আত্মশুদ্ধি
ক্লাস শেষে রকিব বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এ সময়ে সহকর্মী মিস্টার রাতুল ডাকল।
‘আপনি শুনলাম একটা বাড়ি কিনেছেন?’
প্রশ্ন শুনে একটু অবাক হলেও রকিব ঘুরে ওনাকে বলল, ‘হাঁ, জানেন তো আমাদের আগের হেডমাস্টার ছিলেন আমার আব্বার বন্ধু, উনি অসুস্থ আর এই তো কয়েক মাস হলো কিনেছি, বাড়িটা ছোট, দেখতে আসবেন সময় করে।’
রাতুল খুশি হয়ে বলল, ‘অবশ্যই চেষ্টা করব।’
রকিব এই টিচারকে বেশ সম্মান করে। এখানে জয়েন করার পর স্কুলে ছাত্ররা বেশির ভাগ স্কুল ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করত, তখন মিস্টার রাতুলকে সঙ্গে করে হেডমাস্টারের কাছে গিয়ে রকিব বলেছিল, ‘আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যদি আপনি ছাত্রদের স্কুল হাজিরা দেওয়ার উদ্যোগ না নেন, তাহলে এ স্কুল আর চলবে না, এর জন্য যা যা প্রয়োজন সেটাই করব।’ এর পর থেকে ছাত্র আসা শুরু হয়, আর হেডমাস্টার একটু ভয়ে ভয়ে থাকেন।
রিয়াকে জানাল কল দিয়ে, আজকে বাসায় আসতে দেরি হয়ে যাবে। অসুস্থ হেডমাস্টারকে ফেরার পথে দেখে আসবে।
রিয়াও আর একটা স্কুলে অঙ্কের টিচার। রিকশায় উঠল, আজকে বৃহস্পতিবার। তাই বেশ খুশি মনে বাসায় ফিরছে। দুইটা দিন ছুটি। বড় রাস্তার ওপরে ওদের বাড়ি, মাত্র ছয় মাস হলো কিনেছে। নিজেদের সব সঞ্চয় শেষ। ছোট হলেও রিয়ার অনেক ভালো লেগেছিল। ঢুকেই একটা বারান্দা, দুইটা ঘর, ভেতরের দিকে আরও একটা বারান্দা, সেখানেই টয়লেট আর অন্য পাশে রান্নাঘর। বারান্দা থেকে নামলেই বড় উঠান, চিন্তা করেই মনটা খুব আনন্দে ভরে উঠল বাগান করার শখ সব সময়ে ছিল। ফেরার পথে তাড়াতাড়ি করে কিছু লাউ আর পেঁয়াজের বিচি কিনে নিল। বেলা দুইটা বেজে গেল। বাসায় ফিরেই রান্না ঘরে ঢুকল, ঠিক তখনই প্রতিবেশীর আগমন। সালেহা আপা ভেতরে এসে বসলেন। ‘আপনাকে বাসায় ঢুকতে দেখে ভাবলাম দেখা করে আসি, আপনি তো সময় পান না।’ রিয়া এত কাজের মধ্যে চা বানানোর কথা ভুলে গেল। সালেহার গায়ে অনেক গয়না দেখে জিজ্ঞাসা করে বসল, ‘বিয়ে খেতে যাচ্ছেন? অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে।’
না না, দেখো না- গয়না পরার কোনো সুযোগ পাই না, দেখো গলার এটা আমার হাজব্যান্ডের দেওয়া। রিয়ার এ অসময় মেহমান দেখে মেজাজ একটু খারাপ ছিল। তার ওপর দুনিয়ার যত আবর্জনা সালেহাদের রান্না ঘরের জানলা দিয়ে ওদের উঠানে ফেলে। বেশ কয়েকবার সুন্দর করে বলার পরও ব্যাপারটা বন্ধ হয়নি। তারপরও রিয়া বলে বসল, বাগান করা আমার আর রকিবের খুব পছন্দের, আর পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকলে মশাও কম হয়। আপনি একটু দেখবেন, আবর্জনা তো বাস্কেটে ফেললে ভালো হয়।’
সালেহা একটু বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘তাই নাকি? ঠিক আছে ব্যাপারটা দেখব।’ বলার গর্ব ভরা ভাব দেখে রিয়া আরও বিরক্ত। রান্নার ছোটাছুটি করতে দেখে উনি চলে গেলেন।
ভদ্রতা করে রিয়া, ‘আবার আসবেন কিন্তু, বিকেল হলে একটু গল্প করা যেত।’
দুপুরের রোদ একটু পড়ে গেছে। উঠানে এসে দাঁড়ালেন রিয়া। কোথায় কতটুকু রোদ্দুর আসে আর কোথায় কোন গাছ, সেটা রকিবের সঙ্গে ঠিক করেছে। সালেহা আপার গয়না পরে অসময়ে দেখা করতে আসাটা চিন্তা করে একটু মজা পেল। রিয়ার ধারণা অলংকার মানুষকে অহংকারী করে। এত ধনী মানুষ অথচ এত অপরিষ্কার কেন। ভাবল, পরিচ্ছন্নতার জন্য পয়সার দরকার হয় না।
রকিব কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। উঠান তো একটা খোয়া–ইটে আর আবর্জনা দিয়ে ভরা ছিল। একটা বুদ্ধি বের করে সব আবর্জনা জড়ো করে পুরো উঠান থেকে ইট পাটকেল আলাদা করে নিল। একটা পুরোনো টিনের অংশ আর ইটের টুকরো দিয়ে সার বানানোর জন্য জায়গা করে ফেলল।
রিয়া খুবই খুশি। শনিবার সকালে উঠানের গা ঘেঁষে বারান্দার পাশ দিয়ে পেঁয়াজের বিচি মাটিতে ঢোকাতে ঢোকাতে একটা কিছু চক চক করে উঠল। একটা সোনার আংটি বলেই মনে হলো। মূল্যবান। ধোয়ার পর জিনিসটা দেখে রকিবকে দেখাল। রকিব বলল, ‘কি আশ্বর্য, ড্রেনের পাশের মাটির মধ্যে পেলে!’
রিয়ার ধারণা, পাশের বাড়ি থেকে ময়লা ফেলার সময় নিশ্চয়ই এখানে ছুটে পড়েছে। রকিবের মনে হলো যাদের থেকে বাড়ি কেনা, তাদের আগে জিজ্ঞাসা করলে ভালো হয়, তা ছাড়া অসুস্থ হেডমাস্টারদের অর্থ টানাটানি এ মুহূর্তে। রিয়া বাগানের সব পুরোনো পাতা ফেলে, গাছে পানি দেওয়ার পর স্যারের বাসায় ফোন দিল।
বিকেলে ওনাদের বাসায় পৌঁছাল। স্যারের স্ত্রীকে দেখাল আংটিটা, ‘চাচিমা, এটা কি আপনার?’
উনি বললেন, ‘এটা আমার শাশুড়ির দেওয়া, একবার ধোয়া ধুই করার সময় হারায়, কিন্তু এটা তুমি রেখে দাও।’
চোখে পানি এসে গেছে চাচিমার। ডাক্তারের ফি দিতে আর ওষুধ কিনতে গিয়ে সব শেষ। হেডমাস্টার স্যারকে দেখা করতে গিয়ে বুঝল, অবস্থা খারাপ। রকিব আংটি নিয়ে চাচিমার হাতে দিয়ে বলল, ‘আপনার এ মুহূর্তে এটার প্রয়োজন আছে।’
রিয়া তার স্বামীর এ রকম মন্তব্য দেখে গর্ব বোধ করল! নিজেকে ভাগ্যবান মনে হলো।
বেশ কিছুদিন পরে স্যারের স্ত্রী চাচিমা এলেন। বললেন স্যার মারা গিয়েছেন। উঠান দেখে অনেক অবাক হলেন। তোমরা এত সুন্দর করে ফেলেছ , বাড়িটা চিনতে পারছিলাম না। সামনে ডালিয়া ফুল, ভাবতাম ছাগলে খেয়ে শেষ করে দেবে, তোমরা দেখি তারের বেড়া দিয়েছ। আর ভেতরে দুইটা ঘরে এত জায়গা আর সবকিছুই আছে, কোথাও একটু ধুলা নেই!
উঠানে তোমাদের এত সবজি গাছ, বিশেষ করে বড় গাছের নিচে পাকা করে বসার জায়গা করেছ, দেখে খুব ভালো লাগল। অনেক বড় দেখাচ্ছে উঠানটা। ‘উনি উঠান থেকে আবার বারান্দায় আসার মুহূর্তে ওপর থেকে পাশের বাড়ির আবর্জনা এসে পড়ল, চাচিমা লাফ দিয়ে সরে এলেন। বললেন, ‘এরা আর শুধরাবে না।’
যাওয়ার আগে রিয়াকে কাছে ডেকে আদর করে সেই আংটি পরিয়ে দিলেন। রিয়া এত দামি উপহার কিছুতেই নেবে না। চাচিমা বললেন, ‘মৃত্যুর আগে উনি বলে গিয়েছেন, এটা বিক্রি করবা না। ‘রকিব বলল, ‘আপনি যদি আমাকে আপনার ছেলের মতো মনে করেন, তাহলে আপনার প্রয়োজনে অবশ্যই ডাকবেন।’ চাচিমা রিয়ার মাথায় হাত রাখল।