সূর্য না ডোবার দেশে গ্রীষ্মকাল

ইউরোপের প্রায় সবখানেই গ্রীষ্ম ঋতু অনেক সুন্দর ও বৈচিত্র্যময়। প্রকৃতিতে আসে নানা পরিবর্তন। রং বেরঙের ফুল আর ফসলে প্রকৃতি ভরে যায়। ফুলের গন্ধ ও দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের মাঠের সমারোহ খুব সহজেই যে কাউকে মুগ্ধ করবে। চারদিকে তাকালে মনে হয় সবুজের আঁচল পাতা। কখনো সমতল ভূমিতে আবার কখনো বা উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট বাড়িঘরগুলো দেখতে শিল্পীর রংতুলিতে আঁকা ছবির মতো। সাগরের দৃশ্যও অনেক মনোরম। উপত্যকার ওপর দাঁড়িয়ে দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া নীল সাগরের সঙ্গে নীল আকাশের মিলনের দৃশ্যও অভূতপূর্ব। গ্রীষ্ম আসলে প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষের মধ্যেও এক ধরনের চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়।
সুইডেন চার ঋতুর দেশ। গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত ও বসন্ত। গ্রীষ্মকালের ব্যাপ্তি জুন থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত। বাকি সব মাসগুলোতে হালকা থেকে তীব্র শীত থাকে। সুইডিশদের কাছে গ্রীষ্মকাল আসে আশীর্বাদ হয়ে। স্কুল কলেজসহ প্রায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সারা গ্রীষ্ম জুড়েই ছুটি থাকে। ছাত্ররা এই ছুটিতে কি করবে, কোথায় বেড়াতে যাবে এসব নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকে। এই সময়টাতেই কৃষকেরা ফসলে জমি চাষ করেন। অনেকে বাড়ির পাশে বাগান করে পছন্দের সবজি, ফুল-ফল ইত্যাদি চাষ করেন। আরেকটি সুবিধা হলো এখানকার গ্রীষ্মকালে আমাদের দেশের মতো তীব্র গরম থাকে না। প্রায় সব সময়ই মৃদু ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ থাকে। গ্রীষ্মকালের একটি প্রধান উৎসব হলো মিড-সামার ফেস্টিভ্যাল, যেটা জুন মাসের মাঝামাঝিতে অনুষ্ঠিত হয়। মিড-সামার স্থানীয়দের অনেক জনপ্রিয় একটি উৎসব ও এই সময়টাতে তরুণীরা মাথায় ফুলের খোঁপা বেঁধে নেচে গেয়ে অনেক ফুর্তি করে, কিছুটা আমাদের দেশের পয়লা বৈশাখের মতো। এই উৎসবকে সামনে রেখে সুইডিশরা ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশনসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে। গ্রীষ্ম উপলক্ষে মেলার আয়োজনও করা হয়। পার্কে অথবা খোলা জায়গায় বিভিন্ন দেশীয় পণ্য ও খাবারের সমাহার নিয়ে গড়ে উঠে অনেক স্টল। সুইডেনের সর্ববৃহৎ মেলা আমাদের মালমো শহরেই হয়, যেটা মালমো ফেস্টিভ্যাল নামে পরিচিত। মালমো ফেস্টিভ্যাল আগস্টের শেষ দিকে শুরু হয়। প্রতি বারই মেলায় প্রায় দেড় মিলিয়নেরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটে। পৃথিবীর অনেক দেশ থেকেই এখানে পর্যটকেরা বেড়াতে আসেন। সাত দিনব্যাপী এই মেলার মূল আকর্ষণ নানা দেশীয় খাবার হলেও খাবারের পাশাপাশি অনেক ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থাও আছে।

এখানে অবসর সময়গুলোকে অর্থবহ করার জন্য অনেকে অনেক ধরনের পদক্ষেপ নেন। এর মধ্যে সমুদ্র সৈকতে স্নান করা ও বড়শি পেতে মাছ ধরা, এই দুটি সবার মাঝে সহজেই লক্ষ করা যায়। পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে থাকে সাগর পাড়ে মানুষের আনাগোনা। সাগর তীরে গোসলের জায়গা অনেক নিরাপদ। কেবলমাত্র সাঁতার কাটার জন্য নির্দিষ্ট করা পয়েন্টগুলোই সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
উত্তর মেরুর দেশগুলোতে বসবাস করলে সবারই একটা মজার দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হবে, সেটা হলো মধ্যরাতের সূর্য! শুনলে অনেকে চমকে যাবেন, কিন্তু এখানে সত্যিই মাঝরাতে সূর্য থাকে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গ্রীষ্মকালে সুইডেনের উত্তরভাগের বাসিন্দারা ২৪ ঘণ্টাই দিনের আলো দেখতে পান আর দক্ষিণাঞ্চলে মাত্র ২-৩ ঘণ্টার জন্য সূর্য অস্ত যায়।
এর পরপরই ভোরের আলো ফুটে ওঠে | এভাবে একসময় ঋতুর পালাবদল হয়। গ্রীষ্ম বিদায় নেয় ও আস্তে আস্তে মলিন হতে থাকে প্রকৃতি | সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও আসে পরিবর্তন। পরিবর্তিত প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই আমাদের বেঁচে থাকা।
(লেখক শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং)