সাজ্জাদ বিপ্লবের একগুচ্ছ কবিতা

জলসা ঘর

আমি যা দেখতে চাই না
তাও কেমন দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে!

ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকছে,
নিবেদন করছে, আমায় প্রলুব্ধ করছে, আকৃষ্ট করছে, জড়িয়ে ধরছে
হাতছানি দিচ্ছে কিছু একটা করার, কোথাও যাওয়ার
কোথায় যেতে পারি, আমি? তোমাকে ছাড়া?
সুন্দরী এই পৃথিবী, গ্রহ-নক্ষত্র, ফুল-ফল,
সবুজ অরণ্যানী, হলুদ আগুন আমায়
যেতে দেয় না কোথাও

আমি যেখানেই যাই বা যেতে চাই
দেখো, বারবার ফিরে আসি মাটির কাছে,
তোমার কাছে, আমার স্বপ্নের কাছে, জীবনের কাছে

তুমি কি আমার জলসা ঘর?

পূর্বপুরুষ

অতি বৃষ্টি ও অতি খরার কথা
বলতেন আমাদের পূর্ব পুরুষদের কেউ-কেউ
সাবধান করে দিতেন সমূহ ক্ষতি থেকে
অতি জ্ঞান ও অতি অজ্ঞানতা, অতি ক্ষতির কথা
বলতেন কি, কেউ?

সিক কল
আমি বসে আছি, তোমার আশায়
তোমার জন্য, তোমার ভরসায়

প্রেম ও প্রকৃতিও থমকে আছে। স্তব্ধ হয়ে আছে গাছ। শোকের ভাষা শোনা যাচ্ছে পাখিদের কণ্ঠে। সঙ্গম ভুলে গেছে কাঠবিড়ালি। অথচ, তুমি জানো। তুমি, মানেই আমি। আমরা। এক থেকে একাধিক। লক্ষাধিক। অসংখ্য।
সৃষ্টির আদি কথাও তুমি ও আমি।
আমাদের আগে ছিল সুনসান নীরবতা। নিস্তব্ধতা। নিষ্প্রাণ, বর্ণহীন সবকিছু। সব।
আমরা মানে কলকাকলিতে মুখরিত সবুজ এ গ্রহ, এ নক্ষত্র, সজীব। সপ্রাণ। সবকিছুই অর্থবহ। সচল ও সঠিক।
তুমি না এলে, আমিও নিষ্প্রভ। নিষ্প্রাণ।
মিথ্যে করে তুমি, সিক কল দিও না, প্লিজ!

সুন্দর বন ও আমরা
সুন্দরবন থাকুক আর না থাকুক
আমরা আছি, আমরা থাকছি, আমরা থাকব
আমাদের ভালোবাসা থাকবে, সন্তানসন্ততি থাকবে, আমাদের দেশ থাকবে
কোনো হিংসুক বা কুচক্রান্তকারী, দেশ বিক্রেতা আমাদের পথ আগলে রাখতে পারবে না
আমাদের স্বাধীনতা বেঁচতে পারবে না, আমাদের কিনতে পারবে না
আমরা স্ফিংক্স এর মতো জন্ম নিবো বার-বার
আমরা দাঁড়িয়ে যাবো খাড়া আলিফের মতো সোজা হয়ে, শীর উঁচু করে
আমরা ভেদ করব শয়তানের তীব্র ফুঁৎকার
আমাদের বিশ্বাস ও কমিটমেন্ট, আকাশ ছোঁয়া...


গভীর মায়াজালে
এই যে, এখন আমি যেমন বেঁধে আছি
হারপুণবিদ্ধ মাছের মতো তড়পাচ্ছি
যন্ত্রণাকাতর হয়ে ঝুলে আছি, শূন্যে

না পারছি তোমাকে ছেড়ে যেতে, না তোমার মায়াকে
তোমার মায়াবী মুখমণ্ডল, নিষ্পাপ অপরূপ হাসি

(যা একদা আমাকে পাগল করে দিতো আর তোমাকেও করত, উচ্ছল ও উজ্জ্বল)
কিছুই ভুলতে পারছি না।
অথচ, তুমি দিব্যি ভুলে বসে আছো, আমায়
ভুলে গেছ আমার মান-মর্যাদা, আমার আত্মসম্মান,
আমার অবস্থান, আমার ভালোবাসা, আমার স্নেহ, আমার পৌরুষ, সবকিছু, সব
আমি তো তোমার সতিন বা প্রতিদ্বন্দ্বী নই!

সময়
সময় কত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে?
পূর্ব গোলার্ধে সূর্য উদিত হতে না হতেই অস্ত যাচ্ছে পশ্চিম গোলার্ধে
মাঝখানে সামান্য সময়
অথচ, কত ঘটনা
রটনাও কম কি!

তোমায়-আমায় নিয়ে রচিত হচ্ছে কত না রঙিন কাহিনি
ছড়িয়ে পড়ছে গুজব ও গজব
যেন, পৃথিবীর প্রতিটি পাপের জন্য আমরাই দায়ী
আমাদের কারণেই সংঘটিত হচ্ছে অমানবিক পারমাণবিক যুদ্ধ, সাইবার যুদ্ধ, স্নায়ু যুদ্ধ ও মল্ল যুদ্ধ
ঘর থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে নিষ্পাপ ছেলেরা, দেশ থেকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সুন্দর বন

পৃথিবীতে অভয়ারণ্য বলে আর কিছু থাকছে না
থাকছে না নিরাপদ দেশ ও বাসস্থান
ঘরে-ঘরে এমনকি বুকে-বুকে ঢুকে যাচ্ছে সন্দেহ ও অবিশ্বাস
ঘুমের ভেতরেও তাড়া করছে হিংসুটে দু: স্বপ্ন

তাহলে, আমরা কোথায় যাব? কার কাছে খুঁজব নিরাপদ আশ্রয় ও আশা?
আমাদের মন ও ভালোবাসা এখনো সতেজ ও নিষ্পাপ

আমাদের অন্তরে এখনো ঘুমিয়ে আছে
ভবিষ্যৎ শিশুর পিতা ও মাতারা
এসো, তাদের যাত্রাপথ শুভ, সহজ ও স্বচ্ছন্দ করি

অপেক্ষা
কারও জন্য কিছু পড়ে থাকে না
না তোমার জন্য আমি, না আমার জন্য তুমি
আমরা কেউ কারও জন্য, কারও অপেক্ষায়
বসে নেই
সময়ও বসে নেই, থাকে না, কারও জন্য
প্রেম বসে নেই, অপেক্ষা বসে নেই, উপেক্ষা বসে নেই, সন্তান বসে নেই, পিতা-মাতা কেউ বসে নেই, কারও প্রতীক্ষায়, আক্ষেপে
ডাক এলে, সবাই শুয়ে থাকে, সবুজ ঘাসের গালিচায়
দেখো, সময় বিলীন হচ্ছে কালের গর্ভে, আমাদের আমল ও কাজ-কর্ম পরিণত হচ্ছে ফলে-ফুলে, আমাদের চিন্তা পরিস্ফুটিত হচ্ছে স্বপ্নকল্পনায়-বাস্তবে
আমরা চলছি, আমাদের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়
লক্ষ্য ভেদে...

জীবন ও যৌবন
তোমাকে আগেই বলেছি
অসুস্থ হওয়ার পূর্বেই এসো, সুস্থতার জন্য শুকরিয়া আদায় করি
গুণ গাই জীবনের, যৌবনের
তিনি সুস্থতাকে আমাদের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ প্রেরণ করছেন
অসুস্থতা, তথা, রোগ-ব্যাধি-জরা, সন্দেহ, অবিশ্বাস ও রাগ আমাদের সম্পূর্ণরূপে অধিকার করবার পূর্বেই ঘুরে আসি সবুজ ও প্রাণবন্ত উপত্যকা থেকে
জীবন ও যৌবনের মানে কি? তা জানি।

উপভোগ করি এর সবটুকু। যতটুকু আমাদের জন্য নির্ধারিত সীমানায় বরাদ্দ, তার পুরোটুকুই ভরে উঠুক, রসে ও শিরায়। কানায়-কানায়।
আমরা এ দুনিয়া ও পরের দুনিয়া। দু’টোই চাই। পুরোটাই।