ভালোবাসার দিন, এক পুরোহিতের গল্প

ফেব্রুয়ারির এক ভোর। শীত পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, কিন্তু বাতাসে অদ্ভুত এক উষ্ণতা। শহরের ফুলের দোকানগুলোতে লাল গোলাপ সাজানো, চকলেটের বাক্সে রিবন বাঁধা আর মানুষের চোখে একধরনের নীরব প্রত্যাশা। আজ ভ্যালেন্টাইন ডে।

কিন্তু খুব কম মানুষই জানে, এই দিনের পেছনে আছে এক সাহসী মানুষের গল্প, এক নিষিদ্ধ ভালোবাসার ইতিহাস।

তৃতীয় শতকের রোম

রোমান সাম্রাজ্য তখন যুদ্ধের উত্তাপে জ্বলছে। সম্রাট ক্লডিয়াস দ্বিতীয় বিশ্বাস করতেন, অবিবাহিত পুরুষেরা নাকি বেশি ভালো সৈনিক। পরিবার থাকলে মন নরম হয়ে যায়, যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ় থাকা যায় না। তাই তিনি কঠোর আদেশ দিলেন, তরুণদের বিয়ে নিষিদ্ধ।

শহরে আতঙ্ক নেমে এল। প্রেমিকরা দেখা করত লুকিয়ে, প্রতিশ্রুতি দিত ফিসফিস করে। ভালোবাসা যেন অপরাধ।

কিন্তু একজন মানুষ এই আদেশ মেনে নিতে পারলেন না।

তার নাম ভ্যালেন্টাইন। একজন খ্রিষ্টান পুরোহিত। শান্ত চোখ, দৃঢ় কণ্ঠ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসা মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনো সম্রাটের ক্ষমতা নেই তা কেড়ে নেওয়ার।

তাই রাতের অন্ধকারে, মোমবাতির আলোয়, তিনি গোপনে বিয়ে পড়াতে শুরু করলেন। দুজন মানুষের হাত এক করে বলতেন, ‘ভালোবাসা ভয়কে হারায়।’

অনেক যুগল তার কাছে আসত। কেউ কাঁদত, কেউ হাসত। সেই ছোট গির্জাটি হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহের এক নীরব আশ্রয়।

কিন্তু গোপন সত্য বেশিদিন গোপন থাকে না।

এক রাতে সৈন্যরা দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ল।

ভ্যালেন্টাইন ধরা পড়লেন।

কারাগারের চিঠি

কারাগারের পাথুরে দেয়ালের ভেতরেও তার চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না। কিংবদন্তি বলে, বন্দি থাকাকালে তিনি জেলারের কন্যার সঙ্গে কথা বলতেন। মেয়েটি নাকি তার কাছে মানবিকতা আর বিশ্বাসের এক আলোর মতো ছিল।

মৃত্যুদণ্ডের আগে তিনি একটি চিঠি লিখলেন। খুব বড় নয়। শেষে শুধু লিখলেন, ‘From your Valentine।’ কয়েকটি শব্দ। অথচ শতাব্দী পেরিয়ে যা হয়ে উঠল ভালোবাসার বার্তার সূচনা।

৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে পোপ গেলাসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মরণ দিবস ঘোষণা করেন। ধর্মীয় স্মরণ ধীরে ধীরে বদলে গেল মানবিক ভালোবাসার প্রতীকে। ইতিহাস কখনো কখনো এভাবেই হৃদয়ের ভাষা শিখে নেয়।

শতাব্দী পেরিয়ে

আজ পৃথিবীর নানা দেশে এই দিনটি শুধু প্রেমিক প্রেমিকার নয়, অনুভূতি প্রকাশের দিন। কেউ হাতে লেখা চিঠি পাঠায়; কারণ, কয়েকটি আন্তরিক শব্দ অনেক সময় দামি উপহারের চেয়েও মূল্যবান। কেউ লাল গোলাপ দেয়, আবেগ আর গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে। কেউ চকলেট দিয়ে সম্পর্কের মিষ্টতা উদ্‌যাপন করে। আবার কেউ শুধু পাশে বসে থাকে, হাঁটে, কথা বলে। উপস্থিত থাকাটাই যেন সবচেয়ে বড় উপহার।

ইউরোপে দিনটি এখনো ঐতিহ্যের গন্ধে ভরা। ফ্রান্সকে অনেকেই ভালোবাসার রাজধানী বলে, সেখানে প্রেমপত্র লেখার সংস্কৃতি এখনো জীবন্ত।

আমেরিকায় এটি এক সামাজিক উৎসব। বন্ধু, শিক্ষক, সহকর্মী, সবাই কার্ড পায়। ভালোবাসা সেখানে সম্পর্কের বিস্তৃত বৃত্ত।

দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণরা দ্রুত দিনটিকে গ্রহণ করেছে। শহরজুড়ে লাল পোশাক, ফুল, বিশেষ আয়োজন। কোথাও বিতর্ক আছে, কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা থেমে থাকে না।

কেন পৃথিবী এই দিনটিকে আঁকড়ে ধরে

কারণ মানুষ অনুভূতি বলতে চায়, কিন্তু প্রতিদিন সাহস পায় না। এই দিনটি যেন সামাজিক অনুমতি দেয় হৃদয়ের দরজা খুলতে।

ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, ধর্ম আলাদা, তবুও ভালোবাসা সর্বজনীন। সংঘাতের পৃথিবীতেও এটি আশার প্রতীক। গবেষণাও বলে, সম্পর্ক আর আবেগীয় সংযোগ মানুষের সুখের বড় উৎস।

সবচেয়ে বড় সত্যটি খুব সরল।

ভালোবাসা শুধু বলা নয়, দেখানোও জরুরি।

এটি শুধু যুগলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হতে পারে বাবা মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, বন্ধুর প্রতি আস্থা, কিংবা নিজের প্রতিও সহানুভূতি।

সম্ভবত এ কারণেই সাম্রাজ্য ভেঙেছে, সংস্কৃতি বদলেছে, কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারি টিকে আছে। পৃথিবী যত বাস্তববাদী হোক, মানুষের হৃদয় এখনো অনুভূতির ভাষায় কথা বলে।

সুইডেনের এক সন্ধ্যা, এবং দুটি শব্দ

ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়ে ভাবতে বসলে আমার নিজের একটি স্মৃতি ফিরে আসে। সুইডিশ ভাষার একটি শব্দ আছে, লুস্ট (lust)। বাংলায় যার অর্থ আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা। বহুবার চেষ্টা করেছি শব্দটির গভীরতা পুরোপুরি অনুভব করতে, কিন্তু অনুবাদ তার সম্পূর্ণ আবেগ ধরতে পারে না।

সুইডিশরা বলে, lust att älska, ভালোবাসার ইচ্ছা।

Lust att resa, ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা।

Lust att leva, বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা।

ধীরে ধীরে বুঝেছি, মানুষের জীবনে লুস্ট না থাকলে সবকিছুই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। কারণ, লুস্টহীন জীবন মানে নিজের মনের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকা। আর জোর করে বাঁচার মধ্যে কি আনন্দ থাকে? থাকে না।

আরেকটি শব্দ আছে, লগোম (lagom)। পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় যার নিখুঁত সমার্থক খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমরা হয়তো বলি পরিমিত, ঠিক আছে। কিন্তু লগোমের ভেতরে আছে ভারসাম্য, সংযম, জীবনের প্রতি এক পরিমিত বোধ।

আমার কাছে লুস্ট এবং লগোম শুধু শব্দ নয়। এদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনের ছন্দ এবং গন্ধ। যে জীবনে লুস্ট নেই, সে জীবনের মূল্য নেই। যে জীবনে ভালোবাসা নেই, সে জীবনের মানেও নেই।

সুইডিশরা ভালোবাসা শব্দটিও খুব স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করে। তারা বলে, Jag älskar dig। আমি তোমাকে ভালোবাসি।

বাংলায় একই বাক্য আমরা নানা ভাবে বলতে পারি। যেমন তোমাকে আমি ভালোবাসি। ভালোবাসি তোমাকে আমি। ভালোবাসি আমি তোমাকে। শব্দ বদলায়, অনুভূতি বদলায় না। বাংলার এই নমনীয়তা আমাকে সব সময় মুগ্ধ করে।

ভালোবাসার প্রকৃত রূপ

এত সুন্দর একটি শব্দ, তবু আমরা অনেক সময় তার মূল্যায়ন করতে ভুলে যাই। অথচ ভালোবাসা হলো বেঁচে থাকার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা, এক নিঃস্বার্থ অনুভূতি।

আমার বিশ্বাস, ভালোবাসা মানুষের জীবনের অন্যতম বড় আবেগ এবং বেঁচে থাকার প্রধান জ্বালানি। আমরা অনেক সময় কাউকে ভালোবাসি, কিন্তু বলতে পারি না। লজ্জা, দ্বিধা, সাহসের অভাব আমাদের থামিয়ে রাখে। তবু মনের গভীরে তাকে লালন করা একধরনের ভালোবাসাই।

ভালোবাসা সবসময় পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দূরে থেকেও কাউকে অনুভব করার মধ্যে গভীর আনন্দ আছে। কেউ চলে গেলেও তার স্মৃতিকে হৃদয়ে ধরে রাখা খাঁটি ভালোবাসার প্রকাশ।

আমি আরও বিশ্বাস করি, ঘৃণা থেকে ঘৃণাই জন্মায়। তাই ঘৃণা নয়, ভালোবাসা দিয়েই ভালোবাসা ছড়ানো উচিত।

ভালোবাসা মানে হৃদয়ের এক নীরব মন্দিরে কাউকে বসিয়ে রাখা। সেখানে কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা নেই, আছে শুধু অনুভব।

শেষ কথা

এই লেখা চাইলে শুধু ১৪ ফেব্রুয়ারির জন্য রাখা যেত। কিন্তু ভালোবাসা এমন এক স্বর্গীয় অনুভূতি, যা বছরে এক দিন ফিরে এলে যথেষ্ট নয়। ভালোবাসা ফিরে আসুক গ্রীষ্মে, বর্ষায়, হেমন্তে, শীতে, বসন্তে এবং শরতে। ফিরে আসুক আমাদের প্রতিদিনের জীবনে। কারণ, ভালোবাসার মধ্যে রয়েছে শুধু ভালোবাসা।

আর সেই ভালোবাসাই মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

*লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সুইডেন

[email protected]

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]