উড়োজাহাজে এক রাত দুই নারীর মাঝখানে!
দূর পরবাস-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
রাইন এয়ার, ইউরোপের অন্যতম বাজেট এয়ারলাইনস। এটি সস্তা ভ্রমণের জন্য জনপ্রিয়, তবে এর পরিষেবায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা যাত্রার অভিজ্ঞতাকে জটিল করে তোলে। টিকিটের দাম কম শুনলে ভালো লাগলেও বাস্তবে এ এয়ারলাইনসের যাত্রা মানে নিজ দায়িত্বে সবকিছু সামলানোর প্রস্তুতি নেওয়া। ভুল হলে পুরো টিকিটের মূল্য হারানোর ঝুঁকি বরাবরই থাকে। সিট এলোমেলোভাবে বরাদ্দ করা হয়, যদি না বাড়তি অর্থ দিয়ে পছন্দের সিট বুক করা হয়।
আমরা মালাগা থেকে স্টকহোমের ফ্লাইট ধরেছি। জানুয়ারির শীতল রাত, সময়টা প্রায় ১১টা। বোর্ডিং শুরু হতেই মনে হলো যেন একটি মিশন শুরু হয়েছে—সবাই দৌড়াচ্ছে, নিজেদের জায়গা ঠিক করতে ব্যস্ত। আমি এবং আমার স্ত্রী মারিয়া একসঙ্গে থাকলেও বাজেট এয়ারলাইনসের নিয়মে আমাদের সিট আলাদা হয়ে পড়েছে। প্রথমে একটু বিরক্ত লাগল, তবে ভাবলাম, রাতের ফ্লাইট, সবাই ঘুমাবে, তেমন কিছু হবে না।
প্লেনের ভেতরে ঢুকতেই আরেক রকম দৃশ্য। কেউ জানালা ধরার লড়াই করছে, কেউ আবার ক্যারি-অন ব্যাগ জায়গায় রাখার জন্য ব্যস্ত। আমার সিট পড়েছে এক নারী এবং তরুণীর মাঝখানে। স্ত্রী মারিয়া একটু দূরে বসেছে। গা ঝাড়া দিয়ে ভ্রমণের প্রস্তুতি নিলাম। ঘুম হবে, বই পড়ব, হয়তো কিছুক্ষণ আকাশ দেখব—এমন পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ভেতরের গল্প যে অন্য রকম হতে চলেছে, তা তখনো বুঝিনি।
উড়োজাহাজ উড়তে শুরু করার কয়েক মিনিট পরই ডান পাশের নারী আমার কাঁধে মাথা রেখে দিব্যি নাক ডেকে ঘুমাতে শুরু করলেন। তাঁর নাক ডাকার শব্দ যেন কেবিনজুড়ে প্রতিধ্বনি হচ্ছিল। বাঁ পাশের তরুণীকে মনে হলো একটু নার্ভাস, কিন্তু হঠাৎ করে সে আমার হাত শক্ত করে ধরে নিজের সিটে ঝুঁকে পড়ল। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। রাতের ফ্লাইট, সবাই হয়তো ঘুমাতে চায়, কিন্তু এভাবে? অস্বস্তি বাড়তে লাগল।
আরও কিছুক্ষণ পর আমার প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হতে লাগল। কিন্তু সমস্যা হলো, আমি নড়তেই পারছি না। ডান দিকে নারী এমনভাবে কাঁধ চেপে ধরে আছেন যেন আমি তাঁর বালিশ আর বাঁ দিকের তরুণী আমার হাত শক্ত করে ধরে আছেন। আশপাশের যাত্রীরা নিজেদের মতো, কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ মুঠোফোন স্ক্রল করছেন। আমি টয়লেটে যাওয়ার উপায় খুঁজছি, কিন্তু যেন ফাঁদে আটকা পড়েছি।
এভাবে যাত্রার শুরু থেকেই রাতটা একটু অন্য রকম লাগছিল। কিন্তু এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির পর কী ঘটতে যাচ্ছে, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। প্রস্রাবের চাপ অনুভব করছি, কিন্তু দুই পাশে দুজন এমনভাবে আমাকে আটকে রেখেছেন যে টয়লেটে যাওয়া তো দূরের কথা, নড়াচড়াও সম্ভব নয়।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। ভাবলাম, ডান পাশের নারীর হয়তো একটু পর ঘুম ভাঙবে বা বাঁ পাশের তরুণীটি হয়তো একটু সরবেন। কিন্তু না, সময় যত গড়াচ্ছে, আমার অস্বস্তি ততই বাড়ছে। চাপ ধীরে ধীরে অসহনীয় হয়ে উঠছে। অবশেষে ডান পাশের জনকে আস্তে ধাক্কা দিয়ে বললাম, ‘ম্যাম, সরি, আমাকে উঠতে হবে।’ কিন্তু উনি একটুও না নড়ে আরও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। তাঁর নাক ডাকার শব্দ যেন আমার ধৈর্যকে পরীক্ষা নিচ্ছে।
এরপর বাঁ পাশের তরুণীর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তুমি কি আমার হাত ছাড়বে? আমাকে উঠতে হবে।’ তরুণী যেন আমার কথার পরও কিছু শুনতে পাচ্ছে না। উল্টো সে আমার হাত আরও শক্ত করে ধরে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। আমার মনের মধ্যে তখন নানা চিন্তা, ‘এখন আমি কী করব? কোনো ভুল–বোঝাবুঝি হলে? কেউ যদি এভাবে আমাকে দেখে?’ ঘামতে শুরু করলাম।
এদিকে প্লেনের ভেতরে আলো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগই ঘুমাচ্ছে। কয়েকজন কেবিন ক্রু সামনের দিকে কাজ করছেন। আমি হাত নাড়তে গিয়ে দেখলাম তাঁরা আমার দিকে তাকাচ্ছেন না। এদিকে আমার সহধর্মিণী মারিয়া দূরে বসে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। মনে হলো, এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য আমাকে নিজের বুদ্ধি খাটাতে হবে।
অবশেষে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক কেবিন ক্রুকে হাত তুলে ডাকলাম। ‘ম্যাম, আমার একটু সাহায্য দরকার। আমি টয়লেটে যেতে পারছি না, এরা আমাকে উঠতে দিচ্ছে না।’ কেবিন ক্রু প্রথমে ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। সম্ভবত তিনি আমার কথার সারমর্ম ধরতে পারছিলেন না। আমি হাতের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করলাম। বুঝতে পেরে তিনি কিছুটা হতাশার ভঙ্গিতে ডান পাশের মহিলাকে ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা করলেন।
কিছুক্ষণ পর নারীটি জেগে উঠে একটু হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎই বেশ লজ্জিত ভঙ্গিতে সরি বললেন। আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি, এর মধ্যেই বাঁ পাশের তরুণীটি আচমকা উঠে হালকা চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ওহ! সরি! আমি কী করলাম?’ তার চেহারায় গভীর অপরাধবোধের ছাপ ফুটে উঠল।
আমি আর বেশি কিছু না বলে তাড়াহুড়া করে উঠে টয়লেটের দিকে ছুটে গেলাম। অবশেষে একটু শান্তি পেলাম। ফিরে এসে শুনতে পেলাম, কেবিন ক্রু তাদের সঙ্গে কিছু কথা বলছেন। পরে জানতে পারলাম, তাঁরা দুজনই ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছিলেন। লং ডিসট্যান্স ফ্লাইটে অনেকেই স্লিপিং পিল বা অ্যালকোহল গ্রহণ করেন, যাতে যাত্রা আরামদায়ক হয়। তবে কখনো কখনো এসবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এমন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে।
এ অভিজ্ঞতা আমাকে শুধু অস্বস্তিতেই ফেলেনি, বরং কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। ভ্রমণে নিজেকে সচেতন রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যের আচরণের অনিচ্ছাকৃত প্রভাব কীভাবে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে—এ বিষয়গুলো নতুন করে উপলব্ধি করলাম।
ইউরোপের জীবনযাত্রার ধরন এবং সামাজিক মূল্যবোধ অনেকের কাছে রহস্যময় মনে হয়। বিশেষ করে যাঁরা এশিয়ার মতো তুলনামূলক রক্ষণশীল সমাজ থেকে আসেন, তাঁদের কাছে ইউরোপীয় সংস্কৃতি একধরনের ‘কাল্পনিক স্বাধীনতা’র ধারণা তৈরি করে। বাস্তবতা যদিও অনেকটাই আলাদা। এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ একে অপরের পরিপূরক।
আমার এই ছোট্ট ঘটনাটি ইউরোপীয় সমাজের একটি গভীর দিক তুলে ধরে। একদিকে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে অসাবধানতা, অন্যদিকে কেবিন ক্রুর দায়িত্বশীল ভূমিকা—দুটিই এই সমাজের বাস্তব দিকগুলোকে চোখে আনে। ইউরোপে ব্যক্তিগত জায়গার প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যকে সম্মান দেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে বিরক্ত করে, সেটি শুধু সামাজিকভাবে ঘৃণিত নয়, আইনতও কঠোরভাবে শাস্তিযোগ্য।
বাংলাদেশে থাকার সময় এ ধরনের আচরণের উল্টো দিক দেখেছি। বাসে কোনো মেয়ে যদি কোনো ছেলের পাশে বসে, ছেলেটি প্রায়ই ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুমের ভান করে মেয়েটির গায়ে ঝুঁকে পড়ে। কখনো মেয়ে অস্বস্তিতে সরে যেতে বাধ্য হয়, আবার কখনো পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এ ধরনের আচরণ আমাদের সমাজে প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
ইউরোপে এমন কিছু কল্পনাও করা যায় না। এ সমাজে প্রতিটি সম্পর্ক বা শারীরিক সংস্পর্শের ভিত্তি একটাই—‘সম্মতি’। এটি শুধু সামাজিক শালীনতা নয়, আইনের কঠোর নিয়ম। কেউ যদি অন্য কারও সঙ্গে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আচরণ করে, সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। মদ্যপান বা ঘুমের ট্যাবলেটের প্রভাবে কেউ যদি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং অন্যের প্রতি কোনো অগ্রহণযোগ্য আচরণ করে, সেটিও একই রকম অপরাধ হিসেবে দেখা হয়।
তবে ইউরোপীয়দের এই উদারতা অনেকের কাছে ভুল ব্যাখ্যা পায়। বিশেষ করে অনেক দক্ষিণ এশীয়র কাছে ইউরোপ যেন ‘অবাধ মেলামেশার দেশ’। কিন্তু এটি একটি বড় ধরনের ভুল ধারণা। এখানে স্বাধীনতা থাকলেও তা দায়িত্ব ও সম্মানের সঙ্গে যুক্ত। যেকোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে।
এ ঘটনাটি আমাকে আরও একটি বিষয় ভাবতে বাধ্য করেছে। ইউরোপীয় সমাজের এই মূল্যবোধের শিক্ষা আমাদের সমাজেও কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যদি আমরা মেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মানের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারি, তবে আমাদের সমাজও আরও নিরাপদ ও উন্নত হতে পারে।
আমার মনে হলো, এ পার্থক্য শুধু ভৌগোলিক বা সংস্কৃতির নয়, এটি দায়িত্বশীলতার এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়। ইউরোপে কেউ কাউকে ভালো লাগলে সরাসরি প্রস্তাব দেওয়ার রীতি প্রচলিত, কিন্তু তা অবশ্যই সম্মানের সঙ্গে করা হয়। কারও ব্যক্তিগত গুণের প্রশংসা করাও এখানে স্বাভাবিক বিষয়। তবে সবকিছুই শালীনতা ও সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশের সমাজ এবং ইউরোপীয় সমাজের মধ্যে পার্থক্য কেবল ভৌগোলিক নয়, এটি ভাবনার গভীরতায়, মূল্যবোধে এবং আচরণের ক্ষেত্রেও প্রকট। একটি জায়গায় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক নিয়মের কড়াকড়ি, অন্য জায়গায় স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের ওপর জোর।
বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে ছেলে–মেয়েদের মেলামেশায় অদৃশ্য একটি সীমারেখা টানা থাকে। প্রকাশ্যে একসঙ্গে চলাফেরা, আড্ডা দেওয়া কিংবা সম্পর্ক নিয়ে কথা বলা অনেক সময়ই বিতর্কিত হয়। ফলে সম্পর্কগুলোতে স্বচ্ছতার অভাব তৈরি হয়। এর পাশাপাশি অনেক পুরুষের মধ্যে নারীদের প্রতি একটি শ্রদ্ধাহীন দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেক সময় পাবলিক বাসে মেয়েদের গায়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘেঁষা বা বিরক্ত করা—যা আমাদের দেশে খুবই সাধারণ অথচ ভয়ংকরভাবে ভুল একটি আচরণ।
এমন বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইউরোপীয় সমাজ। এখানে মেলামেশার ক্ষেত্রে কোনো অদৃশ্য সীমারেখা নেই, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গেই রয়েছে আইন ও সামাজিক নীতির কঠোর প্রয়োগ। ইউরোপে কারও প্রতি খারাপ আচরণ কেবল একটি নৈতিক অপরাধ নয়, বরং এটি আইনগত শাস্তিরও যোগ্য।
এখানে ‘সম্মতি’র ধারণা শুধু সম্পর্কের মধ্যে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা ও অন্যকে সম্মান জানানো এ সমাজের ভিত্তি। কেউ কারও জায়গায় অযথা হস্তক্ষেপ করবে না, কিংবা কোনোভাবে তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরে অনুপ্রবেশ করবে না। এটি এমন একটি শিক্ষা, যা শুধু ইউরোপ নয়, সারা বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ইউরোপীয় এই মূল্যবোধ অনেক সময় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। বাংলাদেশে অনেকের ধারণা, ইউরোপ মানেই ‘অসীম স্বাধীনতার দেশ’, যেখানে যা খুশি তা করা যায়। বাস্তবে এটি একেবারেই ভ্রান্ত। ইউরোপের সমাজব্যবস্থায় স্বাধীনতা থাকলেও সেটি দায়িত্ব এবং আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানে কেউ কারও প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হলে তাকে শুধু সামাজিকভাবে নয়, আইনি ব্যবস্থাতেও জবাবদিহি করতে হয়।
তবে এই স্বাধীনতার মধ্যে একটি গভীর শৃঙ্খলাও কাজ করে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি আরও স্পষ্ট। যদি কেউ কাউকে ভালোবাসে, তবে তা সরাসরি প্রকাশ করা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রকাশের মধ্যে থাকে শালীনতা ও সম্মান। কেউ কারও প্রতি জোর-জবরদস্তি বা অসম্মানজনক আচরণ করলে সেটি কঠোরভাবে দমন করা হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ শিক্ষাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমাদের সমাজে মেয়েদের প্রতি যে অসম্মান এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রায়ই দেখা যায়, তা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের মূল্যবোধে পরিবর্তন আনতে হবে। মেয়েদের প্রতি সম্মান দেখানো ও তাঁদের স্বাধীনতাকে সম্মান করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
আমাদের সমাজের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, সম্পর্কের ক্ষেত্রে লজ্জা বা দ্বিধা। অনেকেই ভালো লাগা বা প্রশংসা প্রকাশ করতে ভয় পায়। ইউরোপে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। ভালো লাগলে সরাসরি সম্মানের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়। এটি সম্পর্কের মধ্যে স্পষ্টতা ও শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করে। আমার মনে হয়, ইউরোপীয় এই মূল্যবোধ শুধু একটি সমাজের উন্নতির জন্য নয়, বরং ব্যক্তি চরিত্র গঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একে শুধু স্বাধীনতার শিক্ষা নয়, বরং দায়িত্ব এবং সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধার শিক্ষা বলাই সঠিক। প্রতিটি ভ্রমণ আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা দেয়, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। আমার এই ফ্লাইটের ঘটনা হয়তো প্রথমে অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর শিক্ষা আমাকে বাধ্য করেছে বিষয়গুলো নতুন করে ভাবতে।
সবার আগে যেটি মনে হয়েছে, তা হলো ভ্রমণের সময় নিজের চারপাশ সম্পর্কে সচেতন থাকা কতটা জরুরি। দীর্ঘ যাত্রায় শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি বজায় রাখতে প্রস্তুতি এবং সতর্কতা অপরিহার্য। অনেকেই দীর্ঘ ফ্লাইটে ঘুমানোর জন্য ঘুমের ট্যাবলেট গ্রহণ করেন, কিন্তু এর সঙ্গে আসে দায়িত্ববোধের প্রশ্ন। ট্যাবলেট বা অ্যালকোহলের প্রভাবে এমন কিছু করা উচিত নয়, যা অন্য কারও জন্য অস্বস্তির কারণ হয়। এটি কেবল ভদ্রতা নয়, বরং একটি নৈতিক দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, নতুন সমাজ বা সংস্কৃতিতে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সেখানকার নিয়মকানুন ও মূল্যবোধ সম্পর্কে জানাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের মতো দেশে সম্পর্ক, স্বাধীনতা এবং সম্মান একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এখানে কারও ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ করলে তা শুধু সামাজিক নয়, আইনি শাস্তির কারণও হতে পারে। এটি একটি শিক্ষা, যা সারা বিশ্বের জন্য প্রাসঙ্গিক।
আমাদের দেশে এ ধরনের মূল্যবোধ এখনো সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশে অনেক সময় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা, অশালীনতা ও সম্মানের অভাব দেখা যায়। মেয়েদের প্রতি খারাপ আচরণ বা অশোভনীয় দৃষ্টিভঙ্গি একাধিক সামাজিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ অন্যকে সম্মান দেওয়া ও নিজের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকা একটি উন্নত সমাজের মূল ভিত্তি।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি উপলব্ধি করেছি যে স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক। যেকোনো সমাজেই বিশেষ করে এমন পরিবেশে যেখানে স্বাধীনতা বেশি, সেখানকার মানুষদের নিজের আচরণের জন্য আরও বেশি সচেতন হতে হয়। ইউরোপীয় সমাজে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকলেও এটি আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কাউকে বিরক্ত করা বা অসম্মান করার কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে আমাদের সমাজে অনেক সময় ভালো লাগা বা প্রশংসা প্রকাশ করাকে অপরাধের মতো মনে করা হয়। অথচ এটি যদি শালীন এবং সম্মানের সঙ্গে করা হয়, তবে এটি সম্পর্কের উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। কাউকে ভালো লাগলে তাকে তা বলা, তার কোনো গুণের প্রশংসা করা—এগুলো কোনো অপরাধ নয়। বরং এটি একটি ইতিবাচক মানসিকতার প্রতিফলন।
এ ঘটনা আমাকে শিখিয়েছে, ভিন্ন সংস্কৃতি ও পরিবেশে নিজেকে সংযত রাখার গুরুত্ব কতটা।
আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, চেনা কিংবা অচেনা পরিবেশে, আমাদের উচিত অন্যকে সম্মান দেওয়া এবং নিজের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকা। ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে চলার সময়, শুধু নতুন পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো নয়, বরং সেই সমাজের আইন, মূল্যবোধ এবং আচরণগত নিয়মগুলোকে পুরোপুরি আত্মস্থ করা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে আমরা শুধু আমাদের চরিত্র গঠন করি না, বরং সেই সমাজের প্রতিও দায়িত্বশীল হয়ে উঠি।
জীবনের প্রতিটি ছোট ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষা হতে পারে, যদি আমরা তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি। আমার এ ফ্লাইটের অভিজ্ঞতা ছিল এমনই একটি ঘটনা, যা আমাকে শুধু নিজের ভ্রমণ অভ্যাসের দিকে নয়, বরং ইউরোপীয় সমাজের মূল্যবোধ এবং দায়িত্বশীল আচরণের দিকেও গভীরভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। এমনকি এ অভিজ্ঞতা আমাকে আরও বড় পরিসরে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে—কীভাবে আমাদের দেশের সমাজ এবং সংস্কৃতির মধ্যে বেশ কিছু জায়গায় সংস্কার প্রয়োজন, বিশেষ করে নারীদের প্রতি সম্মান ও শালীনতার দিক থেকে।
আমরা যখন ভিন্ন কোনো দেশে বা সংস্কৃতিতে যাই, তখন শুধু নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যথেষ্ট নয়। বরং আমাদের সেই সমাজের সামাজিক, আইনগত এবং নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং সচেতনতা থাকতে হবে। আমাদের সেই সমাজের আচরণগত মানের সঙ্গে নিজেদের আচরণকে মিলিয়ে নিতে হবে এবং একে অপরকে সম্মান দিয়ে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে বিশেষ করে আমাদের সমাজে অনেক জায়গায় এখনো মেয়েদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ প্রচলিত। পাবলিক পরিবহনে, কর্মস্থলে, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অনেক সময় এমন অভিজ্ঞতা ঘটে। এসব সমস্যা কমানোর জন্য আমাদের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন প্রয়োজন।
ইউরোপের মতো দেশে সম্মানের সঙ্গে ভালো লাগা প্রকাশ করা, সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং অন্যের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সম্মান করা একটি স্বাভাবিক বিষয়।
এ বিষয়টি আমাদের সমাজে প্রচলিত হওয়া উচিত। তবে এটি শুধু স্বাধীনতার বিষয় নয়, বরং এটি একটা দায়িত্বেরও ব্যাপার। একে অপরকে সম্মান দেওয়া এবং শালীনতা বজায় রেখে সম্পর্ক তৈরি করা, শুধু সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে না, বরং এটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য।
জীবনের যেকোনো অবস্থায়, যেকোনো পরিবেশে আমাদের দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক আচরণ করা উচিত। এটি শুধু আমাদের ব্যক্তিগত চরিত্র গঠনের জন্য নয়, বরং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের সবার কর্তব্য, যে সমাজে বাস করি সেখানে প্রত্যেকের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো। একটি উন্নত ও সভ্য সমাজ গড়ে ওঠে যখন মানুষ একে অপরকে সম্মান করতে শেখে এবং নিজের সীমার মধ্যে থাকে।
বিশ্বের যেখানেই যাই না কেন, স্থানীয় সংস্কৃতি, আইন এবং সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতনতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যত বেশি আমরা বিভিন্ন সমাজের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি জানব, তত বেশি নিজেদের মধ্যে কিছু নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারব। এটি শুধু আমাদের চরিত্রকে সমৃদ্ধ করবে না, বরং সমাজের প্রতিও আমাদের দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে।
আমার এ অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এমন শালীনতা থাকা উচিত, যা সবাইকে সম্মানের সঙ্গে মূল্যায়ন করে। এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় কীভাবে নিজেদের এবং অন্যদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। এটি একা নয়, সমগ্র সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে।
একটি উন্নত সমাজ গড়ে ওঠে দুটি মূল উপাদানে—অন্যকে সম্মান দেওয়া এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা। যদি আমরা সবাই এই দুটি গুণ ধারণ করি, তবে আমাদের সমাজ আরও সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ হবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ আরও ভালো হবে।
*লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক