হুমায়ূন আহমেদের কাছে আমিসহ নব্বইয়ের দশকের বেড়ে ওঠা কিশোর-কিশোরীরা বিশেষভাবে ঋণী। তিনি শুধু আমাদের পাঠক বানিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ খুবই সহজ-সরল ভাষায় বলে গেছেন, যা তাঁর আগে আমি কাউকেই এত সহজ করে বলতে দেখিনি। শিখিয়ে গেছেন একটা প্রজন্মকে বৃষ্টিতে ভিজতে, আয়েশ করে জ্যোৎস্না দেখেতে। রেগে গেলে মাথা ঠান্ডা রেখে রাগ প্রকাশ করতে, কষ্ট পেলে বেদনায় নীল হয়েও কিছু হয়নি, এমন ভাব ধরতে। কোনো অন্যায় হলে দৃঢ় কিন্তু শান্ত গলায় প্রতিবাদ করতে। চিনিয়েছেন কদম ফুল, বুঝিয়ে দিয়েছেন নীল পদ্ম।

হুমায়ূন আহমেদ লিখে গেছেন অনেক অনেক উপন্যাস, গান; নির্মাণ করেছেন অনেক নাটক, সিনেমা; সৃষ্টি করছেন কিছু কালজয়ী চরিত্র। তার মধ্যে  মিসির আলি, রুপা, হিমু, রানু, শুভ্র, আনিস, বড় চাচা, মামা, বড় খালা, ফুফু, রহিমার মা, বাকের ভাই ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য চরিত্র আমাদের খুবই কাছের মানুষ, অতি আপনজন। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর বলিষ্ঠ পদচারণ ছিল। বাংলার আনাচকানাচ থেকে অপ্রচলিত লোকগীতিগুলোকেও তুলে এনেছেন, প্রাধান্য দিয়েছেন লালন, হাসন রাজাসহ অনেক বাউল ও লোকসংগীতকেও, সেগুলো হয়েছে জনপ্রিয়। সৃষ্টি করেছেন বিশাল পাঠকগোষ্ঠী, যা আমার মনে হয় বাংলাদেশে আর কোনো লেখকের নেই, হওয়ার সম্ভাবনাও  ক্ষীণ।

বাংলা সাহিত্যে তাঁর এত অবদান যে বলে শেষ হবে না। হুমায়ূন আহমেদের কিছু বিশ্লেষণের জন্য তাঁকে তাঁর পাঠকেরা আজীবন মনে রাখবেন তা হলো মানবজাতিকে তিনি খুবই সহজ ভাষায় শিখিয়ে গেছেন ভালোবাসা আর ভালো লাগার পার্থক্য, প্রেম আর মোহর পার্থক্য, বিরহ আর কষ্টের পার্থক্য।

দিনের পর দিন একসঙ্গে থেকেও কোনো কোনো সম্পর্কে কখনো ভালোবাসা জন্মায় না, আবার মাত্র একবার দেখেও একটা সম্পর্ক আজীবন টেনে নেওয়া যায় মনের মধ্যে। কিছু কিছু সম্পর্ক শুরুর আগেই এত বেশি হিসাব-নিকাশ থাকে যে আগেই ঘুড়ি ওড়ার আগেই সুতা ছিঁড়ে যায়, এরপর শুধু সীমাহীন ক্লান্তি নিয়ে বয়ে বেড়ানো। আবার কিছু সম্পর্ক শুধু স্বপ্নিল প্রতীক্ষা বা অপার্থিব ভালো লাগা দিয়ে শুরু হয়, মনের অজান্তেই মনের ঘরে স্থায়ী জায়গা করে নেয়, প্রাপ্তির আশায় অথবা বিরহ-বেদনায় কাতর হয়েও কেটে যায় একটা জীবন।

ভালোবাসার কষ্ট  আসলে কেমন? যে প্রকৃত প্রেমে পড়েনি, তার পক্ষে বোঝা যেমন কঠিন, তেমনি বিরহের জ্বালাও সবার পক্ষে বুঝে ওঠা অবান্তর।
প্রকৃত ভালোবাসা আসলে অপার্থিব,
এই অনুভূতি ব্যাখ্যাতীত...

শ্রদ্ধেয় হুমায়ূন আহমেদ ভালোবাসার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ‘তিথির নীল তোয়ালে’ বইটিতে একটি মৈমনসিংহ গীতিকবিতার উল্লেখ করেছেন....

‘উইড়া যায় রে বনের পঙ্খী,
তার পইরা থাকে মায়া’

আমার মনে হয়, এর চেয়ে  সহজ কিন্তু গভীর ব্যাখ্যা, ভালোবাসা নিয়ে কেউ দেননি আগে। কোনো কিছুর জন্য বা কারোর জন্য যদি মনের অবচেতনে মন পোড়ায়, কাঁদে, হাহাকার করে ওঠে শূন্যতায়, তাহলে সে আটকে গেছে ভালোবাসার মায়ায়।

এখানে ‘পঙ্খী’র জন্য যে মায়া, তা হলো ভালোবাসা।

এই মায়ার কষ্ট ভয়ংকর কষ্ট...
ছেড়ে যায় না, ধরা দেয় না,
যেন জ্যোৎস্নার ফুল।

যে কষ্ট দুনিয়ার অর্ধেকের বেশি মানুষ না জেনেই একদিন মরে যায়, আর যারা এ মায়ার যন্ত্রণা টের পায়, তারা জীবন্ত লাশ হয়ে বাঁচে। শুধু খুবই সৌভাগ্যবান কিছু মানুষ জীবনে জ্যোৎস্নার ফুল ধরতে পারে...

নিঃসন্দেহে তারা বিরল সৌভাগ্যবান।