জার্মানির ১২৫ বছরের পুরোনো বৈদ্যুতিক রেলপথ ভ্রমণ

পড়াশোনার উদ্দেশ্যে জার্মানিতে এসে অনেক কিছুই দেখেছি। কিন্তু কিছু জায়গা আছে, যেগুলো শুধু জায়গায় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, মানুষের আবিষ্কার আর এক শতাব্দীর বেশি পুরোনো কোনো গল্প। এবার তেমনই এক অভিজ্ঞতা হলো জার্মানির ভুপারটাল সোয়েবেবানে (Wuppertal Schwebebahn) চড়ে।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি যেন কোনো কাল্পনিক সিনেমার দৃশ্য। একটি ট্রেন রেললাইনের ওপর চলছে না; বরং রেললাইনের নিচে ঝুলে আকাশের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে! আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো এই অদ্ভুত সুন্দর পরিবহনব্যবস্থা আজকের নয়! ২০২৬ সালে এর বয়স ১২৫ বছর হয়েছে। ১৯০১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী পরিবহনের জন্য চালু হয়েছিল ভুপারটাল সোয়েবেবান। আজও এটি নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করছে।

যে গল্পের শুরু আরও আগে—

উনিশ শতকের শেষ দিকে ভুপারটাল অঞ্চলে শিল্পায়ন দ্রুত বাড়ছিল। জার্মানির এনআরডব্লিউ স্টেটের এলবারফেড ও বারমেন শহর তখন দ্রুত বড় হয়ে উঠছিল। মানুষের আনাগোনা বাড়ছিল, শিল্পকারখানা বাড়ছিল আর পাশাপাশি রাস্তায় যানবাহনের চাপও বাড়ছিল। কিন্তু শহরটি ছিল একটি সরু উপত্যকার মধ্যে। চারপাশে পাহাড়, নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। নতুন রাস্তা তৈরি করার জায়গা কম ছিল, আর মাটির নিচে পাতালরেল তৈরি করাও সহজ ছিল না।

তখনই জার্মান প্রকৌশলীরা ভাবলেন, কেমন হবে, যদি রাস্তা দিয়ে নয়, নদীর ওপর দিয়ে ট্রেন চালানো যায়? এই ধারণার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত ছিলেন জার্মান প্রকৌশলী অয়গেন ল্যাঙেন। তাঁর নকশা অনুসারে তৈরি হতে শুরু করল এক অভিনব ঝুলন্ত রেলওয়ে (Hanging Railway), যা পৃথিবীর সর্বপ্রথম মনো সাসপেনশন রেলওয়ে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

১৮৯৮ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রথম পরীক্ষামূলক যাত্রা হয় একই বছরের ৫ ডিসেম্বরে। এরপর আসে আরও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

২৪ অক্টোবর ১৯০০ সালে তখনকার এবং জার্মানির ইতিহাসে সর্বশেষ জার্মান সম্রাট কাইজার উইলহেম দ্বিতীয় এবং তাঁর স্ত্রী এ ট্রেনে পরীক্ষামূলক যাত্রা করেন। সেই ঐতিহাসিক যাত্রার গাড়িটিই পরে পরিচিত হয় কাইজার ওয়াগেন নামে। অবশেষে ১ মার্চ ১৯০১ সালে সাধারণ যাত্রীদের জন্য সোয়েবেবান চালু হয়। পুরো রুটটি পরবর্তী সময়ে ১৯০৩ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়।

আর ১২৫ বছর পর সেখানে আমি...

ইতিহাসটা জানার পর যখন নিজে সেই ট্রেনে উঠলাম, অনুভূতিটা যেন একটু অন্য রকম হয়ে গেল। স্টেশনে দাঁড়িয়ে ট্রেনটির অপেক্ষা করছিলাম। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে দেখা গেল একটি ট্রেন আসছে, কিন্তু মাটিতে তার কোনো চাকা নেই! ট্রেনটি ওপরের ইস্পাতের কাঠামোর সঙ্গে ঝুলে এগিয়ে আসছে। ট্রেনে উঠলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি স্টেশন ছেড়ে সামনে এগিয়ে গেল। জানালার বাইরে তাকাতেই নিচে দেখা গেল নদী, ওপরে পাহাড়, শহরের রাস্তা, বাড়িঘর আর মানুষের দৈনন্দিন জীবন।

মনে হচ্ছিল, আমি কোনো সাধারণ ট্রেনে বসে নেই, আমি যেন শহরের ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে চলেছি। কখনো নদীর ওপর দিয়ে, কখনো রাস্তার ওপর দিয়ে, আবার কখনো শহরের ভবনগুলোর পাশ ঘেঁষে ট্রেনটি এগিয়ে চলল।

প্রায় ১৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথ এবং এর বড় একটি অংশ নদীর ওপর দিয়ে চলে। শহরের তথ্য অনুযায়ী, ট্রেনটি রাস্তার প্রায় ৮ মিটার এবং নদীর প্রায় ১২ মিটার ওপরে দিয়ে চলাচল করে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো যে প্রযুক্তি দেখে আজও পর্যটকদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়, সেটি তৈরি হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন পৃথিবী আজকের মতো আধুনিক ছিল না। ১৯০১ সালে মানুষ যখন এই ট্রেনে উঠেছিল, তখন হয়তো তাদের কাছেও এটি ছিল ভবিষ্যতের কোনো যানবাহন। আজ ১২৫ বছর পর সেই ‘ভবিষ্যৎ’ এখনো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

শহরের মানুষ অফিসে যান, কাজে যান, বাড়িতে ফেরেন; আর তাঁদের মাথার ওপর দিয়ে ইতিহাস বহন করে ছুটে চলে সোয়েবেবান। ভুপারটাল শহরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৮৫ হাজার যাত্রী এই ব্যবস্থায় চলাচল করেন।

ইতিহাসের ভেতর দিয়ে একটি ছোট্ট যাত্রা—

ট্রেনের জানালার পাশে বসে একটা বিষয় বারবার মনে হচ্ছিল, মানুষের প্রয়োজন থেকেই অনেক বড় আবিষ্কারের জন্ম হয়। তখন শহরে জায়গা ছিল না, তাই মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, কী করা যায়। আর সেই চিন্তা থেকেই তৈরি হয়েছিল এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা, যা ১২৫ বছর পরও পৃথিবীর অন্যতম অনন্য রেলব্যবস্থা হিসেবে টিকে আছে।তখন মনে হলো, আমি সেই ইতিহাসেরই একজন ক্ষণিকের যাত্রী।

এক শতাব্দীর বেশি আগে যে পথে মানুষ প্রথমবার ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করেছিল, সেই একই পথে আমিও কিছুক্ষণ ভেসে চললাম। মনে হলো, ১২৫ বছরের পুরোনো এক প্রযুক্তির ভেতর দিয়ে বর্তমানকে দেখা, আর একই সঙ্গে অতীতকে ছুঁয়ে আসা যায়। জার্মানির আকাশে ঝুলে থাকা এই ট্রেন শুধু একটি গণপরিবহন নয়। এটি ভুপারটালের ইতিহাস, মানুষের উদ্ভাবনী শক্তির স্মৃতি এবং এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলতে থাকা একটি জীবন্ত গল্প। আর সেই গল্পের একটি ছোট্ট অধ্যায়ের যাত্রী হয়ে ঘুরে এলাম আমিও।

*লেখক: মো. ইকরাম হোসেন, শিক্ষার্থী, জার্মানি