যে জাদু প্রতিদিনের

মায়ের সঙ্গে লেখকছবি: লেখকের পাঠানো

জন্ম থেকে শুরু করে বিদেশের মাটিতে পা রাখার আগপর্যন্ত প্রতিদিন যা দেখতাম, তা যে মস্ত বড় জাদু ছাড়া আর কিছু নয়, তা দেশে ভালোভাবে উপলব্ধি করে উঠতে পারিনি।

সেই জাদু ছিল প্রতিদিন প্রতি বেলায় চোখের সামনে হরেক রকম খাবার পরিবেশনার জাদু।

জাদু নয়তো কী? রোজ সকাল হতে না হতে সামনে খাবার চলে আসত। দুপুর হলে দুপুরের খাবারের জন্য ডাকাডাকি। বিকেল হলে চা, সঙ্গে টা, আবার রাত হলে রাতের খাবারের জন্য ডাক পড়ত। আর এর মধ্যে খিদে পেলে আবদার চলে যেত। মাঝখানে ভার্সিটির হলে থাকা দিনগুলোয় বাসার ভালো খাবারের মর্ম বুঝলেও রান্না তখনো করতে হয়নি।

বিদেশে এসে এসি থাকা আধুনিক রান্নাঘরে হাত পুড়িয়ে টের পেয়েছি, ঘরের কোণে প্রচণ্ড গরমে প্রতিদিন সবার জন্য রান্না করার জাদুকে ছাপিয়ে যায়, এমন জাদু আজ অবধি কোনো জাদুকরই তৈরি করতে পারেনি।

অথচ বাসায় থাকা অবস্থায় বিরক্তও হতাম মাঝেমধ্যে, কাজের মধ্যে খাবারের জন্য ঘন ঘন ডাক পড়ায়। মন হয়তো নিজের মতো করে ভেবে নিত—খাবার তো আসবেই, রোজই আসে। এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার।

এখন বুঝি, এ যে রীতিমতো জাদু! না হলে তিন বেলা সাজানো প্লেটে খাবার চলে আসছে, কিছু ভাবতেই হচ্ছে না আমাকে, কীভাবে সম্ভব! সে খাবার আবার এখনের মতো ফ্রিজে রেখে পাঁচ দিন বসে খাওয়া বাসি খাবার নয়। রান্না করা একদম টাটকা খাবার। খাবার নিয়ে খুঁত কখনো ধরিনি আমি, তবে আমার টালবাহানার সংখ্যা নেহাত শূন্য ছিল না।

আর শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা—প্রতিনিয়ত যে জাদুকর সেই জাদু দেখায়, সে হলো মা।

ছোটবেলার একদিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে। ঘুম থেকে ওঠার পরপর মা জিজ্ঞাসা করল, আজকে কী খাবি? যা বলবি, সেটা দেব। আমি তখন বেশ ছোট, ভাবলাম এমন কিছু বলি, যা এই সকাল সকাল দেওয়া একদমই সম্ভব নয়। বললাম, পোলাও–মাংস। মা কিছুক্ষণের মধ্যে পোলাও–মাংস নিয়ে এল। আমার ছোট্ট মাথায় কিছুতেই ধরল না, কীভাবে এটা সম্ভব ছিল। এরপরের একটা সময়জুড়ে রূপকথা পড়া আমার মনের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে মায়ের একটা জাদুকরি হাঁড়ি বা এমন কিছু আছে, যেখানে নির্দিষ্ট দিন পরপর যা চাই, তেমন খাবার পাওয়া যায়।

বাবাও কম যায় না। খেতে ইচ্ছা করছে বলে পাইনি, এমন কোনো কিছু আজ পর্যন্ত মনে পড়ে না। যে বিস্কুট ভালো খাই, সে বিস্কুটের কৌটা তত দিন পর্যন্ত একটানা ভরা পেয়েছি, যত দিন না আমার নিজের ভালো লাগা বন্ধ হচ্ছে!

ভার্সিটিতে থাকাকালে দেশে বসে যা গবেষণা করেছি, যেসব বনের মোষ তাড়িয়েছি, তার সিকি ভাগও সম্ভব হতো না যদি প্রতি বেলা খাবারের চিন্তা করতে হতো। এখন প্রতি বেলায় কী খাব, সেই চিন্তা দূরে সরাতে পারলে মাথার বোঝা অর্ধেক নেমে যেত। অথচ যখন প্রতিদিন হাতের কাছে পেতাম, তখন এর গুরুত্ব আজকের মতো বুঝতে পারিনি।

বিদেশে এসে সেন্ট্রাল এসি থাকা আধুনিক রান্নাঘরে হাত পুড়িয়ে রান্না করার পরে টের পেয়েছি, ঘরের এক কোণে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে প্রতিদিন সবার জন্য রান্না করার জাদুকে ছাপিয়ে যায়, এমন জাদু আজ অবধি কোনো জাদুকরই তৈরি করতে পারেনি।

৩৬৫ দিন একজন মানুষ কীভাবে এই জাদু দেখাতে পারে?

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]