মরিওকার রাতের আকাশে হানাবির আলো—জাপানের এক বর্ণিল উৎসব
‘জাপান’ নামটি শুনলেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে শান্ত, সুশৃঙ্খল আর অপার সৌন্দর্যে ভরা এক দেশের ছবি। শুধু শান্তির জন্যই নয়, প্রাচীন ঐতিহ্য, মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণেও জাপান সারা বিশ্বের মানুষের কাছে এক অনন্য আকর্ষণের নাম। ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাপানের প্রকৃতিও যেন নতুন নতুন রূপে নিজেকে সাজিয়ে তোলে। আর গ্রীষ্মের সেই রূপকে আরও মোহময় করে তোলে হানাবি—আতশবাজির উৎসব।
জাপানিজ ভাষায় ‘হানাবি’ শব্দের অর্থ ‘আগুনের ফুল’। নামটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এর সৌন্দর্যের রহস্য। সন্ধ্যার নীলচে অন্ধকার যখন ধীরে ধীরে আকাশকে ঘিরে ফেলে, ঠিক তখনই অসংখ্য রঙিন আতশবাজি একের পর এক আকাশের বুকে ফুটে ওঠে। মনে হয় রাতের কালো ক্যানভাসে কেউ যেন মুহূর্তের জন্য আগুনের ফুল এঁকে দিচ্ছে। লাল, নীল, সোনালি, সবুজ—হাজার রঙের সেই আলো কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো আকাশকে স্বপ্নের রাজ্যে পরিণত করে। তারপর আবার সব নিভে যায়। থেকে যায় শুধু বিস্ময়, মুগ্ধতা আর চোখের কোণে জমে থাকা এক অদ্ভুত ভালো লাগা।
জাপানের প্রায় প্রতিটি শহরেই গ্রীষ্মকালে আলাদাভাবে হানাবি উৎসবের আয়োজন হয়ে থাকে। সাধারণত ছোট শহরগুলোতে প্রায় ৩০ মিনিট এবং বড় শহরগুলোতে ১ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে আতশবাজি প্রদর্শিত হয়। দিনের আলো যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে, তখন থেকেই ঊৎসবস্থলের দিকে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। পরিবার, বন্ধু, শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষ—সবাই যেন একই আনন্দের অপেক্ষায় সেখানে জড়ো হয়।
বেশির ভাগ সময় কোনো নদীর তীরকেই উৎসবের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। নদীর শান্ত জলে যখন আতশবাজির রঙিন প্রতিচ্ছবি কেঁপে কেঁপে ওঠে, তখন মনে হয় আকাশের তারাগুলো যেন পানির বুকেও নেমে এসেছে। সেই দৃশ্য শুধু চোখে দেখা যায় না, কোনো এক অদৃশ্য অনুভূতিতে হৃদয় দিয়েও অনুভব করতে হয়।
জাপানিরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ইউকাতা পরে হানাবি উৎসবে অংশ নেন। নারীদের রঙিন ইউকাতা, পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, চারপাশের হাসি-আনন্দ আর উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে একটি সাধারণ গ্রীষ্মের সন্ধ্যাই যেন অসাধারণ এক স্মৃতিতে পরিণত হয়।
এই বছর ইওয়াতে প্রিফেকচারের রাজধানী মরিওকা শহরে আগস্টের ১১ তারিখে হানাবি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। কিতাকামি গাওয়া নদীর তীরে আয়োজিত এই উৎসবে মরিওকা ও আশপাশের বিভিন্ন শহর থেকে মানুষের ঢল নেমেছিল। উৎসব উপলক্ষে প্রাঙ্গণের চারপাশে বসেছিল নানা ধরনের খাবারের স্টল। তাকোয়াকি, ইয়াকিসোবা, কারা-আগে, কাকিগোরির মতো জনপ্রিয় জাপানি খাবার উপভোগ করতে করতে মানুষ অপেক্ষা করছিলেন রাতের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটির জন্য।
তারপর হঠাৎ আকাশে ফুটে উঠল প্রথম আতশবাজি। একমুহূর্তে চারপাশের মানুষের চোখ ওপরে উঠে গেল। তারপর একের পর এক বিস্ফোরিত হতে লাগল রঙিন আলোর ফুল। মানুষের মুখে বিস্ময়ের হাসি, শিশুদের উচ্ছ্বাস, প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দ—সবকিছু মিলিয়ে উৎসবের পরিবেশ যেন এক জীবন্ত মেলায় পরিণত হলো। নদীর কালো জলে প্রতিফলিত সেই আলো আর আকাশের অসংখ্য রং একসঙ্গে মিশে এমন এক দৃশ্য তৈরি করল, যা হয়তো ক্যামেরায় ধারণ করা যায়, কিন্তু তার পুরো অনুভূতিটুকু কোনো ছবিতে বন্দী করা সম্ভব নয়।
তবে হানাবির সৌন্দর্যের সবচেয়ে গভীর দিকটি হয়তো এর ক্ষণস্থায়িত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। একটি ক্ষুদ্র আগুনের গোলা তীব্র বেগে ওপরের দিকে উঠে যায়। তারপর হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য আকাশকে আলোয় ভরিয়ে দেয়। মনে হয়, এই তো সৌন্দর্য, এই তো জীবন। এত সুন্দর, অথচ এত ক্ষণস্থায়ী। কিছুক্ষণ পর সেই আলো মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। কিন্তু মিলিয়ে যাওয়ার পরও তার স্মৃতিটুকু থেকে যায় মানুষের মনে।
জাপানি সংস্কৃতিতে এই অনুভূতির সঙ্গে একটি গভীর জীবনদর্শন জড়িয়ে আছে—সুন্দর জিনিস চিরস্থায়ী নয়, আর ঠিক সেই কারণেই তার সৌন্দর্য আরও মূল্যবান। ফুল ঝরে যায়, ঋতু বদলে যায়, সূর্য ডুবে যায়, মানুষ একদিন দুরে চলে যায়—তবু সেই ক্ষণিকের সৌন্দর্য আমাদের হৃদয়ে গভীর কোনো চিহ্ন রেখে যায়।
হানাবি তাই শুধু একটি আতশবাজির উৎসব নয়। এটি যেন জীবনকে নতুন করে অনুভব করার একটি উপলক্ষ। কয়েক মুহূর্তের আলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখতে হয়, কারণ তারা ফিরে আসে না। হয়তো এ কারণেই হাজার হাজার মানুষ প্রতিবছর নদীর তীরে দাঁড়িয়ে একই আকাশের দিকে তাকায়, একই আতশবাজি দেখে, তবু প্রতিবার অনুভূতিটা নতুন হয়ে আসে।
অন্ধকার আকাশে হানাবির সেই আগুনের ফুলগুলো কয়েক মুহূর্তের জন্য ফুটে ওঠে তারপর নিভে যায়। কিন্তু তাদের আলো যেন মানুষের হৃদয়ে আরও কিছুক্ষণ থেকে যায়। হানাবি তাই কেবল আকাশে ফুটে ওঠা আলোর উৎসব নয়, এটি ক্ষণস্থায়ী জীবনের সৌন্দর্যের এক অসাধারণ প্রতীকও।
লেখক: সঞ্জয় সরকার, অধ্যাপক, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে প্রাণী গবেষণা সেন্টার, ইওয়াতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানে কর্মরত।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]