জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বিলোপ: ট্রাম্পের পরিকল্পনা ও এর সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ
মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী, যা ১৮৬৮ সালে গৃহীত হয়েছিল, এটি যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিত করে। এই সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা প্রাকৃতিকীকৃত সব ব্যক্তিই, যারা এখানকার আইনি বিচারাধীন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এবং তাদের রাজ্যের নাগরিক।’ এই নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সবাই, যাঁদের মা–বাবা বৈধ নাগরিক নন কিংবা অবৈধ অভিবাসী, এমনকি অস্থায়ী ভিসাধারী হলেও, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পান। ১৪তম সংশোধনী শুধু অভিবাসীদের জন্যই নয়, বরং এটি আমেরিকান সমাজে সাম্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বিলোপের ব্যবস্থা নেবেন। এ বিষয়ে তিনি অতীতেও বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করেছেন। ২০১৮ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘এটি কংগ্রেসের আইনের মাধ্যমে করা সম্ভব, তবে অনেক আইনজীবীর মতে এটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমেও করা যেতে পারে।’ সম্প্রতি এনবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি পুনরায় উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের এটি বন্ধ করতে হবে।’ যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো উপায়ের কথা উল্লেখ করেননি, তবে নির্বাহী আদেশ বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এটি করার কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার সংবিধানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আইন প্রণয়ন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সরাসরি বাতিল করা সম্ভব নয়। এই অধিকার বাতিল করতে হলে সংবিধানের সংশোধনী প্রয়োজন, যা অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
সংবিধান সংশোধনের ধাপ
১. উভয় কক্ষে (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) দুই-তৃতীয়াংশ ভোট
২. তারপর এটি অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে পাঠাতে হবে এবং ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৮টির অনুমোদন প্রয়োজন
কিন্তু বর্তমান মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে আসনের বিভাজন এমন যে এটি অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তা ছাড়া ট্রাম্প যদি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এটি কার্যকর করার চেষ্টা করেন, তবে এটি সুপ্রিম কোর্টে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।
১. আইনগত জটিলতা
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বিলোপ করা হলে মার্কিন নাগরিকদের তাঁদের শিশুদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্র ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। একটি সাধারণ জন্মসনদ তখন আর নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট হবে না।
২. অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যদি অভিবাসী মা–বাবার সন্তানদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন নতুন ‘অননুমোদিত’ বা অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বাড়বে। এতে দেশটির অভিবাসনব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।
৩. পরিবারবিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা
ট্রাম্প বলেছেন, ‘পরিবার একসঙ্গে রাখতে চাইলে তাদের সবাইকে ফেরত পাঠাতে হবে।’ এর অর্থ, বৈধ মার্কিন নাগরিক শিশুরাও তাদের অভিবাসী মা–বাবার সঙ্গে দেশত্যাগে বাধ্য হতে পারে। এটি মানবাধিকার ও নৈতিকতার বড় প্রশ্ন তুলবে।
৪. সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
এই নীতির ফলে জাতিগত বিভাজন বাড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত পরিবার ও ব্যক্তিদের জীবনযাত্রা ঝুঁকির মুখে পড়বে। অভিবাসীদের ওপর নির্ভরশীল শিল্প খাত ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ, যেখানে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ৩০টিরও বেশি দেশ এই নীতি অনুসরণ করে। এর মধ্যে রয়েছে কানাডা, মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং বেশ কয়েকটি ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশ। অনেক দেশ অবশ্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের পরিবর্তে নিচের পদ্ধতিগুরোর ওপর নির্ভর করে—
১. বংশগত নাগরিকত্ব: মা–বাবার নাগরিকত্বের ওপর নির্ভরশীল
২. প্রাকৃতিকীকরণ: দীর্ঘদিন বসবাসের পর নাগরিকত্ব প্রদান
৩. বিয়ে: বিয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভ
৪. বিনিয়োগ: সম্পদ বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বিলোপের পরিকল্পনা শুধু আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য এক বিরাট হুমকিস্বরূপ। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে গৃহীত এমন একটি পদক্ষেপ দেশের অভিবাসন নীতি ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিতর্ক তৈরি করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। এটি করা হলে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক নীতি ও মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, অন্যদিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা বাড়াবে।