ফেরা, দূরত্ব আর নীরব প্রার্থনা
প্রবাসের জীবন অনেকটা অদৃশ্য এক দূরত্বের মতো। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক, নিয়মমাফিক, কাজ, ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়। কিন্তু ভেতরে কোথাও একধরনের নীরব শূন্যতা কাজ করে, যা সহজে কাউকে বোঝানো যায় না। দিনের শেষে যখন সবকিছু থেমে যায়, তখনই এই দূরত্বটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই দূরত্বটা সবচেয়ে বেশি টের পাই কিছু নির্দিষ্ট মুহূর্তে। যখন হঠাৎ করে কোনো রবীন্দ্রসংগীত কানে ভেসে আসে, ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’ কিংবা ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ।’ গানগুলো তখন আর শুধু গান থাকে না; তারা হয়ে ওঠে ফিরে যাওয়ার এক নীরব সেতু, হয়ে ওঠে স্মৃতির দরজা খুলে দেওয়ার চাবি। একেকটা সুর যেন একেকটা দরজা, খুলে দেয় বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা অনুভূতি।
প্রবাসে এসে বুঝেছি, নিজের দেশকে দূর থেকে ভালোবাসার অনুভূতি আলাদা। দেশের সবুজ গ্রাম, ভোরের কুয়াশা, বিকেলের মাঠ, কাঁচা রাস্তা, আর চেনা মানুষের হাসি, সবকিছু যেন আরও তীব্রভাবে ফিরে আসে মনে। ছোটবেলার বন্ধুরা, আড্ডার বিকেল, হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে কাটানো মধুর সময়গুলো, এসবই ধীরে ধীরে স্মৃতির ভেতরে জমা হতে থাকে। কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো ছুঁতে গেলে বাস্তবতার দেয়াল সামনে এসে দাঁড়ায়।
কখনো কখনো মনে হয়, স্মৃতিগুলোই যেন বেশি বাস্তব, আর বর্তমানটাই যেন অচেনা। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষটা নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায়, কোথায় তার সত্যিকারের ঠিকানা?
এই দূরত্ব আর সময়ের অনুভূতিটা মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দেয় জীবনানন্দ দাশের কবিতা ‘কুড়ি বছর পরে’ এর সেই লাইনগুলো,
‘আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!
আবার বছর কুড়ি পরে’
এই কয়েকটি লাইনের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে এক গভীর অপেক্ষা, এক অনিশ্চিত ফিরে পাওয়া। প্রবাসে থেকেও অনেক সময় এমনই মনে হয়, কত বছর পরে, কোন এক অচেনা সন্ধ্যায়, হয়তো হঠাৎ করেই আবার দেখা হবে সেই চেনা পথের সঙ্গে, সেই মানুষদের সঙ্গে, কিংবা নিজের ফেলে আসা জীবনের সঙ্গে। কিন্তু সেই দেখা হওয়াটা আগের মতো থাকবে কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সময় শুধু দূরত্ব তৈরি করে না, বদলও আনে, মানুষে, সম্পর্কে, এমনকি নিজের ভেতরেও।
কারণ, প্রবাসের জীবন শুধু অনুভূতির নয়, বাস্তবতারও। এখানে সময়কে হিসাব করে চলতে হয়, দায়িত্বের ভার বহন করতে হয়, নিজের জায়গা তৈরি করতে হয় প্রতিদিন। অনেক সময় নিজের অনুভূতিগুলোকে চুপ করিয়ে রেখে এগিয়ে যেতে হয়। ক্লান্তি থাকে, চাপ থাকে, অনিশ্চয়তা থাকে। এমন অনেক দিন আসে, যখন মনে হয়, সবকিছু ছেড়ে ফিরে যাই, কিন্তু সেই ফেরাটা আর এত সহজ থাকে না।
সবচেয়ে কঠিন হয়, ধীরে ধীরে নিজেকে বদলে নিতে শেখা। নতুন পরিবেশ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন মানুষ, সবকিছুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া সহজ নয়। অনেক সময় মনে হয়, যেন দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে ফেলে আসা সবকিছু, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতা। এই দুইয়ের মাঝখানে নিজের অবস্থান খুঁজে পাওয়া, নিজেকে হারিয়ে না ফেলা, এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।
অনেক সময় অনেক প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়, পরিবার, বন্ধু, কিংবা পরিচিত মানুষের। আমরা চেষ্টা করি, আমাদের জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব করার। কিন্তু সবসময় তা সম্ভব হয় না। সেই না পারার ভেতরেও এক ধরনের নীরব কষ্ট থাকে, যা কাউকে বোঝানো কঠিন। নিজের কাছেই অনেক সময় প্রশ্ন আসে, আরও কিছু করা যেত কি? কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না।
এই না পারার, এই দূরত্বের ভেতরেই কখনো কখনো মনে পড়ে হুমায়ুন আজাদের সেই সহজ অথচ গভীর উচ্চারণ,
‘ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।’
মনে হয়, যেন দূর থেকে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই একে অন্যকে এভাবেই বলি, ভালো থেকো। দেশকে, মানুষকে, ফেলে আসা শৈশবকে, সবুজ গ্রামকে, বন্ধুত্বকে, সবকিছুকে। কাছে না থেকেও, ছুঁতে না পারলেও, অন্তত এইটুকু বলা যায়। তারপরও আমরা চাই, শত বাধার মধ্যেও আমাদের জন্মভূমি ভালো থাকুক। প্রিয়জনেরা ভালো থাকুক। আমাদের না পারার ভেতরেও তাদের প্রতি এই নীরব প্রার্থনাটুকু যেন কখনো ফুরিয়ে না যায়।
জীবন এখানে থেমে থাকে না। সব কষ্ট, সীমাবদ্ধতা, আর অপূর্ণতার মধ্যেও আমাদের এগিয়ে যেতে হয়। ধীরে ধীরে আমরা শিখে যাই, সবকিছু পাওয়া যায় না, সবকিছু ফিরে পাওয়া যায় না। তবু চলতে হয়, নিজের জায়গা থেকে, নিজের মতো করে।
প্রবাসে থেকেও তাই পুরোপুরি হারিয়ে যাই না। কারণ, আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকে আমাদের শিকড়, আমাদের মাটি, আমাদের মানুষ, আমাদের স্মৃতি। কখনো কোনো গানের সুরে, কখনো কোনো গন্ধে, কখনো হঠাৎ কোনো শব্দে, সেই শিকড় আমাদের ভেতরে আবার জেগে ওঠে।
হয়তো এই ফেরাটা কখনো সম্পূর্ণ হয় না। হয়তো দূরত্বটা পুরোপুরি কমে না। কিন্তু এই অসম্পূর্ণতার ভেতরেই এক ধরনের গভীর সত্যতা আছে। কারণ এই বাস্তবতার মাঝেই আমরা বাঁচতে শিখি, এগিয়ে যেতে শিখি, আর নিজের ভেতরের দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখতে শিখি, নীরবে, গভীরে, অবিরাম।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]