গণতন্ত্র, রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্ব: আমাদের ভুল–বোঝাবুঝি কোথায়
গণতন্ত্র একটি শাসনব্যবস্থার নাম। এই শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্র হলো সার্বভৌম। সার্বভৌমত্বের অর্থ হলো রাষ্ট্রই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। রাষ্ট্র জনগণের ওপর যে আইন ও সিদ্ধান্ত আরোপ করে, জনগণ তা মেনে চলে। জনগণ রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু জনগণই রাষ্ট্র নয়। জনগণ থেকে রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে। তবে রাজনৈতিক দলও রাষ্ট্র নয়। রাষ্ট্র জনগণ ও রাজনৈতিক দলের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। এই জায়গাটিই আমরা ঠিকভাবে বুঝতে বা মেনে নিতে পারছি না। এই ভুল–বোঝাবুঝির কারণেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র বারবার ব্যাহত হচ্ছে। এখন বিষয়টি কিছু উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানো যাক।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সহজ নয়। এই পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার উদ্যোগ নেন। সেই প্রচেষ্টা অনেকটাই সফল হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। এর ফলে দেশ আবারও গভীর সংকটে পড়ে। এ সুযোগে সেনাবাহিনীর প্রধান এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। দেশে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় এক দশক ধরে গণতন্ত্র স্থগিত থাকে। দীর্ঘ আন্দোলন ও গণসংগ্রামের মাধ্যমে অবশেষে স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটে। পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ খুলে যায়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়। নির্বাচন জনগণের আস্থা অর্জন করে। কিন্তু এই ধারাবাহিকতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করার পথে এগিয়ে যান। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম ছিল। এটি বাতিল হওয়ার পর দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফল খুব দ্রুত সামনে আসে। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে। রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়। দেশ ধীরে ধীরে একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটে পতিত হয়।
২০০৮ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তখন মূল স্লোগান ছিল ‘পরিবর্তন চাই’ এবং ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। শুরুতে সরকার কিছু পরিবর্তন আনে। কিন্তু সেই পরিবর্তন সবাই মেনে নিতে পারেনি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছেন। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা ধীরে ধীরে ব্যক্তি শেখ হাসিনার হাতে চলে যায়। এর ফলে রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ই বঞ্চিত হয়। বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন শুরু হয়। একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার তীব্র প্রতিরোধের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর মানুষ নতুন আশায় বুক বাঁধে। অনেকে ভাবতে শুরু করে, বাংলাদেশ হয়তো ইউরোপ বা আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে। কিন্তু আমরা খুব কম মানুষই বুঝতে চেষ্টা করেছি—ওই দেশগুলোর গণতন্ত্র আসলে কীভাবে কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা ধরা যায়। সেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একজন ব্যক্তি দুবারের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। এটি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ করে। ইউরোপের অনেক দেশে দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে হেরে গেলে দলীয় প্রধান পদত্যাগ করেন। কারণ, একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন একই পদে থাকলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বারবার সেই আঘাত গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়। পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহযোগিতা করেনি। উদাহরণ হিসেবে বিএনপির কথা বলা যায়। তারা রাষ্ট্রের পক্ষে কিছু চেষ্টা করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই চেষ্টা যথেষ্ট ছিল না। তারা বারবার মূল আলোচনায় এনেছে শুধু নির্বাচন বিষয়টিকে।
একই চিত্র দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কোনো একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থিত প্যানেল জয়ী হলে তারা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বা নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে। আমরা সব সময় চাই আমাদের মতামতই চূড়ান্ত হোক। এই মানসিকতার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। তারা স্বাধীনভাবে তাদের গণতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না। এর ফলে যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আমরা চাই, তা আর আসে না। এখন আবার নির্বাচন সামনে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু জনগণ হিসেবে আমাদের একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দাবি করতে হবে। তা হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা। যদি আমরা এই দাবি না তুলি, তাহলে শুধু সরকার বা দল পরিবর্তন করে কোনো লাভ হবে না। সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বলই থেকে যাবে। কিন্তু যদি রাজনৈতিক দলগুলো কেবল নিজেদের ক্ষমতার প্রতি নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে, তাহলেই গণতন্ত্র স্থায়ী হবে। তাহলেই মানুষের অধিকার সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
গণতন্ত্রের মূল শর্ত হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী রাখা। কিন্তু যখন ক্ষমতা ব্যক্তি বা দলের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। আর দুর্বল রাষ্ট্রে গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। এ বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, আমরা কি দলীয় স্বার্থকে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে তুলে ধরছি না? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার প্রথম শর্ত।
*লেখক: শফিকুর রহমান, শিক্ষক, এডিলেডে ইউনিভার্সিটি, সাউথ অস্ট্রেলিয়া