‘উনমেই’ তানাকার কেবিন ঘর
অন্ধের মতো কালো গলিটা ধরে হেঁটে যেতে যেতে তানাকা মিদোরির মনে শুধু একটাই দুশ্চিন্তা—গলা পর্যন্ত ড্রিংকস করাটা মা একেবারেই পছন্দ করে না। আজকে রাতে না হলেও কাল শনিবার, ছুটির দিন সাতসকালেই একগাদা এলোমেলো কথা শুনতে হবে।
ব্যাপারটা আসলে এতটা গোলমেলে কখনোই ছিল না। দ্বিতীয় বউটাও হুট করে ডিভোর্স দিয়ে চলে যাওয়ার পর অভ্যাসটা প্রচণ্ড রকম বাজে হয়ে উঠছে। প্রতি শুক্রবার রাতে সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে রাত পর্যন্ত চলা ড্রিংকস পার্টি এখন যেন শুধুই সব অপমান-গ্লানি ভুলে যাওয়ার একটা অপূর্ব সুযোগ। প্রথম বউটা অ্যালকোহল পছন্দ করত না, যদিও তেমন কোনো কারণ ছিল না। হয়তো কিছুটা জোরাজুরি করলে রাজি হতো—ক্রিসমাসে বা বছরের শেষে ‘নেনমাতসু পার্টিতে’—পরিবারের সঙ্গে একটু রেড ওয়াইন কি একটু দেশি চোলা মদ—যা কিনা ‘নিহন সাকে’ নামে পরিচিত—তা–ও এই সামান্য একটু গলা দিয়ে নামত কি নামত না মতো আরকি। এতটাই ডিসিপ্লিন লাইফ লিড করত যে বোঝাই যেত বিয়ের আগে নিজের পরিবারের নিয়মনীতির কড়াকড়ি নিয়ে যে একগাদা গল্প শোনাত, সেগুলো আসলেই সত্যি ছিল। বউয়ের চেহারার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখত নিজের ডিসিপ্লিনে কোনো ভুল আছে কি না। বছরের ৩৬৫ দিনই কীভাবে একটা মানুষ রাত ১০টার মধ্যে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারে, সেটা তানাকা জানতই না। তবে এরই মধ্যে এক আশ্চর্য উপলব্ধিও ছিল। কিছু ডমিনেশন যে ভীতিকরও হতে পারে বিয়ে না করলে বোঝার উপায় কি ছিল? রাতে বা দিনে বউয়ের নিতম্বে হাত রাখতেই কামোন্মাদের মতো শরীরের ভাঁজগুলো মুচড়িয়ে রেসপন্স করত ওর ছিপছিপে শরীরটা। হৃৎপিণ্ডের ওঠানামার সঙ্গে নিজেকে তাল মেলাতে যেতে ঘেমেনেয়ে উঠতে হতো তানাকা মিদোরিকে। দুহাতে জড়িয়ে পেঁচিয়ে এক উন্মাদনার সাগরে ভাসিয়ে নিত যেন।
বিয়ের আগে যেকোনো অকেশনে খুব বেশি স্ট্রেস না থাকা দিনগুলোয় সেডিউস করতে তানাকার ভালোই লাগত। একটা চার্ম কাজ করত যে এই হেন ওভারলি ডিসিপ্লিনড কোন মেয়েকে নগ্ন করে নিজের ইচ্ছের বশ করতে পারি আমি টাইপ কিছু একটা। সেটা কীভাবে যেন জাস্ট একটা রিভার্সড বা অ্যাডভার্সড আত্মসমর্পণ হয়ে গেল, বিয়ের পরপরই সেটা কিন্তু বোঝার সুযোগ পাওয়া গেল না।
তানাকার দ্বিতীয় অধ্যায়—আওজোরার সঙ্গে। মানে দ্বিতীয় বউ, যার সঙ্গে পরিচয়ইটাই হয় একটা বারে ড্রিংকস করতে গিয়ে। যেন দুই বিপরীত মেরুর—দুই নারী। আওজোরার কাছে, সন্ধ্যার ডিনার মানেই প্লেটের পাশে হুইস্কি কিংবা বিয়ারের একটা গ্লাস থাকতে হবে। চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত তানাকা বাসায় না ফেরে আর দুইটা কটুকথা দিয়ে ঝগড়াটা শুরু হয়।
একসঙ্গে ডিনারের জন্য ওয়েট না করাটাও একটা ডমিনেশন কি? মানুষ আলাদা হতেই পারে, কিন্তু একজীবনে বিপরীত দুই মেরুর মানুষ এর সঙ্গে ঘর জোড়া লাগাতে না পেরে পেগের পর পেগ গিলে যাওয়াতে তাইত তানাকার কোনো ‘গিল্ট ফিল’ হয় না।
নিজেও বড্ড ইগনোর্যান্ট কি না—এ জন্য। আওজোরার আর দোষ কী? তানাকা নিজেই তৃতীয় স্বামী, ইন ফ্যাক্ট—তানাকা নিজেও যা চাচ্ছিল তা–ই হয়েছে।
বন্ধ থাকা এক দোকানের সামনে—ফুটপাতের পাশে লোহার নেট দেওয়া ড্রেনটার কাছে এগিয়ে বমি করার আগেই হড়হড় করে রাস্থার টেলিফোন বুথের পাশটা ভাসিয়ে ফেলল তানাকা।
তানাকা মিদোরি—১৫০ জন কর্মীর একটা ট্রেডিং কোম্পানিতে চাকরিরত ৫২ বছরের স্থূলকায়, অতিরিক্ত খর্বকায় শরীরের মধ্যবয়সী সাপ্তাহিক মাতাল।
শেষ ট্রেনে ফিরে স্টেশন থেকে বাড়ির রাস্তাটুকু যেন আজ প্রায় ৩০ বছরের ওপর হলো প্রতিদিনের মতোই জঘন্য দীর্ঘ মনে হয়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এদিকটাতে পুলিশের পেট্রলগাড়ি নেই বললেই চলে। আর রাস্তায় বমি করাতে কেউ কিছু মনে করবে এমন না। কিন্তু সমস্যা হলো এটা ওসাকার ডাউনটাউন না যে, কে কী করছে তা নিয়ে মাথা ঘামাবে কেউ। এটা হলো জন্মের পর দেখা নিজের এলাকা, যেখান থেকে কাছের দোকানটাও হেঁটে প্রায় ২০ মিনিট। সুনসান পাহাড়ি ঢালের ধারে পুরোনো বাড়িগুলো। সবাই-সবাইকে চেনার জন্য ঠিকমতো মাতলামি করে বাসায় ফেরার মতো উপায় নেই, আবার দুই বউ পালানো পুরুষ হিসেবে নিজের এই চেহারা দেখানোর মতো গাধামিও আর নেই। কিন্তু বড্ড ইগনোর্যান্ট তানাকা বমিটা রাস্তার ধুলো দিয়ে হালকা ঢেকে, ডান-বাঁ দেখে হাঁটা শুরু করে বাড়ির মার্ক তাক করে—নাক বরাবর ধরে। কোনোরকম শরীরটা টেনে বিছানায় এলিয়ে দেওয়ার মতো বড় সাকসেস এ মুহূর্তে আর কিছু নেই।
মায়ের মাথার ওই সমস্যাটা আসলে এতটা গোলমেলে কখনোই ছিল না। ব্রেন ডিফেক্টটাও আজকের না।
১০-১২ বছর আগে থেকে ডাক্তার দেখাচ্ছে। আইডিওপ্যাথিক টাইপের ড্যামেজ—কোনো কিছু প্রেডিক্ট করার উপায় নেই। এই মায়ের সঙ্গেই বড় হয়েছে ছোট্ট তানাকা। শরীরের গঠনের জন্যই হোক আর যে কারণেই হোক স্কুলে প্রতিদিনই মশকরা শুনতে হতো।
মায়ের মেন্টাল ইস্যু, বাপের জেল খাটা এসব ছিলই। কিছু মাস, সপ্তাহ আর দিন তো যেত শুধু মায়ের সঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিভিন্ন অফিসে কমপ্লেইন করতে করতে। ইলেকট্রিকের বিল কেন বেশি আসে? বাসার পাশে কে এসে হাগু করে যায়? বাড়ির ছাদে কার বিড়াল এসে মিউ মিউ করে—এ রকম হাজার কমপ্লেইন নিয়ে থানা, বিদ্যুতের অফিস, মিউনিসিপ্যালিটি কোথায় না যেত? হাইস্কুলের পর তানাকা আর বের হতে চাইত না ঘর থেকে। স্কুলটা যা তা করে শেষ করেই চাকরির জন্য বের হতে হলো। প্রথমে কষ্ট হতো। লোকজনের সঙ্গে মানানোর। মায়ের আঁচলে চেনা পৃথিবী আর অ্যাডাল্ট মানুষের পৃথিবী কি এক হতে পারে?
কিন্তু পকেটে টাকা আসার পর তানাকার জীবন এক নতুন মোড় নিল যেন। সেই জগতে তানাকা মিদোরি তার নরম তুলতুলে মন কে মাটিচাপা দিয়ে এক সত্য পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করে।
বুটের খটখট শব্দে পিচের হালকা ভেজা রাস্তায় একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি করে বোধ হয়। যেমন এখনো দম্ভ ভরে এ ধরার বুকে হেঁটে চলতে পারার একটা সূক্ষ্ম অহংকারের কণা—মাথার ভেতরে একতা নিউক্লিয়াসের মতো রূপ নেয়। কিন্তু এসব ভেবে মন শক্ত করেও মায়ের সামনে পড়লে সেই স্কুলজীবনের ছোট্ট তানাকাটা হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। অজস্র দুষ্টুমি যেন ওই চোখ জোড়া দেখলে কোথায় হারিয়ে যেত। এখনো তেমনই, কিন্তু মায়ের শরীরটাও ভালো নেই। বয়সে ভারে বেঁকে যাওয়া শরীর নিয়েও রান্না করা চাই—বাইরে যাওয়া চাই, শাসন করা চাই আর কত কী। ডাক্তারের কাছ থেকে ওল্ড হোমে যাওয়ার সুপারিশ আসার পরও কেন যেন এই মহিলাকে এ বিষয়ে কথা শোনাতেই পারে না তানাকা। সেদিন সিঁড়ির মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল আর তো উঠতেই পারছিল না। তানাকা ফিরে সন্ধ্যায় তাকে টেনে তুলে দেখে ডান পা, ডান হাত অসাড় হয়ে আছে। না হলেও কমসে কম চার ঘণ্টা তো ওভাবেই ছিল। কেঁদে কেঁদে জামা ভিজিয়ে ফেলেছে কিন্তু তানাকাকে দেখেই বলে উঠল—
‘তোকে কতবার বলেছি ঘরের সিঁড়িতে ওই সব হাবিজাবি দিবি না, পা–টা মচকে আমি অচল হয়ে গেলাম তোর জন্য’
‘মা, নন স্লিপ ম্যাট না থাকলে বুড়া-বুড়িরা নামতে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ে আর তোমার বেলায় উল্টো?
‘আমাকে দোষ দেওয়ার জন্য আর কিছু কি পাওনা?’
তানাকা শেষ বাক্যটা টেনে বলে একটু হাসিও মিশিয়েছিল কিন্তু তাতেও মায়ের বয়সের ভারে হারিয়ে ফেলা ব্যক্তিত্বতা আর রিকভার হয় না।
‘আমি বুড়ি না? বেরো আমার বাড়ি থেকে—দেখি কোথায় কে তোকে রাখে? মেয়ে মানুষের চড়থাপ্পড় খেয়ে ভূতের মতো হয়ে থাকিস আবার আমাকে বলিস আমি বুড়ি!’
বাহ, কী সুন্দর, এত ইগনোর্যান্ট মানুষ হয়?
এসব শুনে শুনে দিন পার করছে তানাকা মিদোরি। কিছু হলেই ওই ব্যর্থ বিবাহিত জীবনের খোঁটা আর তাচ্ছিল্য চলতে থাকবে। মায়ের জন্য আসলে খারাপ লাগে, কিন্তু তারপরও কোনো ‘গিল্ট ফিল’ হয় না, নিজেও বড্ড ইগনোর্যান্ট কি না! আরে! তাহলে কি এই ইগনোরেন্সটা, এটা কি বংশপরম্পরায় পাওয়া?
ধ্যাৎ! তাই হয় নাকি?
দরজাটা ঠেলতেই খুলে যাওয়ার কথা। রাত ১০টার পরে যাতে তানাকার বাসায় আসার শব্দে ঘুম না ভাঙে—তাই ১০টার পর লকটা অফ করে ঘুমাতে চলে যায় মা। এটা মা আর ছেলে ছাড়া কেউ জানে না। কিন্তু সেটাও তানাকাকে মেন্টাল চাপে রাখার জন্যই সেটা বুঝতে তানাকার লেগেছে পাক্কা দুই দিন! কারণ সে ঘুমায় না—১০টার পর যখনই আসুক আওয়াজ পেলেই হলো বেডরুম থেকে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে একগাদা কথা শোনাবে দেরি করে বাসায় ফেরার জন্য। আর কোনো দিন যদি সত্যি ঘুমিয়ে যায় তাহলে পরদিন ডাবল এনার্জি নিয়ে ডাবল বিশেষণসহ শুনতে হয়।
আসলে দ্বিতীয়বার ডিভোর্সের পর মায়ের ধারণা তানাকা একাকিত্ব কাটাতে ড্রিংকস, নারীসঙ্গ ইত্যাদিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে। একটা পঞ্চাশোর্ধ্ব সিঙ্গেল পুরুষের ব্যক্তিগত জীবনে ইন্টারফেয়ার করার কথা এই জামানায় তো দূর ৫০০ বছর আগেও কি কেউ চিন্তা করেছিল?
নারীভাগ্যটা দুর্ভাগ্যে পরিণত হওয়ার পেছনে তানাকার মায়ের ভূমিকাও যে কতটুকু সেটা মায়ের কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা ছোট্ট তানাকা মিদরি কখনোই রিসার্চ করতে যায়নি। ভালোবাসা একটা অসম্ভব রহস্যময় বস্তু।
ভালোবাসার মানুষের ওপর নিজের কামান্ধ যৌন ক্রিয়াকলাপ করায় ভালোবাসার মানুষের আপত্তি না থাকলে সেখানে আসলে ভালোবাসার অস্তিত্বটা আছে নাকি নাই সেটা খুঁজতে গিয়ে তানাকা বারবার ধোঁকা খেয়েছে। এত কমপ্লেক্স যে ভাবতে গিয়ে গা শিউরে ওঠে। যেমন ভার্সিটি লাইফের এক ছেলে বন্ধু তানাকার হাতে চুমু খেয়েছিল। তানাকা রেগে অন্ধ হয়ে মারতে গেলে ছেলেটা বলে উঠল—
‘ভালোবাসি তোকে - তা–ও মারবি?’
হতভম্ব তানাকা সেই যে ওঁর সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিল গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত আর কোনো দিন কথা হয়নি।
পুরুষ পুরুষেও ভালোবাসা যায়—সম্ভব। কিন্তু বাস্তবসম্মত না। এসব ভালোবাসা-সম্পর্ক তানাকার জন্য সব সময়ই রহস্যময়। তবে ড্রিংকস করা? দেশি–বিদেশি মদ গিলে বুঁদ হয়ে থাকাটা একটা ভয়ংকর নেশা। জাস্ট মেন্টালি চিন্তা করলেও ওই সময়টুকু আসলে তানাকার খুব দরকার। সবকিছু ভুলে একটু নিজেকে ভালোবাসার।
পা টলছে। গা গুলানিটা যে বন্ধ হয়েছে, এমনও না। বয়স কি খুব বেশি নিজের? একটা মানুষ অসুস্থ হওয়ার মতো যথেষ্ট মদ খাওয়ার মতো টাকাও নেই।
সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে যাওয়ার আগে মনে পড়ল মা নিচেই ঘুমাচ্ছে বেশ কিছু বছর, কিন্তু নিচে লিভিংটা জোর করে বানানো বেডরুমে দেখার আগে ওপরে গিয়ে দেখতে হবে একবার।
বাসায় ফিরে দৌড়ে দোতলায় নিজের রুমে ঢুকে পড়ার সহজাত অভ্যাস হতে পারে, অথবা মনের অজান্তেই পুরোনো কাঠবাড়ির ঘ্রাণ নেওয়ার নেশা হয়ে যাওয়া থেকেই হোক একবার যেতেই হবে।
ওই তো কর্নারের ফুলের টব থেকে আর্টিফিশিয়াল ফুলের উঁকি দেওয়া, স্যাঁতসেঁতে ঘরে ছড়ানো–ছিটানো জিনিসগুলো পড়ে আছে। মা নেই।
এভাবে মাকে খোঁজাও নতুন কিছু না। গত শীতেরই কথা। আওজোরার সঙ্গে ডিভোর্সের আগে রাগ করে ধুম করে বেরিয়ে গেল। কনকনে শীতের রাতে থানা পুলিশ সে এক বিশ্রী ব্যাপার।
যাক আজ রাতে আর ঝামেলা নেই। পার্টিশন বোর্ডে একটা গর্ত আছে। ছোট ওইটা দিয়ে বেডে শুয়ে থাকা মাকে দেখে তানাকা মাঝেমধ্যে। অসুস্থ থাকলে রাতে দু–তিনবার উঠে দেখে নেয়। সেখানে চোখ দিতে বিছানাটা খালি দেখতে পেল তানাকা। এই যা! ঘুমায়নি? টয়লেটে?
টয়লেটের দরজার ফাঁক গলে আলো আসছে না, দুবার নক করে দরজা খুলে দেখল—নেই।
নির্ঘাত বাইরে চলে গেছে! এই নিয়ে কতবার হলো? এখন পুলিশে কল করো, আবার সেই একগাদা জিনিস এক্সপ্লেইন করো। কাঁহাতক সহ্য হয়?
কিন্তু তাইবা কেমন কীভাবে হবে?
মাকে তো লম্বা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, বাথরুম পর্যন্তই যেতে পারে এর বেশি তো না।
হচ্ছেটা কী?
মাথাটা এবার বোঁ করে ঘুরে উঠল।
সিঁড়ি ঘিরে রেলিং নেই আছে শুধু দেয়াল সেটা ধরতে গিয়ে ধপাস করে দুই ধাপ পড়ে গেল তানাকা।
ছোট্ট তানাকা পড়ে গেলে ভ্যাঁ করে কেঁদেই দিত। ব্যথা পাওয়ার আগেই যদি মা এসে কোলে তুলে আদর করে দেয়?
সেটুকু পাওয়ার জন্য কান্নাটা জরুরি।
কিন্তু এবার পড়ে গিয়ে একটুও ব্যথা পায়নি সে। কারণ, এর চেয়েও জরুরি কাজ আছে তানাকার। মাকে খুঁজতে হবে।
মুখের লালায় শার্ট ভিজে গেছে। মুছে কোনোরকম দাঁড়িয়ে ওপরের ঘরগুলো, বারান্দা খুঁজে চলেছে। ধ্যাৎ ওপরের প্রতিটা দরজা কাঠ দিয়ে বন্ধ করা তো!
এত কিছু মনে থাকে? কিন্তু মাকে কোথায় পাবে সে?
নিচে এসেও টলে টলে ঘরকে ঘর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় মেতে উঠল যেন। নিচের সব রুম শিকল তালা দিয়ে বন্ধ। তানাকার মনেই নেই যে গত কুড়ি বছর ও নিচের এই একটা রুমেই লাগোয়া টয়লেটে নিয়ে বাস করছে। মা তো এখানেই থাকে। কিন্তু মা কোথায়?
দুই পা ফেলতেই কী করে যেন আবার হড়হড় করে বমি হয়ে গেল।
এবার আর পারল না তানাকা মিদোরি। শরীরে আর কুলায় না। ধপ করে সোফায় পড়ে গেল। সোফাটা আসলে যেখানে ও ঘুমায়!
মায়ের জন্য কান্না ঠেলে আসছে। হারিয়ে গেলও না তো?
মায়ের উষ্কখুষ্ক চুলে ফ্লোরোসেন্টের আলোতে চিকচিকে কালো চুলের বেণি দেখতে দেখতে তানাকা পড়ার বইয়ে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু আজ রাতে মা কি একটা নতুন গল্প বলবে? আজকে কি রাতের খাবারে ডিম থাকবে? নাকি ঘুম পাড়িয়ে, তানাকার পায়ে শিকল পরিয়ে মা আবার ক্লাবে চলে যাবে দুষ্ট লোকদের চুমু খেতে? মা বলেছে, দুষ্ট লোকেরা দুষ্ট হলেও অনেক টাকা দেয়। সকালে উঠে নির্ঘুম মায়ের চোখে চোখ রাখা হয়নি তানাকা মিদোরির। কোনো দিনও।
তাই সোফায় এলিয়ে দেওয়া চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে।
কান্না আসে কেন? কী বিপদ, মাকে খুঁজবে কে তাহলে? অবশ্য কান্না তো ছেলেবেলা থেকেই সঙ্গী।
একবার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট তানাকা সেই যে কান্না শুরু করল। আধবেলা পুলিশ বক্সে বসে ফের মাকে পেলেও সেই ট্রমা আজও যায়নি।
এই বয়সে বাড়ি এসে মাকে না পেয়ে কান্না আসছে। মাকে হারাবে না বলেই কি ৩১টি চাকরি করেছে সে? দুইটা স্ত্রী আর অসংখ্য মেয়েদের সঙ্গে ফেল্ড এটেম্পট কি মায়ের জন্যই? শেষ পর্যন্ত মানসিক বিকারগ্রস্ত মাকে চিকিৎসা করাতে সর্বস্ব শেষ করেও কি মাকে পাওয়া যাবে না? হারিয়ে যাওয়ার ভয় থেকে কি শিকলের আইডিয়া এসেছিল নাকি নিজেও ঘুমাতে গেলে মায়ের হাতে শিকল পরতে হতো সেই কারণে। জানা যায়নি বা জানতে ইচ্ছে হয়নি।
কিন্তু মা গেল কোথায়?
দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লেও সেটা মোছার মতো অবশিষ্ট শক্তি নেই তানাকার।
হাত বাড়িয়ে বাতি জ্বালাতে গেলে হঠাৎই ঘর তার আদল বদলে ঘুণে ধরা কেবিনে রূপ নেয়।
পূতিগন্ধময় এক ভুতুড়ে অন্ধকারে আবিষ্কার করে নিজেকে।
সেকি তাহলে কি এটাকেই বলে ‘উনমেই’ বা Destiny?
একলাফে বয়সটা ৭৮ এসে ঠেকে! অফিসফেরত জামা বদলে কখন ছেঁড়া পায়জামা হয়ে গেল?
গালে হাত দেওয়া না গেলেও গালভর্তি দাড়ির আঠালো জঙ্গল আঁচ করা যাচ্ছে ।
পারল না তানাকা—যেন হেরে গিয়ে টাইম মেশিন থেকে নেবে আসল তানাকা মিদোরি ।
মায়ের মৃত্যুর ৩০ বছর হতে চলল প্রায়, যেন এই কথাটা মনে পড়ুক নিজেই চায়নি সে আজ, শুধু আজ কেন কোনো দিন মনে পড়ুক চায়নি ।
ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে মাকে দেখতে পায় তানাকা—মা হাসছে। না জীবিত না । দেয়ালে মৃত মায়ের বুকসমান একটা পোট্রেট। সঙ্গে ৫ বছরের তানাকা হাসিমুখে মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ।
সেদিকে তাকিয়ে গরম নোনাজলে বৃদ্ধ তানাকার গাল ভিজে আসে। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মায়ের হাত দেখতে পায় ।
জেগে থেকে বৃদ্ধ হলেও একটু পরেই ঘুমিয়ে গেল ছোট্ট তানাকা।
লেখক: নিপুণ ওসাকা, জাপান