ফলের স্বর্গে একদিন: অস্ট্রেলিয়ার ক্যানোল্যান্ডস অর্চার্ডে অবিস্মরণীয় ভ্রমণ
ভ্রমণ মানেই শুধু পাহাড়, সমুদ্র কিংবা শহরের কোলাহল নয়; কখনো কখনো প্রকৃতির একটুকরা সবুজ স্বর্গ আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় এমনই এক অনন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম সিডনির উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ক্যানোল্যান্ডস অর্চার্ডে। ফলের বাগানে ঘুরে বেড়ানো, নিজের হাতে গাছ থেকে পাকা ফল পেড়ে খাওয়া এবং প্রিয়জনদের জন্য ঝুড়িভর্তি ফল কিনে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সেই অনুভূতি আজও হৃদয়ে অমলিন। সকালের কোমল আলোয় আর সূর্যের তাপকে উপেক্ষা যখন আমরা ফার্মে পৌঁছালাম, দূর থেকেই চোখে পড়ল সারি সারি ফলের গাছ। কোথাও লাল টুকটুকে আপেল, কোথাও স্ট্রবেরির লাল কার্পেট, কোথাও প্লামের বেগুনি আভা, আবার কোথাও কমলার সোনালি রঙে ভরে আছে পুরো বাগান। মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি নিজেই রংতুলি দিয়ে এক বিশাল ক্যানভাস এঁকেছে। ফার্ম কর্তৃপক্ষ একটি ঝুড়ি হাতে দিয়ে জানিয়ে দিল, যা খেতে ইচ্ছা হয় গাছ থেকে নিজেই তুলে নিন। আর যা নিয়ে যেতে চান, তা কেজি হিসেবে কিনতে পারবেন। আমি নিজ হাতে আপেল পেড়েছি, স্ট্রবেরি তুলেছি, রসালো প্লাম মুখে দিয়েছি, বিভিন্ন ধরনের বেরি, কমলা, ম্যান্ডারিন—এমনকি আরও নানা মৌসুমি ফলের স্বাদ নিয়েছি। গাছ থেকে সদ্য তোলা ফলের স্বাদ যে বাজারের ফলের চেয়ে কত ভিন্ন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রতিটি ফলে ছিল প্রাকৃতিক মিষ্টতা, সতেজতা এবং প্রকৃতির অনাবিল সুবাস। শুধু ফল সংগ্রহই নয়, পুরো পরিবেশটি ছিল পরিবারকেন্দ্রিক। ছিল খামারের পশুপাখি দেখার ব্যবস্থা, ছোট ক্যাফে, মধুর দোকান এবং পিকনিক করার সুন্দর জায়গা। মনে হচ্ছিল, এটি শুধু একটি ফলের খামার নয়, বরং প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করার এক জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র।
তথ্যমতে, আজকের এই জনপ্রিয় ক্যানোল্যান্ডস অর্চার্ডের পর্যটনকেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয় প্রায় এক শতাব্দী আগে। ১৯২৩ সালে সিসিল ক্রিস্টি মাত্র ১০০ পাউন্ড মূল্যে তৎকালীন ক্রাউন ল্যান্ড কিনে এই খামারের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি নিজ হাতে জমি পরিষ্কার করে প্রথমে প্যাশনফ্রুট, কমলা ও লেবুর চাষ শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে স্টোন ফ্রুট, বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও সবজি চাষে সম্প্রসারণ ঘটে। বর্তমানে এটি তৃতীয় প্রজন্মের পারিবারিক খামার, যেখানে আধুনিক কৃষি ও কৃষিভিত্তিক পর্যটনের (অ্যাগ্রিট্যুরিজম) সমন্বয়ে দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করা হয়েছে। খামারটি এখন ‘পিক ইয়োর ওন’ ধারণাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, যেখানে দর্শনার্থীরা নিজেরাই ফল সংগ্রহ করেন, ফলে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ফলের অপচয়ও কমে। বর্তমানে এখানে মৌসুমি ফল সংগ্রহের পাশাপাশি ক্যাফে, ফার্ম শপ, ট্র্যাক্টর রাইড, মৌমাছি ও মধুবিষয়ক শিক্ষা, শিশুদের কার্যক্রম, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং কৃষি-পর্যটনের নানা আয়োজন রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি শতবর্ষী পারিবারিক ফলের খামার হিসেবে আরও পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমান দায়িত্বে থাকা জেইমি ক্রিস্টি আমাদের যথেষ্ট আপ্যায়ন, খামার ভ্রমণসহ বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অন্যতম আধুনিক কৃষিনির্ভর দেশ। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অসংখ্য ফলের খামার রয়েছে, যেগুলো শুধু কৃষি উৎপাদনের জন্য নয়, পর্যটনের জন্যও বিখ্যাত।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
নিউ সাউথ ওয়েলস (NSW) অঞ্চলে আপেল, পিচ, নেকটারিন, প্লাম, কমলা, স্ট্রবেরি ও ব্লুবেরির অসংখ্য খামার রয়েছে। বিশেষ করে সিডনি, বিলপিন, কমলা ও ক্যানোল্যান্ড এলাকাগুলো ফল চাষের জন্য সুপরিচিত। ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে বিখ্যাত আপেল, চেরি, স্ট্রবেরি ও আঙুরের বাগান রয়েছে। ইয়ারা ভ্যালি বিশ্বমানের ওয়াইনারি ও ফল চাষের জন্য প্রসিদ্ধ। তাসমানিয়া তার সুস্বাদু আপেল, চেরি ও বেরি ফলের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া আঙুর, কমলা, পিচ ও এপ্রিকট উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। কুইন্সল্যান্ডে উৎপন্ন হয় আম, আনারস, অ্যাভোকাডো, কলা, লিচু ও ম্যাকাডেমিয়া নাট। এসব খামারের বেশির ভাগই ‘পিক ইয়োর ওন’ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। দর্শনার্থীরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে তাজা ফল সংগ্রহ করতে পারেন, যা কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটকদেরও এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা দেয়। সেদিন ফেরার সময় গাড়ির ডিকিতে ছিল নানা রকম ফলের ঝুড়ি, আর হৃদয়ে ছিল অসংখ্য সুন্দর স্মৃতি। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা সহজ, কতটা নির্মল হতে পারে। আজও যখন বাজার থেকে কোনো আপেল কিংবা স্ট্রবেরি কিনি, তখন অজান্তেই মনে পড়ে যায় ক্যানোল্যান্ডস অর্চার্ডের সেই সকাল। গাছ থেকে নিজের হাতে ফল পেড়ে খাওয়ার যে আনন্দ, তা কোনো সুপারমার্কেটের তাক থেকে কেনা ফলে কখনো পাওয়া সম্ভব নয়। আমার বিশ্বাস, যাঁরা অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণে যাবেন, তাঁরা যদি অন্তত একটি ফলের খামারে এক দিন কাটান, তবে সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের শ্রমের এমন অপূর্ব মিলন খুব কম দেশেই এত সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়।
*লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন, সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, কুয়েত