কংক্রিটের শহরে ডানার স্বাধীনতা
নেপালে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর সম্প্রতি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে আসা। কাঠমান্ডু উপত্যকার পাহাড়, প্রাচীন মন্দির আর তুলনামূলক শান্ত জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার পর কুয়ালালামপুর প্রথম দর্শনেই ধরা দেয় এক ভিন্ন বাস্তবতায় উঁচু উঁচু ভবন, ব্যস্ত সড়ক আর আধুনিক নগর জীবনের নিরবচ্ছিন্ন গতি। নেপালের ধীর সময়ের ছন্দ থেকে বেরিয়ে এই দ্রুতগতির শহরে এসে প্রথমে কিছুটা বিস্ময় জাগলেও, কুয়ালালামপুরের বুকেই যে প্রকৃতির এক টুকরা নীরব ও অবাধ আশ্রয় রয়েছে, তা খুব দ্রুতই সেই বিস্ময়কে বদলে দেয় অন্য এক অনুভূতিতে। কুয়ালালামপুর বার্ড পার্কে প্রবেশ করলেই সেই অনুভূতির বাস্তব রূপ চোখে পড়ে। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে পার্দানা বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরে ঢুকলেই মনে হয়, যেন হঠাৎ করেই অন্য এক জগতে চলে এসেছি যেখানে মানুষের উপস্থিতি গৌণ, আর পাখিরাই প্রধান চরিত্র।
এই বার্ড পার্কটি আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয় ১৯৯১ সালে, মালয়েশিয়া সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগে, বিশেষ করে কুয়ালালামপুর নগর কর্তৃপক্ষ ও পর্যটন বিভাগের তত্ত্বাবধানে। এর মূল লক্ষ্য ছিল দুটি—একদিকে শহরের ভেতর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা, অন্যদিকে মালয়েশিয়াকে একটি প্রকৃতিবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই শুরু থেকেই এখানে পাখিদের খাঁচায় বন্দী না রেখে তাদের মুক্তভাবে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা এই পার্ককে বিশ্বের অন্যান্য বার্ড পার্কের তুলনায় আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
প্রায় ২০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ‘মুক্তভাবে হাঁটা যায় এমন পাখির উদ্যান’ হিসেবে ধরা হয়। পার্কের ভেতর পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে জলপ্রপাত, ঝরনা, ছোট জলাধার ও ঘন সবুজ গাছপালা, যাতে পাখিরা নিজেদের স্বাভাবিক আবাসের কাছাকাছি পরিবেশে থাকতে পারে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সামনে দিয়ে হেঁটে যায় ময়ূর, মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় রঙিন টিয়া পাখি, আবার কোথাও পানির ধারে দল বেঁধে বসে থাকতে দেখা যায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখিকে। বর্তমানে এখানে তিন হাজারের বেশি পাখি রয়েছে, যার প্রজাতির সংখ্যা দুই শতাধিক। মালয়েশিয়ার স্থানীয় পাখির পাশাপাশি আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের পাখিও এখানে দেখা যায় একই সঙ্গে, যা পার্কটিকে একটি বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের প্রদর্শনীতে রূপ দিয়েছে। এই পুরো পরিবেশে মানুষ এখানে মূলত দর্শক মাত্র, আর প্রকৃতিই থাকে কেন্দ্রে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
প্রতিবছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসেন কুয়ালালামপুর বার্ড পার্ক দেখতে। চীন ও জাপানসহ পূর্ব এশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে আগত পর্যটকদের উপস্থিতি এখানে চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে পরিবার ও শিশুদের কাছে পার্কটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, কারণ এখানে বিনোদনের পাশাপাশি শেখার সুযোগ রয়েছে। কুয়ালালামপুর বার্ড পার্ক শুধু ঘোরাঘুরির জায়গা নয়; এটি পরিবেশ–সচেতনতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়, যেখানে পাখির জীবন, পরিবেশের ভারসাম্য এবং প্রকৃতি রক্ষায় মানুষের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়।
আলোকচিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও পার্কটি ব্যতিক্রমী। প্রাকৃতিক আলো, সবুজ পটভূমি ও পাখিদের স্বতঃস্ফূর্ত চলাচল ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী হয় এক নীরব গল্পের মতো, যেখানে মানুষ প্রকৃতির অতিথি হয়ে দাঁড়ায়, আর পাখিরা নিজেদের মতো করে বাঁচে।
কুয়ালালামপুর বার্ড পার্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন আর প্রকৃতি একে অপরের শত্রু নয়। সঠিক পরিকল্পনা, সদিচ্ছা ও পরিবেশ–সচেতনতার মাধ্যমে কংক্রিটের শহরের মাঝেও এমন এক জায়গা তৈরি করা সম্ভব, যেখানে পাখিরা ডানা মেলে উড়তে পারে ও মানুষ শিখতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে নিঃশব্দে বাঁচার ভাষা।
লেখক: মো. মাহমুদুল হাসান খলিফা, আলোকচিত্রী, কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া