বার্লিনে রমজান
আজকে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলবে ঠিক করল সজীব। সময়ের ব্যবধানে বেশ অসুবিধা। সজীব মাত্র এক বছর হলো একটা স্কলারশিপে জার্মানির বার্লিনে এসেছে। আর দেশে মায়ের যখন রাত ১০টা তখন শীতকালে ওর বিকেল ৫টা! ভার্সিটি থেকে অনেকটা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলো। ফোন পেয়ে মায়ের প্রশ্ন, ‘তোদের ওখানে রমজানের চাঁদ দেখা গেছে?’
সজীব হেসে বলে উঠল, ‘এখানে আকাশ দেখা যায় না, চাঁদ কীভাবে দেখবা?’ রোজা শুরু হতে যাচ্ছে, কাজের মধ্যে এক্কেবারে খেয়াল নেই। এখানে মাত্র দুজন বাঙালির সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে একটা কিয়স্ক (দোকান) পরিষ্কার করার কাজ করে, তারপর নয়টায় ভার্সিটিতে পৌঁছায়। একদিন পাঁচ মিনিট পরে কাজে পৌঁছালে বকা খেয়েছে, বলেছে, ‘আর কখনো সময়মতো না এলে কাজ ছেড়ে দিতে হবে।’ সজীব এখনো জার্মান ভাষা বুঝতে পারে না। তবু বুঝতে পারল, এর পর থেকে সময় মেনে চলাটা খুব জরুরি। রোজা শুরু হয়ে যাবে ভেবে একটা বন্ধুকে ফোন দিল।
বন্ধু আকবর ভাই জানালেন, দেশের এক দিন আগে এখানে রোজা শুরু। সজীব দেশে সব সময় তারাবিহর নামাজ পড়তে মসজিদে যেত।
‘এখানে একটা তুরস্ক মসজিদ আছে, কিছু বাঙালি মুসলিম ওখানে যায়, কাজের পর আপনার সময় হলে একসঙ্গে যেতে পারি, কী বলেন?’ সজীব জিজ্ঞাসা করল ।
আকবর ভাই জানালেন মসজিদে ওনার যাওয়ার সময় হবে না। কারণ, ইফতার মানেই আবেনড ব্রোট (রাতের খাবার), সবাই এটাই করে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল সজীবের। দেশে মায়ের হাতের তৈরি ইফতারির কথা অনেক মনে পড়ছে। বাসার সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করাটা ছিল অনেক আনন্দের। একাই তুরস্ক মসজিদে যাওয়া শুরু করল সজীব। এখানে আজান নেই, নিজেদের একটা বাঙালি মসজিদ নেই আর ঈদে কোনো ছুটি নেই। অনেক ঠান্ডা এখানে কিন্তু ধর্ম ছাড়া নিজেকে ভাবতেই পারে না সজীব। কিন্তু মানুষ জীবনে সব পায় না। তাই কয়েক দিন পর আকবর ভাইকে আবার ফোন দিল, ইফতার পার্টি কীভাবে করা যায়?
ধরলেন আকবরের স্ত্রী, ‘ইফতার পার্টি তো আমাদের এক বন্ধুর বাসায় সামনের শনিবারে আয়োজন করেছে, আপনি আসবেন অবশ্যই।’
সজীব ফোন রেখে ভাবতে থাকে, পার্টি শব্দটা কেমন জানি, পবিত্র রমজান মাসের সঙ্গে মানায় না। নিজেই এখন থেকে ‘ইফতার মাহফিল’ বলবে।
ভাবি জানালেন, প্রত্যেকে একটা কিছু রান্না করে আনবে আর সজীব কিছু একটা আনলেই চলবে। সজীবকে ওখানে কেউ চেনে না।
এখানে একটা তুরস্কদের দোকান আছে। শনিবার সকালে তুরস্ক মিষ্টি ‘বাকলাভা’ কিনল আর ফুল তো কিনতেই হবে, এ দেশের রেওয়াজ।
টেবিল ভরে হাতে তৈরি ডালপুরি, আলুর চপ, পেঁয়াজু আর বিভিন্ন ধরনের দেশি মিষ্টি। অনেক গল্পের মধ্যে জানল, এ দেশে মসজিদের জন্য বাসা ভাড়া নেবে; কিন্তু অনেক ভাড়া! আসলে আহমেদিয়া মসজিদ একটা আছে, তবে বাংলাদেশিদের নিজস্ব জায়গার জন্য সবাই একমত। একজন দায়িত্ব নিতে চাইলেন পরিচিত মহলকে হোয়াটসঅ্যাপ করার আর কয়েকজন অ্যাকাউন্ট আর পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার। সজীব আস্তে করে বলল, ‘আমি ক্লিনিংয়ের দায়িত্ব নিতে চাই।’ সবাই একসঙ্গে হাততালি দিলেন। এবার সবাই মিলে ঈদের জন্য কার বাসায় অনুষ্ঠান হবে সেই প্ল্যান!
‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]