‘বিদ্রোহী’ কবির জন্মদিন উদ্‌যাপন

নজরুলের জন্মদিনে কনিষ্ঠ পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী তাঁকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন।

‘অবিশ্বাসীরা শোনো, শোনো সবে জন্ম-কাহিনী মোর,

আমার জন্ম-ক্ষণে উঠেছিল ঝঞ্ঝা-তুফান ঘোর।’

‘চির-নির্ভয়’ কবিতায় চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই দৃপ্ত উচ্চারণ। ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের প্রাণের কবি। তাঁর প্রয়াণের অর্ধশতাব্দী পরেও বিশ্বজুড়ে বাঙালি মাত্রই মহাসমারোহে পালন করেন কবির জন্মদিন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। দুই বাংলাজুড়ে সাম্যবাদী কবির জন্মদিনটিকে স্মরণ করে নানা আয়োজন করা হয়েছে। আজও তাঁর সৃষ্টি সমানভাবে জনপ্রিয় ও প্রাসঙ্গিক। অস্থির সময়ে তাঁর লেখা আমাদের শক্তি জোগায়, জীবনকে সঠিক পথে চালিত করে। তাই আজ মানবতা যখন বিপন্ন, পৃথিবীজুড়ে অশান্তির বাতাবরণ, ঠিক তখনই আমরা বারংবার ফিরে যেতে চাই তাঁর সৃষ্টির কাছে। ১৯৩৮ সালে কলকাতায় দৈনিক ‘কৃষক’ পত্রিকার অফিসে, জন-সাহিত্য সংসদের শুভ উদ্বোধনে সভাপতি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘কাব্যে ও সাহিত্যে আমি কী দিয়েছি, জানি না। আমার আবেগে যা এসেছিল, তাই আমি সহজভাবে বলেছি, আমি যা অনুভব করেছি, তাই আমি বলেছি। ওতে আমার কৃত্রিমতা ছিল না।’ নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা তাঁকে সবার থেকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।

সুস্থাবস্থায় নজরুল ইসলামের জন্মদিন পালিত হয়েছে। আবার তিনি যখন বাক্‌রুদ্ধ তখনো তাঁর অনুরাগীরা সাড়ম্বরে তাঁর জন্মদিন উদ্‌যাপন করেছেন। কবির সান্নিধ্য লাভ করেছেন, এমন বহু গুণী মানুষের স্মৃতিচারণায় আমরা সেই বিশেষ দিনটি সম্পর্কে জানতে পারি। নজরুলপ্রেমী মাত্রই জানতে চান, বিশেষ দিনে কবি কীভাবে সময় কাটাতেন—এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় বিদগ্ধজনের স্মৃতিচারণায়। কবির জীবদ্দশায় পালিত বেশ কয়েকটি জন্মদিন সম্পর্কে কিছু তথ্য এই লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

১৯৪১ সালের ২৫ মে কলকাতার ডেন্টাল কলেজ প্রাঙ্গণে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে মহাসমারোহে নজরুলের ৪৩তম জন্মোৎসব পালিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী। এই জন্মোৎসব বিষয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছিল (১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪৮)—‘কাজী নজরুল ইসলামের ৪৩তম জন্মতিথি উপলক্ষে বিগত রোববার অপরাহ্ণ মুসলিম সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে ১১৪ নং লোয়ার সার্কুলার রোডস্থ ডেন্টাল কলেজ হলে একটি প্রীতিপ্রদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বক্তা কবি নজরুলের কবিতা ও সংগীতের গুণবাচক সমালোচনা করিয়া তাহার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। আবদুল কাদের ও কাজী আবদুল ওদুদ সভায় স্বরচিত প্রবন্ধ পাঠ করেন। ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন, এক সময়ে সমগ্র বাংলাদেশে কবির উদ্দীপনাময়ী কবিতা ও সংগীতের ঝংকারে হৃদয়ে সেইদিন নতুন আশার সঞ্চার হইতে দেখা গিয়াছিল। কবি নজরুলের কবিতা ও সংগীতে আশাবাদীর আদর্শ প্রকটিত হইয়াছে এবং ওইগুলোর মধ্য দিয়া দরিদ্র জনসাধারণের প্রাণের কথা প্রকাশিত হইয়াছে। সভাপতি যতীন্দ্রমোহন বাগচী কাজী নজরুলের উদ্দেশে একটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। খাঁ বাহাদুর আবদুর রহমানও সভায় বক্তৃতা করেন। সভায় প্রসিদ্ধ গায়ক আব্বাসউদ্দীন কবি নজরুলের রচিত একটি সংগীত গাহেন।...‘কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ শ্রীমতী কল্যাণী কাজী সম্পাদিত ‘শত কথায় নজরুল’ গ্রন্থে নজরুলকে নিয়ে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর লেখা কবিতা ‘কবি-বরণ’ প্রকাশিত হয়। কবিতাটি সম্পর্কে লেখা হয় ‘১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে কলকাতা ডেন্টাল কলেজ হল প্রাঙ্গণে কবি নজরুল ইসলামের ৪৩তম জন্মতিথি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরলোকগত কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী। তিনি তাঁর অভিভাষণ দানের পর এই স্বরচিত কবিতাটি আবৃত্তি করেন।’ কবিতাটি নিম্নরূপ—

কবি-বরণ

কাব্যের অমৃত-রসে চিত্ত যার প্রমত্ত মশগুল,

মালঞ্চে যাহার নিত্য ফোটে ফুল, ডাকে বুলবুল,

সেই নজরুল কবি, তারি এই জনম-তিথিতে

কোন্ প্রশান্তির বাণী কে বা তা’রে যাবে শুনাইতে?

যে-জন সুরের রাজা, কী সুর লাগিবে তা’র কানে;

অবেলায় বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ যার, সে কি তাহা জানে?

১৯৪৬ সালের ২৫ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল সাহিত্য মজলিশের উদ্যোগে ইসলামিয়া কলেজ হলে নজরুলের ৪৮তম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নরেন্দ্র দেব। সভায় উপস্থিত গুণীজন নজরুলের রচনার প্রচার কামনা করেন। মাহবুবুল হকের লেখা ‘নজরুল তারিখ অভিধান’ থেকে এই জন্মদিন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়—সুভাষ মুখোপাধ্যায় নজরুলের রচনাকে বাঙালির চিরায়ত প্রেরণার উৎস বলে গণ্য করেন। আবুল মনসুর আহমদ বলেন, মানবিকতাই নজরুলের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। সভাপতির ভাষণে নরেন্দ্র দেব নজরুলের প্রতিভার বহুমুখী অবদানগুলোর ওপর আলোকপাত করেন। সভায় নজরুলের দ্রুত রোগ নিরাময় কামনা করা হয়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

১৯৪৭ সালে বিভিন্ন জায়গায় নজরুল জন্মজয়ন্তী পালন করা হয়। সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সংগঠনের কার্যালয়ে নজরুলের ৪৯তম জন্মদিবস সাড়ম্বরে উদ্‌যাপিত হয়। জলপাইগুড়ি মুসলিম মহিলা লাইব্রেরির উদ্যোগে এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়। ফরিদপুরে মুসলিম ছাত্রছাত্রী সমাজ এই বিশেষ দিনে টাউন হলে সমাবেশ করে, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা।

কলকাতায় ইকবাল হলে বিরাট সমাবেশ হয়, সভাপতিত্ব করেন নিজাম হায়দার। ১৯৫০ সালে করাচিতে নজরুলের ৫২তম জন্মদিবস পালিত হয়, সভাপতিত্ব করেন সাহেদ সোহরাওয়ার্দী।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম

১৯৫২ সালের ২৭ জুন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে কলকাতায় বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের উদ্যোগে নজরুলের চিকিৎসার জন্য ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’ গঠিত হয়। এই নিরাময় সমিতির উদ্যোগে ‘জল আজাদ’ জাহাজে ১৯৫৩ সালের ১০ মে নজরুলকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর সঙ্গী ছিলেন পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ যাঁর ডাক নাম নিনি। নজরুলের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ শ্রীমতী কল্যাণী কাজী তাঁর ‘অন্তরঙ্গ অনিরুদ্ধ’ গ্রন্থে ২৬ মে, ১৯৫৩ সালে কাজী অনিরুদ্ধর লেখা একটি চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে নজরুলের জন্মদিন পালনের অনুষঙ্গ রয়েছে -‘নিনি বর্ণনামূলক চিঠি খুব ভালো লিখতে পারতেন। বাবার জন্মদিন জাহাজে কীভাবে পালিত হয়েছিল এবং বিদেশ যাওয়ার পথে কী কী দেখেছিলেন, তার বর্ণনা দিয়ে আমায় লিখলেন—

স্নেহের ছবি,

গতকাল বাবার জন্মদিন গেল। আমরা এখানে একটা বেশ বড় function করলাম। আমি Music-এর দিকটা পরিচালনা করলাম। অনেকে বক্তৃতা ইত্যাদি করল। বেশ ভালোই হয়েছে।’

জন্মদিনে কবির বাড়িতে অনুরাগীদের ভিড় লেগেই থাকত। সংগীতশিল্পীরা নজরুল-সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে কবির প্রতি তাঁদের সম্মান জ্ঞাপন করতেন। বিশিষ্ট নজরুল-সংগীতশিল্পী ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র বলেছেন, ‘ঠিক এই জন্মদিনের বছর খানেক আগে কবির মস্তিষ্ক-বিকৃতি ঘটেছে। কবি পত্নী অর্থাৎ প্রমীলাদি তখন শয্যাশায়ী। আমি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে কবির বাসগৃহে গিয়েছিলাম। কবির সামনে গিয়ে বসে আছি। কাজীদা আড়চোখে একবার আমার দিকে চেয়ে আবার হারমোনিয়ামের দিকে চোখ ফেললেন। আমি পর পর কবির রচিত ও সুরারোপিত চারটি গান গেয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে শৈলেন রায়ের একটা গান ধরলাম। হঠাৎ কবির দিকে চাইতে দেখি তিনি মোটা মোটা চোখে আমার দিকে তাঁর বিরক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে সেই গানটি অসমাপ্ত রেখে কাজীদার অন্য একটি গান ধরলাম। আমি যে কটা গান গেয়েছিলাম কাজীদা সব কটিতেই দুই হাতে তালি বাজিয়ে তাল দিচ্ছিলেন এবং সেই তাল কখনো বেতাল বা বেসুরো বলে মনে হয়নি । এর থেকে বোঝা যায়, কবি যদিও নীরব ছিলেন কিন্তু তাঁর চেতনা ছিল। ‘দুই বাংলায় নজরুল-সংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী ফিরোজা বেগমের কথায় জানা যায়, কীভাবে নজরুলের জন্মদিবস তাঁরই উদ্যোগে কলকাতায় পালিত হয় -‘১৯৬২ সালে কলকাতায় মহাজাতি সদনে আমারই উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী দু-বেলার প্রোগ্রামে প্রাচীন ও নবীন নজরুল-গীতির শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন, অন্য ক্ষেত্রে সফল বিখ্যাত বহু গীতশিল্পী এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন, ফাঁকে ফাঁকে ছিল কল্লোল যুগের নজরুল-সমকালীন লেখকদের আলোচনা ও স্মৃতিচারণা। সব মিলিয়ে দারুণ জমজমাট হয়েছিল সেই অনুষ্ঠান। সেই সূচনা। তারপর থেকে নজরুল-গীতির চর্চা ক্রমশ ব্যাপকতর হতে থাকে। তারপরও কয়েক বছর কবির জন্মদিবস ঘটা করে উদ্‌যাপন করেছি কলকাতায়। নজরুল-গীতির জনপ্রিয়তা তারপর ক্রমাগতই বেড়েছে।’

মাহবুবুল হকের নজরুল তারিখ অভিধান থেকে জানা যায় -১৯৬৪ সালের ২৪ মে ঢাকায় নজরুল-চর্চার উদ্দেশ্যে নজরুল একাডেমি তৈরি হয়। এই একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ও উদ্যোক্তা ছিলেন কবি তালিম হোসেন ও অ্যাডভোকেট এ কে এম নূরুল ইসলাম। তাঁদের উদ্যোগে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে নজরুল জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়।

জন্মদিনে নজরুলকে গান শোনানোর সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন বিখ্যাত সংগীতশিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। সেই দিনের স্মৃতি অনেকদিন পর্যন্ত উজ্জ্বল ছিল -‘১৯৬৭ সালে যখন প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো, তখন নজরুলকে জন্মদিনে আনা হয়েছিল রবীন্দ্র সদনে। সর্বসাধারণের সামনে নজরুল-জন্মজয়ন্তী পালিত হয়েছিল। আমি রবীন্দ্রসদনের মাঠে আম্রকাননে গেয়েছিলাম – ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী’। খুব দরদ দিয়ে গেয়েছিলাম। অদ্ভুত একটা expression লক্ষ্য করেছিলাম কবির চোখে-মুখে। দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ছিল জল। মনে হচ্ছিল এবার জেগে উঠবেন ওই নীরব যোগী। আমারও শিল্পী হিসেবে মনে হচ্ছিল আজ আমি সার্থক।’

কবির ৭০তম জন্মজয়ন্তীর প্রাক্কালে তাঁর শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, সেই সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক দ্বিজেন্দ্রকুমার রায়—

‘গত জন্মদিনের আগের কয়েক দিন তাঁর একটু উত্তেজনা ভাব দেখা দেয়, ব্লাড প্রেসার নিয়ে দেখি, প্রেসার বেড়েছে। কবি তাঁর হাত দিয়ে আমায় পরীক্ষা কাজ চালাতে নিষেধ করেন এবং শব্দ করে বিরক্ত ভাব প্রকাশ করেন। কাজী সব্যসাচী কবির ভাব দেখে বলেন, ‘কবি কয়েক দিন থেকে একটু অন্য রকম, তাঁকে কি জন্মদিনে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে?’

একদিকে অগণিত জনসাধারণ কবিকে একবার দেখার জন্য অসীম আগ্রহে অপেক্ষা করবেন, অন্যদিকে কবির মানসিক অবস্থা ভালো নয়, অনুষ্ঠান থেকে বের হলে কবির অসুস্থতা বেড়েও যেতে পারে। এই সব কথা চিন্তা করে উপযুক্ত চিকিৎসায় উত্তেজনা কমিয়ে দিয়ে জন্মদিনে তাঁকে রবীন্দ্রসদনে যাওয়ার জন্য বের করি। আপনজন হিসাবে আমি কবির সঙ্গে সর্বক্ষণ ছিলাম, কবিও বেশ কিছুটা ভালো বোধ করছিলেন। ৭০তম জন্মদিনের আয়োজন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এত সুন্দরভাবে করেছিলেন যে, কবির পক্ষে কোনো প্রকার ক্ষতি বা উত্তেজনার কারণ হয়নি।’

১৯৬৯ সালের ২৪মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদেশব্যাপী জন্মোৎসব পালনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কবি নজরুলকে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করে। কবির বসবাসের জন্য সরকার জমি প্রদান করে এবং গৃহ নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করে। অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়, যাঁর কণ্ঠে নজরুলের গান আজও সমানভাবে জনপ্রিয়, তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘নজরুলের গানের প্রতি আমার অনুরাগ ছেলেবেলা থেকেই, কিন্তু ওঁর সঙ্গে আমার চাক্ষুষ সাক্ষাৎ ঘটে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে। সেদিন রবীন্দ্র-সদনে কবির জন্মতিথি পালিত হচ্ছিল। সানিদা (কাজী সব্যসাচী), নিনিদা (কাজী অনিরুদ্ধ) কবিকে উৎসবমঞ্চে নামালেন। সেখানেই ওঁদের সঙ্গে পরিচয়। সেদিনই সন্ধ্যায় কবির ক্রিস্টোফার রোডের বাড়িতে নজরুল-গীতি গাইলাম। “মোমের পুতুল মমির দেশের মেয়ে নেচে যায়”, “র-দ্বীপবাসিনী,” “নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখিজল” আর “কেউ ভোলে না কেউ ভোলে অতীত দিনের স্মৃতি”।’

বিশ্বনাথ দে ১৩৭৭ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ‘কবিগৃহে একদিন’ শিরোনামে এক লেখা লিখেছিলেন। লেখায় জন্মদিনে নজরুলের বাড়ির পরিবেশ কেমন থাকত, তার বিশদ বিবরণ তিনি দিয়েছেন। তাঁর লেখা থেকে জানতে পারি -‘সৌম্য শান্ত সুন্দর মূর্তি কাজী নজরুলের। পরনে গরদের পাঞ্জাবি আর কালো-পাড় ধুতি। মনে হলো দুরারোগ্য ব্যাধি যেন মহাবিদ্রোহী কবি-সত্তাকে ক্লান্ত করতে পারেনি, ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ করেছে মাত্র। কবি যেন তাঁর আয়ত চোখের নীরব ভাষা দিয়ে সবার প্রতি শুভেচ্ছা ঢেলে দিলেন। জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ উমা কাজী কবিকে সন্দেশ খাওয়ালেন। ছোট ছেলেকে, অবোধ ছেলেকে মা যেমন করে ধরে-বেঁধে জলের গ্লাস মুখে ধরে, তেমনি করে খাওয়ালেন জল। মুখটিও তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিতে হলো। বিছানায় বসে কবি তাঁর ডানদিকের জানালার পাশে তাকালেন একবার। ছোট গোল টেবিলের ওপর ও কে ? ও কার ছবি ? কবির আজ চেনারও কোনো সাধ্য নেই ও ছবি কার! যুঁই ফুলের মালা দেওয়া ওই ছবিটি লোকান্তরিতা কবি-পত্নী প্রমীলা দেবীর। যিনি আমৃত্যু সব সময় কবির পাশে পাশে থেকেছিলেন। কবি সে ছবির দিকে নির্বিকারভাবে একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে তাকালেন আমাদের দিকে। পাকিস্তান হাই-কমিশনার কবিকে প্রাণের প্রণতি জানালেন। অজস্র সুগন্ধী পুষ্পস্তবক আর মালায়-মালায় অল্পক্ষণের মধ্যেই ছেয়ে গেল কবির দুই পাশ। নিচের মঞ্চে তখন শুরু হয়েছে কবির জন্মোৎসবের অনুষ্ঠান। টিপ টিপ বৃষ্টি থেমে গেছে, ইতিমধ্যে জলজমা পথে পা রেখে প্রচুর মানুষ কখন এসে বসেছে চেয়ারগুলো দখল করে। স্থান নেই আর। নেই তো কি হবে? দাঁড়াতে বাধা কোথায়? উদ্বোধন সংগীতে কবি নজরুলেরই গান গাইছেন কবি-পুত্রবধূ, কল্যাণী কাজী আর ডা. অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়।’

কাজী নজরুল ইসলামের ৬৮তম জন্ম দিবসে কলকাতায় কবির বাড়িতে নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় হারমোনিয়াম সহযোগে সংগীত পরিবেশন করছেন, পাশে মনযোগ সহকারে শুনছেন কল্যাণী কাজী (কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ), অভিনয়জগতের কিংবদন্তি শিল্পী অনুপ কুমার, রবি ঘোষসহ স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম।

জন্মদিনে নজরুলের নির্বাক উপস্থিতিতে ব্যথিত হতেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা। এই প্রসঙ্গে কবির বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কথা স্মরণ করতেই হয়। নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘নজরুল আমার বন্ধু। একসঙ্গে একই গ্রামে থেকে খেলাধুলা করে আমরা মানুষ হয়েছি। আমার সেই ছোটবেলার বন্ধুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আজ সে আমায় চিনতে পর্যন্ত পারে না -এর চেয়ে মর্মান্তিক দুঃখ আমার কাছে আর কিছুই নেই।’

আঙুরবালা দেবী যিনি নজরুলের একাধিক গান কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন, তিনি এই বিশেষ দিনে কবির অসুস্থতার কথা ভেবে আবেগবিহ্বল হয়ে পড়তেন। তাঁর স্মৃতিচারণায় উঠে আসে -‘এখন কাজীদার জন্মদিনের উৎসবে তাঁর ছেলেরা আর তাদের বৌরা আমাকে নিতে আসে, এই কিছুদিন আগেও তাঁর জন্মদিনের উৎসবে আমাকে নিতে এসেছিল, কিন্তু আমি যেতে পারিনি। যে কাজীদা ঘর আলো করে আমাদের মাঝখানে বসে গান লিখেছেন, সুর তৈরি করেছেন আর শিখিয়েছেন আমাদের, আজ তাঁর কোন রূপ দেখার জন্য যাব ?’

সরযূ দেবীর লেখায় একই সুর ধ্বনিত হয় -‘কাজীদার জন্মদিনের সে উৎসবে আমি গিয়েছিলাম। অনেক দিন, অনেক বছর পরে আবার দেখা হলো কাজীদার সঙ্গে। দেখা হলো বললে ভুল হবে, বলা উচিত দেখলাম তাঁকে। সেদিন কাজীদার দিকে তাকিয়ে সারা মন প্রাণ আমার বেদনার ঝংকারে বেজে উঠল। আমাদের অমন মজলিশী মানুষ কাজীদা নীরব ভাবলেশহীন ভঙ্গীতে মঞ্চের ওপর বসে আছেন। যে মানুষের চোখ দুটি সদাই ঝিকমিকিয়ে উঠতো খুশিতে, দুই চোখের হাসিতে যাঁর বিজলী খেলে যেতো অহরহ, হাসি-খুশি আনন্দে উল্লাসে যিনি সকলের মনপ্রাণ মাতিয়ে রাখতেন সব সময়, সেই মানুষটিই যেন সব বিলিয়ে সব হারিয়ে নিঃস্ব-নিঃসম্বল হয়ে নিষ্প্রভ চোখে তাকিয়ে বসে আছেন। কাজীদার জ্যোতিঝরা চোখ দুটিতে আর কোনো আলোর আভা ফুটে উঠছে না। দেখলাম নজরুল-জয়ন্তীর খুশিতে সবাই মত্ত। ফুলে ফুলে ভরে গেছে সারা মঞ্চটি। আকাশ বাতাস মুখর হয়ে উঠেছে কাজীদার গানে। জন্মদিনের উৎসবে কোনো ত্রুটি নেই। সবই আছে,সবই হয়ে চলেছে নিয়ম মাফিক, কেবল থেমে রয়েছে বাগিচার সেই বুলবুলের মিষ্টি কণ্ঠস্বর। শুনলাম, কে যেন গাইছেন, ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি?’ সবার অলক্ষ্যে আমারই চোখ দিয়ে ঝরে পড়লো অশ্রুধারা। সারা মন প্রাণ ব্যথায় মোচড় দিয়ে যেন বলে উঠল—নীরব কেন, নীরব কেন কবি? কাজীদাকে দেখে, কাজীদার দিকে তাকিয়ে একে একে মনে পড়ল কত কথা। কত ঘটনা। ধীরে ধীরে পুরোনো দিনের স্মৃতি ফুটে উঠল মনের নিভৃতে।’

১৯৭২ সালের ২৪ মে বাংলাদেশ সরকারের আগ্রহে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐকান্তিক ইচ্ছায় ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে নজরুলের জন্মজয়ন্তী উদ্‌যাপনের জন্য বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হয়। জন্মবার্ষিকীর শুভ মুহূর্তকে সামনে রেখে চলে জাঁকজমকপূর্ণ প্রস্তুতি। ঢাকায় কবিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখা হয়, কবিভবনে নিয়মিত গান শোনানোর ব্যবস্থা করা হয়। ২৫ বাংলাদেশে মানবতার কবি নজরুলের শারীরিক উপস্থিতিতে প্রথমবারের মতো ঢাকায় এবং সমগ্র বাংলাদেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তাঁর ৭৩তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবির বাসভবনে গিয়ে কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। নজরুলপ্রেমীদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

১৯৭৪ সালের ৪ জুন নারায়ণগঞ্জের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শাপলা’ নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে নজরুলের জন্মজয়ন্তী পালনের উদ্যোগ নেয়। এ উপলক্ষে নির্বাক নজরুলকে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসা হয়। বিকাল ৪টা থেকেই ক্লাব প্রাঙ্গণে বহু মানুষ আসেন। কবিকে বহনকারী মোটর যান নারায়ণগঞ্জের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় অনুরাগীরা বৃষ্টি উপেক্ষা করে কবিকে স্বাগত জানায়। রাত ৯টায় কবিকে নিয়ে অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার লোকের সমাগম হয়।

১৯৭৬ সালের ২৪ মে বাংলাদেশে তৎকালীন সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে নজরুলকে আর্মি ক্রেস্ট উপহার দেওয়া হয় এবং ‘চল্ চল্ চল্’গানটিকে বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঢাকার পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিন তখন কবির ঠিকানা। ঐ বছর ২৯ আগস্ট বিশ্বব্যাপী সকল অনুরাগীকে চোখের জলে ভাসিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরতরে বিদায় নেন নজরুল। ঢাকায় কবির সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে আশিসকুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখা কবিতার এই লাইনগুলি মনে পড়ে -

এক বাংলায় জন্ম তাঁহার

এক বাংলায় কবর,

একজনই সেই কবি, তবু

দুই বাংলার খবর।

একজনই সেই দুখু মিঞা

দুঃখ ঘোচান দুয়ের,

হাত ধরেছে দুই বাংলা

এক কবিকেই ছুঁয়ে।

এক বাংলার কুঁড়ি তিনি

এক বাংলার ফুল,

দুই বাংলা জুড়ে আছেন

একজনই নজরুল।

তথ্যসূত্র:

১. শত কথায় নজরুল, কল্যাণী কাজী সম্পাদিত

২. নজরুল স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত

৩. নজরুল তারিখ অভিধান, মাহবুবুল হক

৪. কাজী নজরুল ইসলাম বিষয়ক সাক্ষাৎকার, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত

৫. অন্তরঙ্গ অনিরুদ্ধ, কল্যাণী কাজী

লেখক: নজরুল সংগীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)