স্বচ্ছ বলতে আমরা প্রথমেই যা বুঝি তা হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বলতে কী বোঝায়? এর উত্তরে খুব সরল করে বলা যায়, নিজের এবং নিজের আশপাশ আবর্জনামুক্ত করে রাখার নামই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। আর ওই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশই স্বচ্ছ পরিবেশ। মানুষের অন্য সব গুণের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও একটি বিশেষ গুণ। ওই গুণকে ভিত্তি করেই মানুষ এক সময় পশু সমাজ থেকে সরে এসেছিল।

মানুষ তার মনুষ্যত্ব চেতনার প্রথম জাগরণ ঘটিয়েছিল স্বচ্ছ ভাবনা দিয়ে। সেই আদিমকাল থেকেই মানুষ বুঝতে শিখেছিল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তার জীবনধারার প্রধান শর্ত হতে হবে। আরও জেনেছিল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থাকা এবং রাখা তার যেমন অধিকার, ঠিক তেমনই এটি তার অন্যতম প্রধান কর্তব্যও বটে। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা স্বচ্ছতা মনুষ্য জীবনের একটি উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সাধারণভাবে ‘স্বচ্ছ’ একটি ছোট এবং অতি সরল শব্দ। কিন্তু শব্দটির ব্যবহারিক রূপ যে কত অসাধারণ সৌন্দর্যে ভরা, তার গভীরে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়। আমরা যখন স্বচ্ছ মানুষ, স্বচ্ছ আকাশ, স্বচ্ছ বাতাস, স্বচ্ছ নদী-নালা-পথ-প্রান্তর ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করি, তখন যতটুকু শ্রুতিমধুর অনুভব করি তার চেয়ে তা অনেক গুণ বেশি দৃষ্টি মধুর হয়, যখন তার প্রকাশিত রূপ অবলোকন করি। তাই স্বচ্ছ শব্দকে অন্য লাখো-কোটি শব্দের মতো একটি শব্দ ভাবলে ভুল করা হবে। এর লৌকিক রূপ এবং কার্যক্ষমতার বিশালত্ব উপলব্ধি করে স্বচ্ছতার প্রতি আন্তরিকভাবে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।

স্বচ্ছতাকে আমরা দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি। এগুলো হলো—অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও বাহ্যিক স্বচ্ছতা। অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা বলতে আমরা বুঝি, একজন ব্যক্তির মনের ভেতরের স্বচ্ছতা অর্থাৎ মানসিক স্বচ্ছতা বা চারিত্রিক স্বচ্ছতা যা খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু বাতাসের মতো তার উপস্থিতি অনুভব করা যায়। তাই ওই অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তির চারিত্রিক ও মানসিক স্বচ্ছতার প্রকাশ ঘটে। সুতরাং বলা যায়, মন এবং আত্মার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় যে স্বচ্ছতা, তাই অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা। অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা যদিও ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা, কিন্তু তার প্রভাব ঠিক যেন বিন্দু বিন্দু ফোঁটায় ফোঁটায় প্রবল বৃষ্টিধারা।

অন্যদিকে, বাহ্যিক স্বচ্ছতা বলতে আমরা বুঝি, যে স্বচ্ছতা প্রতিনিয়ত চোখের সামনেই প্রকাশিত হয় অর্থাৎ যে স্বচ্ছতাকে আমরা দেখতে পাই। আজকাল দেশজুড়ে যে স্লোগান খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, সেটি হচ্ছে স্বচ্ছ বাংলাদেশ অভিযান। ওই স্লোগানের মানে বিশদভাবে ব্যাখ্যার খুব একটা প্রয়োজন নেই। আমরা সবাই এর কারণ অবগত আছি। ওই স্লোগান থেকে একটি সত্য ধ্বনিত হচ্ছে, বর্তমান বাংলাদেশে স্বচ্ছতার মান এতই হ্রাস পেয়েছে যে, স্বচ্ছ অভিযানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বচ্ছ রাখার সংকল্প নিতে হচ্ছে। এ কথা সত্য, সম্পূর্ণ আবর্জনামুক্ত দেশ ভূ-বিশ্বে পাওয়া কঠিন। কিন্তু স্লোগানের মাধ্যমে যখন কোনো দেশকে আবর্জনামুক্ত করার ডাক দিতে হয়, তখন বুঝতে হবে ওই দেশটিতে আবর্জনার পাহাড় জমে আছে। বিশ্ব মনুষ্য সমাজে এ এক অতি নিন্দনীয় ব্যাপার।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বিশ্বনন্দিত। বিশ্বের দরবারে এ দেশবাসীর মানসিক-চারিত্রিক বাহ্যিক স্বচ্ছতা ছিল দৃষ্টান্তস্বরূপ। অথচ আজ বাংলাদেশের স্বচ্ছতায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। দুঃখের বিষয়, স্বচ্ছতার এই দৈন্য আমাদের জীবনধারায় মিশে গেছে। এই অস্বচ্ছতার মূল কারণ যদি খোঁজা হয়, তবে দেখা যাবে, কুসংস্কার, অশিক্ষা, অজ্ঞতা, মানসিক-চারিত্রিক কলুষ ইত্যাদি সর্বাগ্রে দায়ী। বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষার হার ঊর্ধ্বমুখী। ওই দিন আর বেশি দূর নয়, যেদিন বাংলাদেশ শতভাগ শিক্ষিত দেশের তালিকায় নাম লেখাবে। অবশ্যই ওই দিনটি প্রতিটি বাংলাদেশবাসীর জন্য গর্বের বিষয় হবে। তাই ওই দিনটির জন্য আমরা বাংলাদেশবাসী হিসেবে সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করব।

তারপরও মনে সংশয় জাগে, আমরা আজ কতটুকু শিক্ষিত, বর্তমানে শিক্ষার পাঠ আমরা যতটুকু আয়ত্ত করেছি, জানি না তাতে আমরা কতটুকু নিজেদের শিক্ষিত করেছি। চারদিকে অহরহ শিক্ষার যে চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে, তাতে সন্দেহের অবকাশ অবশ্যই থেকে যায়। আর এ নিয়ে বাংলাদেশবাসী হিসেবে সবাইকে ভাবতে হবে এবং ভাবা উচিত।