শেষ গন্তব্য ভাবনা
ডাক্তার আবু সালেহর প্রয়াণের পর মেহেরুন্নেসা বেগম বাইরে তেমন বের হন না। ডাক্তার দেখাতে হলে মফিজকে নিয়ে যান। তিনি তাকে ডেকে গেট খুলে বাইরে দাঁড়াতে বলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর আজ তিনি প্রথম গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছেন।
মেহেরুন্নেসার স্বামী ডাক্তার আবু সালেহ একজন প্রথিতযশা হৃদ্রোগবিশেষজ্ঞ ছিলেন। মেহেরুন্নেসা বেগমও একজন স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ। তাঁরও যথেষ্ট খ্যাতি আছে। বাইরেও তাঁদের দুজনের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ জানে, দেশে হাতে গোনা যে কয়েকজন প্রখ্যাত হৃদ্রোগবিশেষজ্ঞ আছেন, তাঁদের মধ্যে ডাক্তার আবু সালেহ উল্লেখযোগ্য।
অনেকেই এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না, ডাক্তার আবু সালেহ জীবিত নেই। তিনি দেশের অগণিত মানুষকে অকাতরে সেবা দিয়েছেন। আন্তরিক যত্ন ও সীমাহীন সহমর্মিতার সঙ্গে রোগীদের চিকিৎসা করেছেন। দক্ষতার সঙ্গে তাদের অস্ত্রোপচার করেছেন। তাঁর হাতে যারা চিকিৎসা পেয়েছে, অনেকেই এখনো বেঁচে আছে। অথচ ডাক্তার আবু সালেহ নেই! এটা কি ভাবা যায়? তিনি যেসব হাসপাতালে কাজ করেছেন, রাজধানী শহরের শান্তিনগরে যেখানে তাঁর চেম্বার রয়েছে, এখনো মানুষ ছুটে আসে সেবা নিতে। তাঁর নিজের জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েও নিয়মিত রোগী দেখেছেন তিনি। সেখানেও অনেক মানুষ ডাক্তার আবু সালেহর খোঁজ নেয়। তারা বিশ্বাস করতে চায় না, ডাক্তার আবু সালেহ বেঁচে নেই। অনেকে খোঁজ করে, ডাক্তার সাহেব দেশে আছেন, নাকি বিদেশে চলে গেছেন? ডাক্তার সালাউদ্দিনকে নয়, ডাক্তার আবু সালেহকেই চায় তারা।
ডাক্তার আবু সালেহর মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র পুত্র বিলাতফেরত ডাক্তার সালাউদ্দিন বাবার নৌকার হাল ধরেছে। সে তার স্ত্রী শার্লী এবং দুই পুত্র-কন্যাকে নিয়ে ধানমন্ডির পৈতৃক বাড়িতেই স্থায়ী হয়েছে। একজন হৃদ্রোগ চিকিৎসক হিসেবে ডাক্তার সালাউদ্দিনও নিজেকে ব্যস্ত রাখে। এ সময় ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগম নিজেকে তাঁর দীর্ঘদিনের পেশা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। তবে ছেলেকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। নাতি-নাতনি সৃজন-সৃষ্টির খোঁজখবর নেন সব সময়ই। ছুটির দিনে তাদের সঙ্গে সময় কাটান। তাদের সান্নিধ্যেই দিন কেটে যায় তাঁর।
আজ সৃজন-সৃষ্টির ছুটির দিন নয়। তাই ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগম নিজেকে খুবই একা ভাবছেন। এমনটা প্রায়ই হয়। তবে আজকে একটু বেশি বলেই মনে হচ্ছে। তাই স্থির করেছেন আজ তিনি নিজের হাতে ড্রাইভ করবেন। ড্রাইভার মফিজ এখন সালাউদ্দিন-শার্লীকে সময় দেয় বেশি। বাড়ির চারজন বিশ্বস্ত ও পুরোনো কর্মচারী সবাই এখন তাঁর পরিবারের স্থায়ী সদস্য। ড্রাইভার মফিজ তাদের একজন। প্রয়োজনে সে ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগমকে যথাসাধ্য সাহায্য করে। মফিজকে আজ ডাকতে ইচ্ছা করছে না। তিনি ভাবছেন, ‘থাক। সে তো ওদের সময় দিচ্ছে।’ আর ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগম, তিনি তো একেবারে অচল হয়ে যাননি। শারীরিকভাবে এখনো সচল রয়েছেন। তাই ভাবছেন নিজেই ড্রাইভ করে বাইরে যাবেন। যদিও স্বামীর মৃত্যুর পর, এযাবৎ তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। তবে এলাকার লোকজন সমবেদনা জানাতে আসে। নানা পরামর্শ-সহযোগিতার জন্য তাঁর দ্বারস্থ হয়। তিনিও স্বামীর মতো তাদের যথাসম্ভব সময় দেন, সাহায্য করেন। সবার সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে চেষ্টা করেন। তাই সবাই ডাক্তার আবু সালেহর পরিবারের প্রতি আলাদা সম্মান ও ভালোবাসা দেখাতে কৃপণতা দেখায় না। ঢাকা শহরের অনেক মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগমের এবং ডাক্তার সালাউদ্দিনের প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ড্রয়িংরুমের বড় জানালার পাশে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগম। তিনি ভাবছেন, বাইরে পড়ন্ত বেলার অন্তিম আলোয় প্রকৃতিও ক্লান্ত হয়ে ঝিমোচ্ছে। এ সময় তাঁর দৃষ্টি চলে যায় গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যৌবনবতী কৃষ্ণচূড়াগাছটার দিকে। সবকিছু ছাপিয়ে এখন উজ্জ্বল লাল-হলুদ কৃষ্ণচূড়ায় ছেয়ে থাকা গাছটাই তাঁর কাছে ভালো লাগছে বেশি! এই গাছটা ডাক্তার আবু সালেহ নিজেই লাগিয়েছিলেন। তখন সালাউদ্দিন ছোট। সেন্ট যোসেফে পড়ে। সেদিন ডাক্তার আবু সালেহ বলেছিলেন, ‘গাছ আর সন্তান আমার কাছে সমান মেহেরু! তারা সময় নিয়ে বড় হয়। তাই তাদের যত্ন করতে হয়।’ শুধু কৃষ্ণচূড়া নয়, নারকেল, আম, কাঁঠালসহ অনেক গাছ তিনি নিজের হাতে রোপণ করেছিলেন এই বাড়িতে। সব গাছই বড় হয়েছে। সেই ছোট সালাউদ্দিনও। অথচ এখন শুধু তিনি নেই! ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগমের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে! ঘুরে তিনি তাকালেন দেয়ালে টাঙানো তাঁদের দুজনের যুগল ছবিটার দিকে। আত্মবিশ্বাসী মানুষটার চোখেমুখে কী দীপ্তি! ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবছেন তিনি, মানুষটা হাসপাতাল থেকে একটু পরেই ফিরে আসবেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জুতা খুলতে খুলতে বলবেন, ‘মেহেরু, আজ চারটা বাইপাস করলাম…!’ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার তিনি বেরিয়ে যাবেন চেম্বারের উদ্দেশে!
ডাক্তার আবু সালেহ কথা কম বলতেন। কিন্তু মানুষের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিত। ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগম সেটা জানতেন। তিনি দেখেছেন, গভীর রাতে বারান্দায় পায়চারি করছেন মানুষটা। পুরো ঢাকা শহর ঘুমিয়ে। অথচ তাঁর চোখে ঘুম নেই। যেন তাঁর প্রতিটি রোগীর হৃৎস্পন্দন তিনি নিজের বুকের ভেতরে অনুভব করছেন!
আজও বাড়ির প্রতিটি জিনিসে ডাক্তার আবু সালেহর হাতের স্পর্শ উজ্জ্বল হয়ে আছে! বুকশেলফে এলোমেলো মেডিকেল জার্নাল, বই। টেবিলে পুরোনো স্টেথোস্কোপ, ডায়েরি-কলম। আলনায় তাঁর পরিধেয় জামাকাপড়…সব! সালাউদ্দিন বলেছে, ‘বাবা তাঁর জিনিস যেভাবে রেখে গেছেন, সবই ঠিক তেমনই থাকবে।’
ড্রাইভার মফিজ এসে নিচু স্বরে বলল, ‘চাচি, গেইট খুইলা দিছি।’ ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগম মাথা নাড়লেন। চাবিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকলেন তিনি। আজ নিজেই গাড়ি চালাবেন। সিদ্ধান্তটা ছোট হলেও তাঁর জন্য এখন তত সহজ নয়। অনেক দিন পর তিনি নিজেকে আবার অতীত জীবনের আবহে ঠেলে দিতে চাইছেন। সেই অতীতের সবই তো আছে। কিন্তু তাঁর পাশের ও কাছের মানুষটি নেই …! তাঁকে ছাড়া এ পর্যন্ত তিনি নিজেকে একা টেনে নিয়ে এসেছেন! এ–ও সম্ভব হয়েছে? তাঁর মনে হচ্ছে, মানুষ একসময় শোকের সঙ্গেও সহাবস্থান করতে শিখে ফেলে। শোক স্মৃতি থেকে মুছে যায় না কখনো। শোকও অতীতের আনন্দবিজড়িত স্মৃতির অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে লেপ্টে থাকে মানুষের জীবনের সঙ্গে। তাকে আলাদা করা যায় না। শোক ছায়া হয়ে ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে নিঃশব্দে অবস্থান করে। তাকে সঙ্গ দেয় প্রতিনিয়ত।
ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগম ধীরপায়ে বারান্দা পেরিয়ে নিচে নামলেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গিতে এখনো একধরনের সৌম্য-দৃঢ়তা আছে। গেটের বাইরে এসে দাঁড়ালে, এলাকার মানুষ তাঁকে দেখে সালাম দেয়। তাঁর দিন কেমন যাচ্ছে, জানতে চায়। তাদের কাছে তিনি শুধু একজন মমতাময়ী ডাক্তার নন, তিনি এমন একজন মানুষের জীবনসঙ্গী, যাঁকে মানুষ কিংবদন্তির মতোই মনে করে। তাঁকে হারিয়ে তারাও বিচলিত, বেদনাহত।
গাড়ির দরজা খোলার আগে মেহেরুন্নেসা আকাশের দিকে তাকালেন। তাঁর মনে হচ্ছে, ডাক্তার আবু সালেহর উপস্থিতি তিনি খুব বেশি অনুভব করছেন। আঠারো মাস চলছে এই মানুষটা গত হয়েছেন! মনে হচ্ছে, তাঁকে ছাড়া এরই মধ্যে কত যুগ পার হয়ে গেছে! কিন্তু নীরবে তাঁর পাশেই অবস্থান করছেন তিনি! হয়তো এ অনুভূতি বাস্তব নয়। হয়তো এ নিঃসঙ্গতারই ভিন্নতর বাস্তব রূপ। তবু মানুষ শেষ পর্যন্ত স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। তিনিও বাঁচবেন হয়তো…!
স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই শরীরে আলাদা অনুভূতি টের পান মেহেরুন্নেসা। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই পুরোনো গাড়িটা সশব্দে কেঁপে উঠল। খুব শখ করেই গাড়িটি কিনেছিলেন ডাক্তার আবু সালেহ। সাদা রঙের এ গাড়িতেই দুজনে চড়তেন। ডাক্তার আবু সালেহ পাশে বসে রোগীদের গল্প করতেন। আর ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগম ত্যক্তবিরক্ত গলায় বলতেন, ‘তুমি হাসপাতালে থেকে ডাক্তারি করো। গাড়িতে বসে, বাসায় এসেও ডাক্তারি করো। আমি কিন্তু তা করি না!’ ডাক্তার আবু সালেহ হেসে বলতেন, ‘হৃৎপিণ্ডের কাজ কিন্তু বন্ধ হয় না মেহেরু! আমার ডাক্তারি বন্ধ হবে কীভাবে?’
ধানমন্ডি-২৭ পেরিয়ে মিরপুর রোডের সিগন্যালে এসে মেহেরুন্নেসা ভাবছেন, এবার কোথায় যাবেন। উত্তরে, নাকি দক্ষিণে? বোটানিক্যালে? না রমনা পার্কে? তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘কোথাও না। আমি যাব বনানীতে! সেখানে শুয়ে আছে আমার সালেহ! তার কবর ছুঁয়ে মানুষটিকে বলব, তোমাকে খুব বেশি মিস করছি। আমি তোমার মেহেরু! অপেক্ষা করো, শীঘ্রই আমি চলে আসছি তোমার কাছে!’ সংসদ ভবন বাঁয়ে রেখে ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগমের গাড়ি ছুটে চলেছে বনানীতে অবস্থিত শেষ গন্তব্যের উদ্দেশে।