ভোট চুরি বাংলাদেশে হয় জানি, কিন্তু সুইডেনে?
বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম, ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল কিংবা ভোটারকে প্রভাবিত করার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এসব নিয়ে আমরা বহুবার শুনেছি, দেখেছি, লিখেছি। কিন্তু সুইডেনের মতো একটি দেশে, যেখানে নির্বাচনব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের আস্থা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, সেখানে যদি ভোটে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: ভোট চুরি বাংলাদেশে হয় জানি, কিন্তু সুইডেনে?
২০২৬ সালের সুইডিশ নির্বাচনের পর এমনই একটি ঘটনা সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। ১৩ সেপ্টেম্বর সুইডেনে রিক্সদাগ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী ভোটার ছিলেন ৮০ লাখ ৫১ হাজার ৩৫৫ জন এবং ভোট দিয়েছেন ৬৮ লাখ ৩৪ হাজার ৪১৩ জন, অর্থাৎ ভোটার উপস্থিতি ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রায় ২৪ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে ভোট বা ‘পারসনরোস্ত’ দিয়েছেন।
এই ব্যক্তিগত ভোট ব্যবস্থাই এবারের একটি আলোচিত ঘটনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
ভ্যানস্টারপারিয়েতের ৩০ বছর বয়সী মোহামেদ আবদুকারদির আলি দালারনা অঞ্চল থেকে রিক্সদাগ নির্বাচনে দলের তালিকায় ৯ নম্বরে ছিলেন। কিন্তু তিনি ৬৪৮টি ব্যক্তিগত ভোট পেয়ে তালিকার ওপরের দিকে উঠে আসেন এবং দালারনা অঞ্চলের একটি আসনে নির্বাচিত হন।
এরপর অভিযোগ ওঠে, কিছু ভোটারের কাছে আগে থেকেই নির্দিষ্ট প্রার্থীকে চিহ্নিত করা ব্যালট দেওয়া হয়েছিল এবং ভোটারদের ওই প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। কিছু সংবাদমাধ্যমে ভোটারদের অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবের কথাও প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখন তদন্ত চলছে। অভিযোগটির আইনি বিষয় হলো ‘otillbörligt verkande vid röstning’, অর্থাৎ ভোটদানে বেআইনি প্রভাব বিস্তার।
তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোহামেদ আবদুকারদির আলিকে এই মুহূর্তে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। তিনি নিজেও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এসভিটি (SVT)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁকে কোনো অপরাধে সন্দেহভাজন করা হয়েছে এমন তথ্য তাদের কাছে নেই।
পরবর্তী সময়ে ভ্যানস্টারপারিয়েত ঘোষণা করেছে যে তদন্ত চলাকালে মোহামেদ আলী সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত থাকবেন এবং নতুন ম্যান্ডেটের শুরু থেকে রিক্সদাগ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন না।
তাহলে সুইডেনের নির্বাচনব্যবস্থায় দুর্বলতার কোনো সুযোগ আছে কি?
সুইডেনে ভোটার চাইলে দলের নির্দিষ্ট প্রার্থীর নামের পাশে চিহ্ন দিয়ে ব্যক্তিগত ভোট দিতে পারেন। রিক্সদাগ নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দলের নির্বাচনী এলাকার ভোটের অন্তত ৫ শতাংশ ব্যক্তিগত ভোট পেলে ব্যক্তিগত ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান।
অর্থাৎ এখানে শুধু দলকে ভোট দেওয়াই শেষ কথা নয়। একজন প্রার্থী সংগঠিতভাবে ব্যক্তিগত ভোট সংগ্রহ করতে পারলে দলের তালিকায় নিচে থেকেও নির্বাচিত হতে পারেন। গণতন্ত্রে এটি ভোটারের ব্যক্তিগত পছন্দ প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু একই সঙ্গে এই ব্যবস্থার অপব্যবহারের সুযোগ আছে কি না, সেই প্রশ্নও এবারের ঘটনার পর সামনে এসেছে।
আর এখানেই বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
২০২৬ সালের সুইডিশ নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বেশ কয়েকজন প্রার্থীও বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। লিও আহমেদ, ফারজানা খান, মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন রিক্সদাগ নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। মিহিবুল এজদানি খান, দীপক কুণ্ডু ও পাপেল খান স্টকহোম অঞ্চলের নির্বাচনে এবং হারুন চৌধুরী, তাওহিদ আমানুল্লাহ, আফতাব জাইগিরদার, শিমুল সানাউল্লাহ ও মো. আরিফ হোসাইন মাজুমদার বিভিন্ন পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হন।
লিও আহমেদ সিগতুনা পৌরসভায় ব্যক্তিগতভাবে ২১৫টি ভোট পেয়েছেন। এটি স্থানীয় নির্বাচনের তথ্য, রিক্সদাগের ভোট নয়।
ফারজানা খানও রিক্সদাগ ও সালেম পৌরসভা উভয় নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। তাঁর ২০২৬ সালের চূড়ান্ত ব্যক্তিগত ভোটের সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি সংখ্যাটি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন; তাই এখানে অনুমান করে কোনো সংখ্যা দেওয়া উচিত হবে না।
এই ঘটনাগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। কোনো প্রার্থী বেশি ব্যক্তিগত ভোট পেয়েছেন মানেই সেখানে ভোট কারচুপি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। সুইডেনের নির্বাচনব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ভোট একটি স্বাভাবিক ও বৈধ ব্যবস্থা। সংগঠিত প্রচারণা, ব্যক্তিগত পরিচিতি, স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগ কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সমর্থনের কারণেও একজন প্রার্থী তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যক্তিগত ভোট পেতে পারেন।
কিন্তু যখন অভিযোগ ওঠে যে ভোটারকে নির্দিষ্ট প্রার্থীর নামে আগে থেকেই চিহ্নিত ব্যালট দেওয়া হয়েছে কিংবা ভোটের বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তখন বিষয়টি আর সাধারণ নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যে থাকে না। তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং সত্য উদ্ঘাটন করা। বর্তমানে দালারনা অঞ্চলের এই ঘটনাতে সেটিই হচ্ছে।
আরেকটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে ভাবায়।
আমরা প্রায়ই ধরে নিই, নির্বাচন অনিয়ম যেন শুধু দুর্বল গণতন্ত্রের দেশগুলোর সমস্যা। বাস্তবতা সম্ভবত এত সরল নয়। কোনো নির্বাচনব্যবস্থা যতই শক্তিশালী হোক, তার ভেতরে মানুষই কাজ করে। আর যেখানে মানুষ আছে, সেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, সংগঠিত প্রভাব কিংবা আইনের সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা একেবারে অসম্ভব নয়।
তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পার্থক্য এখানেই: অভিযোগ উঠলে সেটিকে চাপা না দিয়ে তদন্ত করা হয়।
দালারনা অঞ্চলের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কী প্রমাণ করে, তা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে। যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে নির্বাচনী ব্যবস্থার কোথায় দুর্বলতা ছিল এবং কীভাবে তা সংশোধন করা যায়। আর যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তাহলেও তদন্তের মাধ্যমে সত্যটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
কারণ, গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার নয়। গণতন্ত্র হলো মানুষের সেই বিশ্বাস, আমি যে ভোটটি দিলাম, সেটি সত্যিই আমার ভোট হিসেবে গণনা হয়েছে।
বাংলাদেশ হোক কিংবা সুইডেন, এই বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে শুধু একটি নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা।
তাই প্রশ্নটি শুধু এই নয়, ‘ভোট চুরি বাংলাদেশে হয় জানি, কিন্তু সুইডেনে?’
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: কোনো দেশই কি এমন একটি নির্বাচনব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, যেখানে মানুষের ভোটের ওপর মানুষেরই কোনো অবৈধ প্রভাব থাকবে না?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যখন বিশ্বের নানা সংকট, যুদ্ধ, মানবাধিকার, শান্তি ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক এমন এক সময়ে মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ের এই বাস্তবতাও আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করায়: গণতন্ত্র কি সত্যিই একটি টেকসই ও গুণগত ব্যবস্থা, যা মানুষের লোভ, স্বার্থ ও নৈতিক পতনের মধ্যেও মানুষের ভোটের অধিকার ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে রক্ষা করতে পারে? নাকি সময় এসেছে গণতন্ত্রের ব্যবস্থাকেও নতুন করে পরীক্ষা করার, দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার এবং প্রয়োজন হলে তার প্রতিকারের? মানুষের অধঃপতন যদি মানুষের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্রকে শুধু রক্ষা করার কথা বললেই হবে না, তাকে মানুষের নৈতিকতার সঙ্গে টেকসই করে তোলার পথও খুঁজতে হবে।