আমার দেখা সাধারণে অসাধারণ মানুষের মধ্যে একজন আমার বাবা। সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবন যাপন করা সৎ ও কর্মনিষ্ঠ মানুষটি আমার জীবনের আদর্শ। বর্তমান পৃথিবীতে যখন এত কষ্ট, রোগ ও শোক, তখনো বাবা আমার এগিয়ে যাওয়ায় অব্যক্ত শক্তি।

বাবা আমার কাছে বিশেষ এক আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও গর্ব। সেই গৌরব হারানোর বেদনা পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়েই প্রশমিত হওয়ার নয়। এ এক অবর্ণনীয় শূন্যতা, যা কেবল মিশে আছে হৃদয়ের রক্তক্ষরণে। বাবা সশরীর বেঁচে নেই, তবু আছেন আমাদের মাঝে প্রতি মুহূর্তে। আমাদের ভালোর জন্য বাবা জীবনের প্রায় সবকিছুই নির্দ্বিধায় ত্যাগ করেছেন। কখনো নিজেকে ভালো রাখার চিন্তাও করেননি। বাবার চোখেই আমরা দেখেছি এই পৃথিবীর রূপ, রং ও আলোর দর্শন। বাবা শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন।

বাবাই আমাদের শিখিয়েছেন, কীভাবে মাথা উঁচু করে পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়। ২০২১ সালের মে মাসের শুরুতেই কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমার বাবা মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তখন পুরো স্পেনে করোনা মহামারি। হোম কোয়ারেন্টিনে থেকে প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা বলাই ছিল আমার একমাত্র ভরসা। যখন ভিডিও কলে বাবার সঙ্গে কথা হতো, তখন বাবা একটি কথাই বলতেন, ‘বাবা তুমি দেশে আসো, আমি তোমাকে দেখব।’ আমিও বাবাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলাম।

যখন ক্যানসারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বাবার শরীরের কিছু অংশ অবশ হয়ে গেল, তখন তিনি হাঁটতে ভুলে গেলেন। বাবাকে তখন আমার ভাইবোনেরা মিলে আবার হাঁটতে শেখাতে লাগল শিশুর মতো, ঠিক যেমন বাবা আমাদের শিখিয়েছিলেন। আসলে এর পর থেকেই বাবা হয়ে গেলেন আমাদের সন্তানের মতো। বাবাকে মুখে তুলে খাওয়নো এবং গোসল করিয়ে দিত আমার ভাইবোনেরা। আমি প্রতিনিয়ত এসব দৃশ্য দেখতাম ভিডিও কলে। আমারও ইচ্ছা করত—বাবাকে মুখে তুলে খাওয়াব, গোসল করিয়ে দেব, হাঁটাব এবং বাবাকে আলিঙ্গন করে বাবার গায়ের ঘ্রাণ নিজের শরীরে মেখে নেব। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আমার ভাগ্যে তা জোটেনি। তখন প্রচণ্ড উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কেটেছিল প্রতিটা সেকেন্ড-মিনিট। বাবার কী হবে? বাবা সুস্থ হয়ে উঠবেন তো? বেঁচে থাকলে সুস্থ হবেন তো আগের মতো? করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে দেশে যাব এবং বাবাকে সুস্থ করে তুলব। আমি তখনো আশাবাদী। কারণ, আল্লাহ সব পারেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। ২০২১ সালে ২৯ মে বাবা না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। এক বছর হলো বাবার আদর এবং শাসন কোনোটিই পাইনি। এই অভাব বোধ আমার জীবনে রয়েই যাবে।

বাবার মৃত্যুর এই এক বছরে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। আমিও দেশে গিয়ে বাবার কবর জিয়ারত করে এলাম গত এপ্রিলে। বাবা যদি জানতেন তাঁর ছেলে দেশে আসছে তিনি কতই না খুশি হতেন! হয়তো খুশিতে আমাকে একবার জড়িয়ে ধরতে চাইতেন! যদিও এটা আর কখনো সম্ভব হবে না।

তবু মনে অনাবিল আনন্দ আর গর্ব নিয়ে বেঁচে থাকি এমন বাবার সন্তান হতে পেরে। বাবা মানুষকে ভালোবাসতেন, কাছে ডাকতেন পরম স্নেহ-মমতা নিয়ে। বাবা আজীবন শুধু মানুষের উপকার করতে চাইতেন। সেসব মানুষের অবারিত ভালোবাসায় বাবাকে সিক্ত হতে দেখেছি। অনেক দিন হলো কেউ ডাকে না আমায় প্রিয় নাম ধরে, কেউ বলে না, ‘বাবা তুমি কবে আসবে দেশে?’ পরম স্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার কেউ নেই আজ। তবু আমার বাবার মতো এমন অসংখ্য বাবা বেঁচে আছেন তাঁদের সন্তানদের কর্মে-ভাবনায়-অনুপ্রেরণায়।

জানি, বাবা দূর আকাশের নক্ষত্র হয়ে আমাদের দেখে প্রাণভোলানো সেই হাসি দেবেন। যে হাসি আরও একটিবার দেখার জন্য আকুল হয়ে আমাদের প্রাণ কাঁদে। এখনো ঘুমের মধ্যে বাবাকে স্বপ্নে দেখি। আশপাশের সবকিছুতেই যেন বাবার অস্তিত্ব খুঁজে পাই। মনে হয়, বাবা আমার সঙ্গেই আছেন।

আমাদের বাবাসহ এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া প্রত্যেক বাবাকে যেন মহান আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসী করেন। ‘হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাদের প্রতিপালন করেছিলেন।’ আমিন।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন