শ্রেণিকক্ষ ও স্ক্রিনের বাইরে: তেহজীবের ব্যতিক্রমী শৈশব
তেহজীবের সঙ্গে আমার পরিচয় কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নয়। বরং ভ্রমণের পথে—যে পথ মানুষের চরিত্র ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে—সেই খোলা ও অনিশ্চিত পরিসরেই আমাদের পরিচয়। পাহাড়ি পথে দীর্ঘ ট্রেকিংয়ের সময় মানুষ যেমন নিজের প্রকৃত স্বভাব প্রকাশ করে, তেমনি সেখানেই আমি তেহজীবকে চিনতে শুরু করি।
তাকে দেখার আগেই শুনেছিলাম আমাদের দেশের এক ছোট মেয়ের গল্প—যে অসম্ভব রকমের মানসিক পরিণতি ও সাহস নিয়ে পাহাড়ে ট্রেক করে। কিন্তু তার সঙ্গে ভ্রমণ করার পরই বুঝতে পারি, কেন ভ্রমণপিপাসুরা তার কথা এত আগ্রহ ও ভালোবাসার সঙ্গে বলে।
২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নেওয়া তেহজীব এখন ১২ বছর বয়সী এবং পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু তার শৈশব কোনোভাবেই শহুরে গড়পড়তা শৈশবের মতো নয়। আজকের অনেক শিশুর জীবন যেখানে মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনের স্ক্রিনে আবদ্ধ, ঘরের বাইরে যাওয়া সীমিত এবং মানুষের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত—তেহজীব সেখানে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
শৈশবের শুরুতে সে ছিল ভীষণ লাজুক। অপরিচিত মানুষ দেখলে ভয় পেত, বাড়িতে অতিথি এলে অস্থির হয়ে পড়ত, প্রায়ই কাঁদত। অন্য শিশুদের সঙ্গেও খুব কম কথা বলত। তার অন্তর্মুখী স্বভাব এতটাই গভীর ছিল যে পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও সহজে তার সঙ্গে মিশতে পারত না। আজ পাহাড়ের পথে যে আত্মবিশ্বাসী ও সাবলীল তেহজীবকে দেখি, তার শৈশবের সেই তেহজীবের কথা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।
এই পরিবর্তনের শুরু তার বাবা–মায়ের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে। তাঁরা চেয়েছিলেন, তাঁদের সন্তান প্রকৃতির সঙ্গে বড় হোক। আড়াই বছর বয়স থেকেই তাঁরা তাকে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণে যেতে শুরু করেন। চার বছর বয়সে সে ট্রেকিং শুরু করে। যখন অনেক শিশু তখন স্কুলের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তেহজীব শিখছিল অসমান পাথরের ওপর হাঁটা, অচেনা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রকৃতির ভাষা বোঝা।
এই অভিজ্ঞতাগুলোই তার সামাজিক ও মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। শ্রেণিকক্ষের গণ্ডির বাইরে সে শিখেছে গ্রামের মানুষ, আদিবাসী সম্প্রদায়, সহযাত্রী ট্রেকার এবং অচেনা পরিবেশের কাছ থেকে। তেহজীব ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলাই ভ্রমণ করেছে। বান্দরবানের কঠিন ট্রেইল—কেওক্রাডং, তাজিংডং ও যোগীহাফং—সে অনায়াসে পাড়ি দিয়েছে। নদী পার হওয়া কিংবা ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটা তার কাছে স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
একদিন দীর্ঘ ট্রেক শেষে আমরা সবাই যখন রাতের খাবারের জন্য বিরক্ত হয়ে অপেক্ষা করছিলাম, আমি দেখেছি সে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সে বলল, ‘সবকিছু সব সময় আমাদের ইচ্ছেমতো হয় না। একটু অপেক্ষা করি।’
এই কথাগুলো আমাকে থমকে দিয়েছিল। সেদিন বুঝেছিলাম, এই শান্ত প্রজ্ঞা তার বয়স থেকে আসেনি—এসেছে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে।
চার বছর বয়সে কেওক্রাডং ট্রেকের সময়ই সে প্রথম সবাইকে চমকে দেয়। অনেকেই ভেবেছিল তাকে কোলে করে নিতে হবে। কিন্তু সে প্রায় পুরো পথ নিজেই হেঁটে যায়। এক খাড়া অংশে বাঁশের লাঠি ব্যবহার করে নিজেই উঠে পড়ে, আর আশপাশের ট্রেকাররা তাকে উৎসাহ দেয়। পরে বাংলাদেশের অন্যতম কঠিন ট্রেইল যোগীহাফংয়েও একই দৃঢ়তা দেখায়। এক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গাইড দড়ি ব্যবহার করতে চাইলে সে আপত্তি করে, নিজেই দড়ি শক্ত করে ধরে পথটা পার হয়। এরপর গর্বের সঙ্গে বলে, ‘মা, আজ আমি মোগলি হয়ে গেছি।’
এটি ছিল নিজের সক্ষমতা আবিষ্কারের আনন্দ।
বাংলাদেশের বাইরেও তার অভিজ্ঞতা বিস্তৃত। ভারতের হাম্পতা পাস, কাশ্মীর গ্রেট লেক, বরফে ঢাকা কেদারকান্ত, মেঘালয়, নাগাল্যান্ডের জুকু ভ্যালি এবং শ্রীনগর–মানালি–লাদাখ রোড ট্রিপ—সবই তার শৈশবের অংশ। এসব ভ্রমণ তাকে নানা সংস্কৃতি, মানুষ ও জীবনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, যা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত করেছে।
তার সামাজিক পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ দেখা যায় ২০২০ সালে বান্দরবানের দলিয়ান পাড়ায়। যে মেয়েটি একসময় অপরিচিত মানুষ দেখলে লুকিয়ে থাকত, সে সেদিন পুরো দিন কাটিয়েছে পাহাড়ি গ্রামের মেয়ে আইননের সঙ্গে। গির্জায় গেছে, গান গেয়েছে, ভাষা শিখেছে, নির্ভয়ে খেলেছে। বিদায়ের সময় গ্রামের শিশুরা তাকে আবার আসার আমন্ত্রণ জানায়। দীর্ঘ সফরে সে কখনো খাবার বা অস্বস্তি নিয়ে অভিযোগ করে না। পাহাড়ের সাধারণ খাবার, বিস্কুট বা বাদাম—সবকিছুই সে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে। বরফ, ঠান্ডা বাতাস, কড়া রোদ কিংবা ঢাকার যানজট—সবখানেই তার ধৈর্য চোখে পড়ে। ধর্ম, সামাজিক পটভূমি বা আচরণের ভিন্নতাকে সে সম্মান করে এবং ছোটখাটো দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলে।
দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে আমি বুঝেছি, তেহজীব এক ভিন্ন ধরনের শৈশবের প্রতিনিধি—যেখানে প্রকৃতি, সহনশীলতা, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও মানবিক সংযোগ মিলেমিশে একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ গড়ে তুলেছে। তার বাবা–মা সচেতনভাবেই স্ক্রিননির্ভর, অতিনিয়ন্ত্রিত শৈশবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তারা তার শেখার পথ তৈরি করেছেন।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, ভ্রমণ কীভাবে স্বাভাবিকভাবে সহমর্মিতা ও মানবিক সংযোগ গড়ে তোলে—যা আজকের শহুরে শিশুদের জীবনে ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এই গল্প আমাদের বড় একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। শহুরে জীবনে আমরা কি শিশুদের অতিরিক্ত নিরাপদ রাখতে গিয়ে তাদের বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত করছি? পড়াশোনায় ভালো করা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু আবেগগত বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তা কি শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে শেখানো যায়?
তেহজীবের জীবন সবার জন্য পাহাড়ে ওঠার আহ্বান নয়। বরং এটি মনে করিয়ে দেয়—গ্রাম, প্রকৃতি, ভিন্ন মানুষ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর ভূমিকা রাখতে পারে। ছোট পরিসরে হলেও ভ্রমণ, খেলার মাঠ, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ—এসবই শিশুদের স্ক্রিনের বাইরের জীবন চিনতে সাহায্য করে।
আজকের ডিজিটাল প্রজন্মের সামনে তাই প্রশ্নটা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে: আমরা কি সন্তানকে শুধু ভালো ছাত্র বানাতে চাই নাকি একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে চাই?
*লেখক: আনজুমান আরা, শিক্ষার্থী, সাউথ এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি, ভারত: [email protected]