও কয়েকটা বাচ্চা আসছে...। সব চেক করে উনি ইনজেকশন দিলেন। বাচ্চাটা আধঘণ্টার মধ্যে ঘুমিয়ে গেল এবং শ্বাসকষ্ট কমল। ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে দিল, আমি কিনে এনে মহিলাকে বললাম, চলেন বাসায় দিয়ে আসি। বাচ্চা ভালো আছে। উনি কিছুই বললেন না। চললেন সঙ্গে।

বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে আসব, ভদ্রমহিলা আমার হাত চেপে ধরে রেখেছেন আরেক হাতে তাঁর বাচ্চা!

আপনি বাসায় যাবেন

ওষুধের টাকা দেব

হাত ছাড়ে না...বজ্র আঁটুনি যাকে বলে।

বাসায় ঢুকে আমাকে বসিয়ে ভেতরে গেলেন।

আমি ফট করে ভেগে গেলাম এই সুযোগে!! বোনের বাসায় দাওয়াত। দেরি হলে রাগ করবে তো!

বেশ রাত করে ফিরে ঘুমিয়ে গেছি। ওই ঘটনা আমার মাথায় নেই। ভোর সাতটার দিকে আব্বা আমাকে ডেকে তুলে বলল, দেখ তো কারা আসছে, তোরে খোঁজে। চল্লিশের কোটায় বয়স একজন মানুষ দাঁড়িয়ে...আর মহিলার সঙ্গে যে কিশোর আর বাচ্চা মেয়েটা গিয়েছিল হাসপাতালে, তাঁরা। ছেলে আঙুল তুলে বলল, এই লোক!!

ভদ্রলোক আমাকে ধরে কান্না...থামে না! আব্বা হতভম্ব হয়ে বলল, কী হইছে?

এখন তাঁর পরিচয় দেওয়া যেতে পারে। নাম তৌহিদ, বাড়ি নোয়াখালী, দুটি গার্মেন্ট আছে ঢাকায়। নিজে এক বাবার এক ছেলে, তার নিজের ও এক ছেলে যাকে আমি মাসহ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম, তূর্য। আমাকে তাঁর সঙ্গে তাঁদের বাসায় এখন যেতে হবে। কথা শেষ! ছাড়াবার উপায়ই ছিল না!!

তৌহিদ ভাইয়ের বাসায় গিয়ে দেখি জনাবিশেক লোক বসা। ভদ্রমহিলা এসে বললেন ইনি আমার ছেলেরে বাঁচাইছে!! অদ্ভুত ঘোষণা...উপস্থিত সবাই আমার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন তিন থেকে চারজন কাঁদলেন। আমি দেশের মানুষদের এই বন্ডিং ভীষণ মিস করি...পাই না তো!! আপনার জন্য খামোখা মায়া করে কাঁদবে আছে এমন?

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আমাকে ওই বাসায় নাশতা খেতে হলো। সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে হলো। ও দিকে আমার ভাই বোন আমাকে খুঁজতে খুঁজতে তৌহিদ ভাইয়ের বাসায় হাজির। তাঁদের ও খেতে হলো!! ওরা বোধহয় খানিকটা গর্ব অনুভব করছিল শুনে যে এটা আমাদের বড়দা!! বদলে যায়নি একদম!! হাঃ হাঃ হাঃ। নিজেকে কি একটু বড় দেখালাম? মাফ করে দেন প্লিজ, যা ঘটেছে, তাই লিখছি।

এরপর যা ঘটল, তা আসলে অবিশ্বাস্য। আমি বের হলে তৌহিদ ভাইয়ের বাসার সামনে দিয়েই যেতে হয়। ওই বাসার বারান্দায় কেউ না কেউ থাকে...আঙুল দিয়ে দেখায় এই যে উনি!! মিতা(তৌহিদ ভাইয়ের বউ) আপা বাচ্চা কোলে বারান্দায় আসেন...আমাকে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করতে হয়!! জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেল ভালোবাসার অত্যাচারে!! এর মধ্যে আমার বিয়ে ঠিক হলো। তাদের দাওয়াত দিলাম। তলে তলে মিতা আপার সঙ্গে আমার বোন রিমার বিরাট খাতির। আমরা বাংলাদেশের মানুষ এমন তো। আমার বিয়ের বরযাত্রার গাড়ি তৌহিদ ভাইয়ের গাড়ি হলো। ফুল দিয়ে সাজানো যে গাড়িতে আমি বর সেজে গেলাম ওটা তার গাড়ি!! বিয়ের দিন এখান থেকে নিয়ে যাওয় একটা মুখোশ পড়ে ছিলাম...হরর ভাব ধরার চেষ্টা। আমার চরিত্রে চমক থাকে, তবে ভাগ্য এমন যে চমক দেখাতে গিয়ে নিজেকে চমকাতে হয় সব সময়!!

তৌহিদ ভাই পরিবার গ্রামে আমার বিয়ের অনুষ্ঠানে যাননি। বৌভাত ঢাকায় ছিল বলে এসেছিলেন। এরপর যতবার দেশে গেছি, ততবার সেই রাজ কুমার তূর্যের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে গেছি আত্মা থেকেই। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে হঠাৎ দুই তিন বছর পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

সতেরো–আঠারো বছর পর একদিন সেলুনে তৌহিদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। জড়িয়ে ধরলেন। খানিকটা বুড়িয়ে গেছেন, আমিও। খুব ভালো আছেন। মিতা আপা এখন একটা কাপড় দোকান চালান। পাতাবন। এই দোকানই নাকি মূল ইনকাম এখন। মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের উল্টাদিকে। গিয়ে আপাকে পেলাম না, কর্মচারী অনেক। খুব ভালো লাগল। তূর্য মালয়েশিয়াতে পড়তে গেছে। বড় মেয়েও তাই....দেশের ধনাঢ্য মানুষেরা ঈর্ষা করার মতো আরামের জীবন কাটান। তবে এটা মূল রিয়েলিটি নয়। মূল এমন হলে মানুষ এত ব্যাংক ডিফল্টার হতো না।

আরও বছর পাঁচেক পরে গিয়ে দেখি পাতাবন নেই। তৌহিদ ভাইকে খুঁজে বের করতে পারলাম না। তবে জানলাম উনি ভালো নেই। জীবন মানুষকে নিয়ে খেলা করে আসলে। এই কঠিন খেলা থেকে মৃত্যুর পরও বোধহয় মুক্তি নেই।