বর্ষার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে এক গ্রীষ্মের আগমন

বাংলাদেশ ও ভারতের পতাকা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ১ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বাংলাদেশে নতুন নির্বাচনের পর এটি ছিল তাঁর প্রথম সফর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বাংলাদেশ–ভারত প্রেক্ষাপটে সম্পর্কের পুনর্গঠন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ কেবল বাস্তবসম্মতই নয়, বরং এটি সমন্বিতভাবে ফলপ্রসূও। আগস্টের ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাণিজ্য, কনস্যুলার পরিষেবা এবং যোগাযোগে এক গভীর স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত যখন চরমে এবং সমগ্র অঞ্চল তীব্র জ্বালানি ও জরুরি সরবরাহসংকটে জর্জরিত ছিল, তখন ভারত ঢাকাকে শুধু ডিজেলই নয়, সারও সরবরাহ করেছিল। বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভারত সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে যুগান্তকারী টিকাটি প্রদান করে। অতীতেও পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততার এমন আরও অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে এবং বর্তমান সরকার ভবিষ্যতে এগুলোর ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী।

জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা জোরদার করার ক্ষেত্রে জনগণের পারস্পরিক সংযোগ একটি মৌলিক বিষয় হবে। চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা ইতিমধ্যে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, পর্যটন ও অন্যান্য বিভাগও একই পথে হাঁটবে। বাণিজ্য ও বন্দর সংযোগ আবার চালু করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কারণ, এগুলো বাংলাদেশকে রপ্তানির গন্তব্যস্থলে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার প্রদান করে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ রয়েছে। কারণ, একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির পরও সে অঞ্চলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জিডিপির একটি প্রধান মেরুদণ্ড এবং এতে যেকোনো পরিবর্তন দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশকে তার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বৈচিত্র্যময় করার এবং অন্যান্য রাজস্ব উপার্জনের উপায় খুঁজতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই অপ্রত্যাশিত বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ধাক্কা থেকে বাংলাদেশ নিজেকে রক্ষা করতে পারে। ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থলবেষ্টিত সাতটি রাজ্য, যা ‘সেভেন সিস্টার’ নামে পরিচিত, সেগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করার জন্য একাধিক বহুমুখী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেই সংযোগ স্থাপনে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এবং বিনিময়ে একটি উল্লেখযোগ্য রাজস্বভিত্তিক লাভজনক বাণিজ্যিক মডেল অর্জন করতে পারে।

প্রতিবেশী অঞ্চলের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসন করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ, অতীতে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী দল এবং অন্যান্য সন্ত্রাস-সম্পর্কিত কার্যকলাপ ভারতে সংঘটিত হয়েছে। এই সহস্রাব্দের শুরু থেকে এই ধরনের কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা বাংলাদেশ সরকারের সক্রিয় সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে শুধু সন্ত্রাস-সম্পর্কিত কার্যকলাপ শনাক্ত করার জন্যই নয়, বরং সক্রিয়ভাবে সেসব উপাদানকে নিষ্ক্রিয় করার জন্যও কৃতিত্ব দিতে হবে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

শুধু ভারতের স্বার্থেই যে বাংলাদেশের এমন নীতি অনুসরণ করা উচিত তা নয়, কারণ বাংলাদেশ নিজেও সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে। ঢাকার একটি জনপ্রিয় ক্যাফেতে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল, সেই ‘হলি আর্টিজান বেকারি’ হামলা সমাজে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারকে অবশ্যই নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিষয়গুলোর সমাধান করতে হবে। বর্তমান নেতৃত্বের উচিত বহুত্ববাদের পাশে দাঁড়ানো এবং এটা নিশ্চিত করা যে উগ্রপন্থী শক্তিগুলো যেন বাংলাদেশে আবার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে না পারে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই, প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তান ও স্থানীয় সহযোগীদের মতো অপরাধীদের বিরুদ্ধে ৯ মাসব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ভারত সর্বদা বাঙালি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে, যখনই বন্ধুত্ব ও লক্ষ্যবস্তু করে চালানো নিপীড়নের বিরুদ্ধে সুরক্ষার প্রশ্ন এসেছে। এই সম্পর্ককে শুধু একক নেতাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সম্মিলিত গঠনের এক বহুবর্ণী চিত্র হিসেবে দেখা উচিত।

*লেখক: প্রিয়জিৎ দেব সরকার, লন্ডন