দক্ষিণ কোরিয়া আগামীর প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে, আলোচনায় মেটালেন্স ও গ্রাফিন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে প্রযুক্তিগত আধিপত্যের প্রতিযোগিতা যখন দিন দিন তীব্র হচ্ছে, তখন ভবিষ্যতের দুটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি—মেটালেন্স ও গ্রাফিন নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিনের গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে এই দুটি প্রযুক্তিকে বাস্তব প্রয়োগের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের শিল্প খাতের চেহারা বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মেটালেন্স ও গ্রাফিনকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘আগামী ১০–২০ বছরের গেম-চেঞ্জিং প্রযুক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করেন। এই দুটি প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সফলতা ভবিষ্যতের স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিকস–শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। আর সেই প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের বিশ্বনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
মেটালেন্স হলো আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়েও ক্ষুদ্র ন্যানো-কাঠামো দিয়ে তৈরি একধরনের অতিপাতলা লেন্স। প্রচলিত ক্যামেরায় যেখানে একাধিক কাচের লেন্স ব্যবহার করতে হয়, সেখানে মেটালেন্স একাই সেই কাজ করতে পারে। ফলে ক্যামেরা, সেন্সর ও অপটিক্যাল ডিভাইস আরও ছোট, হালকা এবং শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে এআই ক্যামেরা, অগমেন্টেড ও ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, স্বচালিত গাড়ির সেন্সর, চিকিৎসাপ্রযুক্তি এবং অপটিক্যাল সেমিকন্ডাক্টরের মতো খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে গ্রাফিনকে বলা হয় ‘স্বপ্নের নতুন উপাদান’। কার্বনের একক স্তরের ষড়্ভুজাকার কাঠামো দিয়ে তৈরি এই দ্বিমাত্রিক পদার্থ ইস্পাতের চেয়েও শক্তিশালী, আবার অত্যন্ত হালকা ও নমনীয়। একই সঙ্গে এটি বিদ্যুৎ ও তাপ অত্যন্ত দ্রুত পরিবহন করতে সক্ষম।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্রাফিনকে আগামী দিনের সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চক্ষমতার ব্যাটারি, উন্নত ডিসপ্লে, তাপ অপসারণ প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং অপটিক্যাল ডিভাইস তৈরির অন্যতম সম্ভাবনাময় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যদিও এই দুটি প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হতে এখনো কিছু সময় লাগবে এবং বেশ কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে, তবু গবেষণা ও উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার অগ্রগতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে মেটালেন্স ও গ্রাফিন শুধু শিল্প খাতেই নয়; বরং জাতীয় প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক দর-কষাকষির ক্ষেত্রেও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য কৌশলগত সম্পদে পরিণত হতে পারে।
প্রযুক্তি যখন ধীরে ধীরে একটি দেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় শক্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার এই গবেষণা ও উদ্ভাবন আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি করবে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মেটালেন্স কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—
প্রচলিত স্মার্টফোন ক্যামেরায় একাধিক কাচের লেন্স লাগে। মেটালেন্স প্রযুক্তি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে এলে একটি অতি পাতলা লেন্সই একই ধরনের কাজ করতে পারবে। এতে স্মার্টফোন, স্মার্ট গ্লাস, ড্রোন এবং বিভিন্ন ওয়্যারেবল ডিভাইস আরও ছোট, হালকা ও শক্তিশালী হবে। ভবিষ্যতের এআই ডিভাইসে উচ্চগতির ইমেজ প্রসেসিং ও ত্রিমাত্রিক (3D) সেন্সিং প্রযুক্তিতে মেটালেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রাফিন কেন ‘স্বপ্নের উপাদান’?—
ফিন তামার তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে এবং তাপ দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। এ কারণে এআই চিপ ও উচ্চক্ষমতার সেমিকন্ডাক্টরে উৎপন্ন অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষকেরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে গ্রাফিন ব্যবহার করে আরও দ্রুত, কম বিদ্যুৎ খরচের এবং দীর্ঘস্থায়ী ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরি করা সম্ভব হবে।
আমার মতে, যে দেশ ভবিষ্যতের মূল প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেই দেশই বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। তাই মেটালেন্স ও গ্রাফিন শুধু নতুন উদ্ভাবন নয়; বরং আগামী দিনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প উন্নয়ন এবং জাতীয় প্রতিযোগিতার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।