আমাদের মায়েরা
ভালোবাসা, মায়া, মমতা, সম্মান, শ্রদ্ধা—এগুলো যত না প্রকাশের, তার চেয়ে বরং চর্চার বিষয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ এমন আবহেই আমরা বেড়ে উঠেছি। তাই আমরা কখনো আমাদের আব্বা, মাকে বলিনি তোমাদের ভালোবাসি বা তাঁরাও কখনো আমাদের বলেননি। কিন্তু আমরা ঠিকই জানি আমাদের গভীর ভালোবাসার কথা। আধুনিক যুগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবকিছুর একটা আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ করে দিচ্ছে। ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ করতে হবে, কীভাবে চর্চা করতে হবে। আবার পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী এখন অনুভূতিগুলোকে ব্যবসার অন্যতম টুলসে পরিণত করেছে। তাই এখন ভালোবাসা দিবস, মা দিবস, বাবা দিবস বহুলচর্চিত বিষয় হয়ে উঠেছে। যদিও সত্যিকার অর্থে এটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা ছবি পোস্ট করে অন্যের বাহ্বা জিতে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
এখন পর্যন্ত মাকে বলা হয়নি যে তাঁকে কতটা ভালোবাসি বা মা-ও বলেননি।
শৈশব থেকে কৈশোর হয়ে তারুণ্যে মায়ের নিবিড় সান্নিধ্যেই আমাদের বেড়ে ওঠা। গ্রামীণ দুরন্ত শৈশব–কৈশোরে পড়াশোনাটা ছিল আমাদের জন্য আরও একটা খেলার উপকরণ। আমাদের অশিক্ষিত আব্বা, মা ‘পড়াশোনা কেমন হচ্ছে’, এটুকু জিজ্ঞেস করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতেন। ফলে পড়াশোনাকে কখনো বোঝা মনে হয়নি। স্কুলের গন্ডির বাইরের সময়টা ছিল ভীষণ উদ্দাম। স্কুল থেকে ফিরে পুকুরে নেমে সারা দিন লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি করা, বিকেলে পাড়ার খোলা জায়গায় দল বেঁধে খেলাধুলা করা। ছুটির দিনগুলো নিয়ে আসত আরও বেশি বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ। আর রাতের বেলায় পাড়ার যাদের বাড়িতে টিভি আছে, তাদের বাড়িতে গিয়ে টিভি দেখা। একটা সহজ জীবন ছিল আমাদের।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এসব কর্মকাণ্ডের ফাঁকে ফাঁকে এসে ভাতের হাঁড়ি থেকে ভাত আর তরকারির কড়াই থেকে তরকারি দিয়ে উদরপূর্তি করে আবার বেরিয়ে পড়া। এ সময় মায়ের সঙ্গে হয়তোবা দেখা হয়ে যেত। তবে আমাদের দুই ভাইয়ের কপালে এ ছাড়া মায়ের সঙ্গে আরও কিছু যোগাযোগ হতো। আমাদের সময় খেলাধুলার অপরিহার্য অংশ ছিল কাইন্টামি করা, মানে দুই নম্বরি করা। এমন কিছু আমাদের নজরে এলেই আমরা তাদের একপশলা পিটিয়ে দিতাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সকালেই যার সঙ্গে মারামারি করেছি, বিকেলেই আবার তার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলাধুলা করেছি। তবে মাঝেমধ্যে বড়রা টের পেয়ে গেলে সেগুলো আমাদের মায়েদের কান পর্যন্ত আসত আর অবধারিতভাবে আমাদের কপালে জুটত বকুনি।
আব্বা যেহেতু সারা দিন বাড়ির বাইরে থাকতেন, তাই আব্বাকে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতো না। আমরা ওনার কাছে বকুনিও খেতাম না। তাই বড় হতে হতে আমাদের মনে হতো, আব্বাই বেশি ভালো। মা শুধু শুধু মারেন। কিন্তু আমাদের অন্তরে যে মায়ের জন্য কতটা ভালোবাসা সঞ্চিত আছে, সেটা টের পেতাম অসুস্থ হলে। যেকোনো ধরনের অসুস্থতায়ই আমাদের প্রথম ডাক ছিল ‘মা’। আর মা–ও নাওয়া–খাওয়া ভুলে আমাদের সেবা করে সরিয়ে তুলতেন। আমার ছিল রাত জেগে পড়ার অভ্যেস। অনেক সময় রাতে মাথা খালি খালি লাগত। তখন মা মাথার চাঁদিতে নারকেল তেল আর পানি দিয়ে হাতের তালু দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে থাবা দিতেন। এরপর মায়ের কোলে মাথা রেখেই হয়তো ঘুমিয়ে যেতাম।
জীবনে প্রথমবার মায়ের কাছছাড়া হলাম ঢাকায় গিয়ে বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর। বুয়েটে সপ্তাহে দুই দিন ছুটি থাকে। আমরা কুষ্টিয়ার বন্ধুরা মিলে শেষ কর্মদিবসে রাতের বেলা বাসে উঠে কুষ্টিয়ায় চলে যেতাম। আবার ক্লাস শুরুর আগের রাত্রে ঢাকায় ফিরে এসে সকালবেলা ক্লাস ধরতাম। আমার এখনো মনে আছে প্রথমবারের কথা। বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে ঢুকে দরজায় মাত্র একবার ধাক্কা দিতেই মা দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিলেন। আমি তখন বুঝতে পারিনি যে সেটা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল। পরে আব্বা বলেছিলেন, আমি ঢাকায় যাওয়ার পর প্রতি রাতেই মা কোনো না কোনো একটা শব্দ শুনে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে দেখতেন যে আমি ফিরেছি কি না। আর আমি যখন ঢাকায় গিয়েছিলাম, তখন মা পাড়ার মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যতক্ষণ আমাকে দেখা যায়। এরপর নাকি সেখানেই বসে পড়েছিলেন কাঁদতে কাঁদতে।
বুয়েটের হলজীবন নিজে নিজে সবকিছু করতে শিখিয়েছিল। গ্রামে থাকতে পুকুর থেকে গোসল করে এসে প্যান্ট বা লুঙ্গি খুলে ছুড়ে ফেলে দিতাম। সেগুলো কীভাবে পরিষ্কার হয়ে যেত, জানতাম না। হলে এসে নিজের কাপড় নিজে ধোয়া শুরু করলাম জীবনে প্রথমবারের মতো। একবার প্যান্ট ধুতে গিয়ে প্যান্টের হুকে লেগে হাতের একটা আঙুল সামান্য কেটে গিয়েছিল। তখন চিঠি লেখার চল ছিল। আমি ঢাকায় গিয়ে বাড়িতে চিঠি লিখতাম। আব্বাও আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। আমি চিঠিতে হাত কেটে যাওয়ার ঘটনাটা লিখেছিলাম। পরেরবার বাড়িতে এসে শুনি, মা নাকি আমার চিঠি পড়ার পর থেকে নাওয়া–খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর যার সঙ্গেই দেখা হতো, তিনি বলে বেড়াতেন, ‘আমার ছেলে কাপড় ধুতে গিয়ে হাত কেটে ফেলেছে।’
আমাদের কলেজজীবনের এক বান্ধবীর মায়ের যুদ্ধটা ছিল আরও অনেক কঠিন। মফস্সল শহরে একটা সুন্দরী মেয়েকে বড় করে তোলার ঝুঁকি মোটামুটি সবারই জানা। এ ছাড়া ছিল বিয়ে দেওয়ার চাপও। কিন্তু খালাম্মা সব বাধা খুবই দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করেছিলেন। এমনকি উচ্চমাধ্যমিকের পর যখন বিয়ের কথা বলা হয়েছিল, তখন তিনি মেয়ের হাত ধরে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে কোচিংয়ে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। এরপর আমাদের বান্ধবী মেডিকেলে পড়াশোনা করে এখন দেশে সুনামের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। সে জীবনকে দেখে বিশাল ক্যানভাসে। ধর্মবর্ণশ্রেণি–নির্বিশেষে সব বয়সের মানুষ তার কাছে সমান গুরুত্ব পায়। শুধু রোগীই নয়, তাদের মা, বাবা, সন্তানেরাও সমান ভালোবাসা পায়। রোগীদের সেবা করার জন্যই দেশ–বিদেশের সব হাতছানিকে পাশ কাটিয়ে এখনো মফস্সল শহরে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।
সময়ের নৌকায় চড়ে এখন আমরা নিজেরাই আব্বা, মা হয়ে গেছি। আমাদের সন্তান দুটো এখনো উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পার হয়নি, তাই আমাদের আব্বা–মায়েদের অনুভূতিটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। সেই বান্ধবীর বড় ছেলে ২ মে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু করল। তার আগের সপ্তাহে আমি তাকে খুদে বার্তা দিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলাম, কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছিলাম না। টের পাচ্ছিলাম যে কিছু একটা হয়েছে, কিন্তু সেটা ঠিক কী, তা আন্দাজ করতে পারিনি। হঠাৎ মাত্র এক বাক্যের একটা খুদে বার্তা এল, ‘আমি আমার ছেলেকে ছেড়ে কীভাবে থাকব?’ সঙ্গে সঙ্গে আমার স্মৃতিতে আমার মায়ের এবং ওর মায়ের সব স্মৃতি ভিড় করল। আমাদের মায়েরা যুগে যুগে এখনো সেই আটপৌরেই রয়ে গেছেন। দুনিয়ার সবকিছুর ঊর্ধ্বে সন্তানের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছেন।