রূপকথার নগরী ভেনিসে

ভোলগনা বিশ্ববিদ্যালয়। ইতালিছবি: লেখকের পাঠানো

পৃথিবীর ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম স্বপ্নের নগরী ইতালির ভেনিস। ভূমধ্যসাগরের ভেনিসীয় উপহ্রদের ১১৮টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই শহরটি যেন সমুদ্রের নীল জলরাশির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক রূপকথা, যা যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়। শেক্‌সপিয়ারের ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’ পড়ার সময় ভেনিস নিয়ে যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল, সেই বইয়ের পাতা থেকে বাস্তবে এই নগরীতে পা রাখার পর যে উচ্ছ্বাস কাজ করেছে, তা বর্ণনাতীত।

ইতালির অভিমুখে যাত্রা

অধ্যাপক ড. লুইজা বুরুনরির আমন্ত্রণে ২০২২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইতালির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে বের হয়ে প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে কোবলেঞ্জ হয়ে পৌঁছে যাই ফ্রাংকফুর্ট-হান বিমানবন্দরে। সেখান থেকে যাত্রা ইতালির দিকে—প্রথম গন্তব্য মিলান, এরপর ভোলোগনায়।

সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে মিলান থেকে বুলেট ট্রেনে চড়ে পৌঁছে যাই রেডিওর জনক গুলিয়েলমো মার্কোনির শহর ভোলোগনায়। রেলস্টেশনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন প্রফেসর ড. লুইজা বুরুনরি। তাঁর সঙ্গে কাটানো ভোলোগনার দুটি দিন ছিল সত্যিই অন্য রকম—হৃদয়ছোঁয়া অভিজ্ঞতায় ভরা।

তিনি আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন ভোলোগনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা—ভোলোগনা গির্জা, ঐতিহাসিক টাওয়ার, বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় ভোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি মার্কোনির ঐতিহাসিক বাড়িও। তাঁর আপ্যায়ন ছিল একেবারেই আপনজনের মতো—যেন প্রবাসে থেকেও বাঙালিয়ানা আতিথেয়তার স্বাদ পেলাম।

ইউরোপে লোকমুখে বলা হয়, ইতালি সভ্য মানুষের দেশ—বন্ধুত্ব ও মানবিকতায় তারা অনন্য। বাঙালিদের সঙ্গে ইতালিয়ানদের এক গভীর মিল রয়েছে—আতিথেয়তা ও আন্তরিকতায়। ইতালিয়ানদের স্বভাবই এমন—রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময় অপরিচিত মানুষকেও হাসিমুখে ‘হ্যালো’ জানাবে, কুশল বিনিময় করে থাকে।

প্রফেসর লুইজার সঙ্গে যখন ভোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলাম, মনে হলো যেন বিশাল কোনো ঐতিহাসিকতার ভেতরে ঢুকে পড়েছি। পুরো শহরটাই যেন একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। গর্বভরে তিনি বললেন, ‘হাসান, এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। এটি ইউরোপে প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। সনেটের প্রবর্তক পেত্রার্কা এখানকার শিক্ষার্থী ছিলেন। এই প্রতিষ্ঠান জন্ম দিয়েছে হাজার হাজার গবেষককে।’

লুইজা আমাকে তাঁর কর্মস্থল, লাইব্রেরি দেখালেন। দেখলাম পৃথিবীর প্রথম অ্যানাটমি টেবিল—যা আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দিন শেষে ঘুরে দেখলাম পৃথিবীর প্রথম আইসক্রিমের দোকান, যা আজও সমানভাবে চালু রয়েছে।

এভাবে দুটি মনোমুগ্ধকর দিন কাটিয়ে পরদিন সকাল আটটায় যাত্রা শুরু করলাম স্বপ্নের নগরী—ভেনিসের উদ্দেশে।

ভেনিসে লেখক
ছবি: লেখকের পাঠানো

রূপকথার নগরীর অভিমুখে—

দুই পাশে সাগরের স্বচ্ছ নীল জলরাশির মাঝখান দিয়ে সকাল নয়টায় জাদুর শহর ভেনিসে প্রবেশ করলাম। রেলস্টেশন থেকে বের হয়েই চোখে পড়ল গ্র্যান্ড ক্যানেলের ওপর ভাসমান শত শত গন্ডোলা নৌকা, যা পর্যটক কিংবা ভেনিসের স্থানীয় লোকজনের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। ভেনিস শহর দেখতে যেমন রূপকথার গল্পের মতো, তেমনি রয়েছে তার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

প্রায় তিন হাজার বছর আগে ভেনিস ছিল একটি বিশাল জলাভূমি। এই শহরের নামকরণ করা হয়েছে ভেনেটি গোষ্ঠীর নাম অনুসারে। খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকে ইতালির উপদ্বীপ এলাকায় রোমান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ভেনিস তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। প্রায় দেড় হাজার বছর পর রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ৬৯৭ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ভেনিস প্রজাতন্ত্রের সূচনা হয়। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের দখলসহ ভেনিস অতিক্রম করেছে নানা প্রশাসনিক ধাপ। ঊনবিংশ শতকে পুরো শহরকে ঢেলে সাজানো হয়—নির্মিত হয় নান্দনিক সব সেতু। ভাবতে অবাক লাগে, মোট ৪১৪.১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৫৬.৮৪ বর্গকিলোমিটার স্থলভাগ দাঁড়িয়ে আছে পানির ওপর।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

দেখে বিস্মিত হতে হয়—পানির ঢেউ অনেক বাড়ির নিচতলা দিয়ে অতিক্রম করে চলে যায় নিজ গন্তব্যে। আমাদের দেশে যেমন বাড়ির নিচতলায় গাড়ি পার্কিং রাখা হয়, ভেনিসে সেখানে রাখা হয় নৌকা কিংবা ছোট ছোট স্পিডবোট। শহরজুড়ে পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় দালান—স্কুল, কলেজ, গির্জা ও অন্যান্য ভবন। এক ভবন থেকে অন্য ভবনে, এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে স্থানীয়রা মূলত নৌকাতেই চলাচল করে, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় গন্ডোলিয়া। শহরের আঁকাবাঁকা নদীগুলো আমাদের সড়কের মতোই তাদের যাতায়াতের মাধ্যম। এখানে ব্যক্তিগত নৌকার পাশাপাশি রয়েছে পাবলিক নৌযানও। কিছু দূর পরপর রয়েছে স্টেশন। দুপুর দুইটার দিকে চোখে পড়ল উচ্চ স্বরে হুইসেল বাজানো ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স।

ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি বরিশালকে বাংলার ভেনিস বলা হয়। কিন্তু বরিশাল আর ভেনিসের বর্তমান চিত্র ভিন্ন। আমাদের বরিশালে ভেনিসের মতো ছোট-বড় নদী আছে ঠিকই, কিন্তু বরিশালের মতো রাস্তাঘাট কিংবা বাস চলাচলের দৃশ্য ভেনিসে কোথাও নেই। গন্ডোলিয়া নৌকা নিয়ে ভেনিসের ছোট ছোট খালে ঘুরতে ঘুরতে ভাবতে লাগলাম—আমাদের দেশের ভাটির অঞ্চলগুলো বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যায়, হাজার হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে যদি ভেনিসের আদলে ঘরবাড়ি নির্মাণ হতো, আর যদি প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি করে নৌকা রাখা যেত, তাহলে হয়তো বন্যার ভয়াবহ থাবা থেকে মানুষ কিছুটা মুক্তি পেত।

হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভেনিসে স্থানীয়দের জীবন পানিতেই সুখ, পানিতেই দুঃখ, পানিতেই প্রেম, পানিতেই বিরহ আবার পানিতেই আধুনিকতার ছোঁয়া। পানির ওপর ভাসমান ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কেট কিংবা প্রশাসনিক ভবন যেন আধুনিকতার ছোঁয়ায় এক অনন্য প্রাচীন নিদর্শন—শিল্পীর নিখুঁত কারুকার্যে ভেসে ওঠা এক জীবন্ত শিল্পকর্ম।

ইউরোপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর নগরী ভেনিস যেন এখানে ছবির মতো গেঁথে আছে। পানির ওপর প্রাচীন প্রাসাদ আর তার প্রতিবিম্ব, নদীর স্বচ্ছ জলরাশি, আকাশের মেঘ—সব মিলিয়ে মনের ভেতর এখনো জাগে বারবার ভেনিসে ফিরে যাওয়ার আকুলতা। ভেনিসের স্থাপত্যশিল্প, নান্দনিক রূপে সাজানো ঘরবাড়ি, মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য খাল, বিশেষ করে গ্র্যান্ড ক্যানেলের ওপর স্থাপিত রিয়ালতো ব্রিজ—ভেনিসের সোনালি দ্বীপ যেন বারবার ডাকছে ফিরে আসার আহ্বানে।

ভেনিস হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকুক আপন মহিমায়, স্বাতন্ত্র্যে, মুগ্ধতায় আর ব্যতিক্রমী ভৌগোলিক পর্যটনশিল্পের অনন্য নিদর্শন হয়ে।