সুইডেনের জাতীয় প্রতীক দলাহেস্ত

সুইডিশ ভাষায় হেস্ত শব্দের অর্থ ঘোড়া।

মানুষের সঙ্গে যে প্রাণীর সুগভীর সম্পর্ক, সেটি বুদ্ধিমান ঘোড়া। মহাবীর তৈমুর লং, চেঙ্গিস খান, আলেকজান্ডার, খালেদ বিন ওয়ালিদ, মোগল সম্রাট বারব, আকবর, হুমায়ুন, এমনকি শের শাহ—সবাই দিগ্বিজয় করেছেন ঘোড়ার পিঠে বসেই, ঘোড়ার সাহায্য নিয়েই। এমনকি রবার্ট ক্লাইভও ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা তথা সমগ্র ভারত করতলগত করেছিলন। ঘোড়া বীরবিক্রমে প্রভুকে পিঠে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মোকাবিলা করেছে। পৌরাণিক যুগেও, মহাভারতীয় যুদ্ধে ঘোড়ার প্রধান্য প্রবল।

পৃথিবীর অনেক ঘোড়ার ভিড়ে দুটি ঘোড়া বিখ্যাত। একটির জন্ম উপকথার মাধ্যমে, অপরটি বাস্তবতার নিরিখে, ট্রয়ের ঘোড়া ও দলাহেস্ত বা দলার ঘোড়া। ট্রয়ের ঘোড়া এত বেশি আলোচিত যে দীর্ঘ ১০ বছর যুদ্ধের পর ওই কাঠের ঘোড়ার সাহায্যেই গ্রিকরা সম্পদশালী ট্রয় রাজ্য দখল করে নেয়। সে মর্মান্তিক ইতিহাস সবারই জানা। ট্রয়ের ঘোড়া ও দলার ঘোড়ার মধ্যে সমধিক সম্পর্ক বিদ্যমান।

ট্রয়ের ঘোড়া কাঠের, দলার ঘোড়াও কাঠের। দুটোই কাঠের তৈরি। ট্রয়ের ঘোড়ার পেটে গ্রিকরা লুকিয়ে ট্রয় জয় করেছিল, আর দলার ঘোড়া স্বমহিমায় বিশ্ব জয় করে চলেছে। ট্রয়ের ঘোড়া ১ হাজার বছরের বেশি পুরোনো, আর দলার ঘোড়া ১৭ শ শতকের, খুব বেশি হলে ৩ শ বছরের পুরোনো। ১৬২৪ সালের কথা, সে সময় সুইডেনে ডাইনি আখ্যা দিয়ে নারীদের জ্বলন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। স্টকহোমের উপকণ্ঠে ভেস্তারোস শহরের জনৈক খ্রিষ্টান ধর্মযাজক কাঠের ঘোড়াকে অপয়া বলে আখ্যা দেন, কারণ ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে ডাইনিরা শয়তানের ভোজে যেত।

হয়তো কাঠের ঘোড়াকে অপয়া আখ্যা থেকে মুক্ত করার মানসে নিলস ও আন্দ্রেস ওলসন নামের দুই ভাই দলারনা নামক স্থানে কাঠের ঘোড়া তৈরির কারখানা খুলে বসেন। কালক্রমে দলারনার নামানুসারে নিলসদের তৈরি কাঠের ঘোড়া দলাহেস্ত বা দলার ঘোড়া নামে ছড়িয়ে পড়ে। নিলস পরিবারের লোকজ শিল্প সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং নিউইয়র্কে ১৯৩৯ সালের বিশ্বমেলায় সুইডিশ প্যাভিলিয়নের সম্মুখে বিভিন্ন রঙে খচিত কাঠের বিশাল দলার ঘোড়া স্থাপন করা হয়। এর ফলে দলার ঘোড়ার প্রচার ও চাহিদা এতই বেড়ে যায় যে পরের বছর বিশ্বমেলায় ২০ হাজার দলার ঘোড়া পাঠাতে হয়।

এর পর থেকে দলার ঘোড়া ছুটতেই থাকে, তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে সুইডেন বিশ্বের তামা ও লোহা রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ১৫ শ শতক থেকেই বনের কাঠ, খনিজ কাজে পরিবহন ও যানবাহনে ঘোড়ার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়।

দলারনার ছোট একটি গ্রাম নুসন্যাস—

এই গ্রামেরই এক দরিদ্র কৃষকের ছেলে, ৯ ভাই-বোনের বড় ভাই গ্রানাস এন্ডারসন ওলসন দারিদ্র্যের চাপে সংসারের ভার নিজের কাধে তুলে নেন। জীবিকার তাড়নায় মাত্র ২৭ বছর বয়েসে পৈতৃক খামারের বেকারিতে স্থাপন করেন কাঠের ঘোড়া তৈরির কারখানা। ৯ ও ৭ বছরের ছোট দুই ভাই নিলস ও ইয়ানেস বড় ভাইয়ের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। সম্মিলিত শ্রমে ও সাধনায় তৈরি হয় কাঠের ঘোড়া, দলাহেস্ত। কারখানা স্থাপনের বছর ১৯২২ সালে তৈরি হয় ২০ হাজার ঘোড়া, বর্তমানে বছরে তৈরি হচ্ছে ১ লাখ ঘোড়া।

জাতীয় প্রতীক—

পৃথিবীর প্রতিটি দেশের নিজস্ব জাতীয় প্রতীক রয়েছে। যদি গুগলে সুইডিশ জাতীয় প্রতীকের সন্ধান করা হয়, তাহলে সুইডিশ পতাকা, বিশালাকার সম্বর বা এলি, প্রিয় খাবার কানেলবুল্লারের পাশাপাশি দলাঘোড়ার চিত্রও ফুটে উঠবে। এগুলো সুইডেনের জাতীয় প্রতীক।

সূচনাপর্বে ধীরে ধীরে দলার ঘোড়ার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত কাঠের ঘোড়া তৈরিতে বিশেষভাবে তৈরি হাতে টানা কাঠের ব্যান্ডিস ব্যাবহার করা হতো। একজন করাত চালাতেন অপরজন বাছাই করা কাঠের খণ্ড থেকে দ্রুত ঘোড়ার কাঠামো তৈরি করে ফেলতেন। ঘোড়া তৈরির প্রারম্ভে বিশেষ ধরনের কাঠ বাছাই করা হতো। বনসম্পদে উন্নত সুইডেনের বনভূমিতে গাছ বা কাঠের অভাব নেই। বিভিন্ন ধরনের কাঠ থেকে দলার ঘোড়ার জন্য বিশেষ কাঠটি বেছে নেওয়া হতো। দীর্ঘ ৯০ বছর একই পদ্ধতিতে ঘোড়া তৈরি হতো। এরপর ১৭ শ শতকে ফালুন প্রদেশে তামার খনিতে খুঁজে পাওয়া লাল রং ব্যবহার করে ঘোড়াগুলোকে রাঙানো হতো। সেই থেকে লালরঙা দলার ঘোড়ার ঐতিহ্য শুরু হয়।

ঘোড়াগুলো লাল রঙে পেইন্ট করার জন্য ব্যবহার করা হতো বনের কাঠবিড়ালির লেজ। সময়ের বিবর্তনে বর্তমানে হাতে টানা কাঠের ব্যান্ডিসের পরিবর্তে ব্যবহার হয় বৈদ্যুতিক করাত, আর বনের কাঠবিড়ালির লেজের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় মোলায়েম পেনসিল তুলি।

ঘোড়াগুলো একটি থেকে অন্যটি আলাদা—

মাঝেমধ্যে দর্শনকারী বা ভ্রমণকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আহ্বান করে বলা হয়, যদি কেউ দুটি অভিন্ন ঘোড়া খুঁজে পান, তাহলে দুটি ঘোড়াই বিনা মূল্যে উপহারস্বরূপ দেওয়া হবে। কিন্তু আজ অবধি এমন ঘটনা ঘটেনি। এভাবেই যত্ন নেওয়া হয় ঐতিহ্যের।

এক নির্জন বনের কুঁড়েতে শীতের সন্ধ্যায় আগুনের সামনে শিশুর খেলনা ছুরির কাঠ খোদাইয়ে দলার ঘোড়ার জন্ম। আজ দলারনা প্রদেশ ও জাতীয় প্রতীক দলাহেস্ত।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]