রোলেক্স: টাকা দিয়েও কেনা যায় না যে ঘড়ি

ভাবছেন টাকা থাকলে সব কেনা যায়, ঘড়ি কেনা যাবে না কেন? যত দামিই হোক, মন চাইলেই মার্কেটে গিয়ে কিনে ফেলবেন? কিন্তু না, অনেক পণ্যই টাকা দিয়ে চাইলেই কিনে নেওয়া যায়, কিন্তু লাক্সারি ওয়াচ মার্কেট হচ্ছে সেই বাজার, যেখানে টাকা নিয়ে ঘুরেও পাওয়া যায় না রোলেক্স, পাটেক ফিলিপ বা অডেমার্স পিগের মতো ব্র্যান্ডের ঘড়ি।

কারা এ লাক্সারি ওয়াচ ব্র্যান্ড?
লাক্সারি মানেই দামে ধরাছোঁয়ার বাইরে, এটা একটা মিথ। লাক্সারি ব্র্যান্ড হলো আসলে একটা মাইন্ডসেট, যেটা নির্দিষ্ট ক্রেতা-বিক্রেতার কোর ভ্যালুকে এমফাসাইজ করে। এর সঙ্গে পণ্যের দামের সম্পর্ক আছে বৈকি। এই ব্র্যান্ডগুলো তাদের ঐতিহ্য, ইউনিক আইডিয়া, ডেডিকেশন থেকে একটি গ্রুপকে টার্গেট করে কোয়ালিটি পণ্য তৈরি করে। ঘড়ির ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে প্রায় নব্বই ভাগই সুইস, যেমন Patek Philippe, Vacheron Constantin, Audemars Piguet, Jaeger-LeCoultre, Rolex, Ulysse Nardin, Blancpain, F.P.Journe, Omega, IWC ইত্যাদি। তবে এ লিস্টে A lange & Sohne, Glashutte Original-এর মতো কিছু জার্মান বা Penerai-এর মতো ইতালিয়ান ব্র্যান্ডও আছে।

রোলেক্স মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি
স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন হলো, এতই যদি ডিমান্ড হয়, তাহলে কোম্পানিগুলো বেশি বেশি প্রোডাক্ট তৈরি করে বেশি লাভ করছে না কেন? ব্যাপারটা আসলে একটু জটিল। রোলেক্সের কথাই ধরুন। সুইজারল্যান্ডের চারটি প্রোডাকশন সাইটে রোলেক্স তাদের ঘড়ি তৈরি করে। প্রতিটি ঘড়ি একেক করে হাতে এসেম্বল করা হয়। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রতিটি ঘড়ির এক বছর সময় লাগে। রোলেক্সের দাবি, চাইলেই তারা ডিমান্ড অনুযায়ী সাপ্লাই দিতে পারে না। তাদের প্রোডাকশন প্রক্রিয়ার কারণে ক্যাপাসিটি সীমিত এবং কোয়ালিটিই তাদের প্রধান ফোকাস, ব্যবসা নয়। তবে ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ানোর জন্য কোম্পানিগুলো ইচ্ছা করেই কম প্রোডাকশন করে, এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। অনেকের মতে, এটা হচ্ছে এক্সক্লুসিভিটি ধরে রাখার জন্য। আবার অনেকের মতে, রি–সেল মার্কেট লিড করার জন্যই এমনটি করা হয়। রি–সেল মার্কেট হচ্ছে সোজা কথায় সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেট, যেখানে রিটেইল মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ঘড়ি পাওয়া যায়। ওয়াচ কালেক্টর বা ইনভেস্টরদের ভাষায় এটার নাম গ্রে মার্কেট। যদিও এ গ্রে মার্কেটের ওপর ব্র্যান্ডগুলোর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; এমনকি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাও তারা বরদাস্ত করে না। কিন্তু গ্রে মার্কেটের দামের সঙ্গে রিটেইল মূল্যের তারতম্য দেখে ব্র্যান্ডের রি–সেল ভ্যালু নির্ণয় করা হয়। এ ক্যালকুলেশন ইনভেস্টরদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটা দেখেই তারা ইনভেস্টমেন্টে যায়। তাই লাক্সারি ওয়াচ মার্কেট এখন ইনভেস্টরদের কাছে রমরমা ব্যবসাক্ষেত্র। আর এ গ্রে মার্কেটের প্রায় পুরোটাই লিড করছে রোলেক্স।

সাপ্লাই ডিমান্ড
এটার জন্য আমাদের দেখতে হবে ক্রেতা কারা?
রোলেক্স প্রতিবছর প্রায় এক মিলিয়ন ঘড়ি তৈরি করে। মার্কেটে এগুলো বিক্রি করে অথরাইজড ডিলার, যারা সংক্ষেপে এডি নামে পরিচিত। এখন রোলেক্সের মডেলপ্রতি ডিলাররা (এডি) বছরে দুই-তিনটির বেশি ঘড়ি পায় না। এটা মূলত বেশি ঘটে রোলেক্স প্রফেশনাল লাইনের ঘড়িগুলোতে (স্টেইনলেস স্টিল)। এগুলোর ক্রেতা বেশি। কারণ, এগুলো তুলনামূলকভাবে দামে সস্তা (২০ হাজার ডলারের নিচে) এবং জনপ্রিয় মডেল।

যেমন রোলেক্স সাবমেরিনার 126610LV মডেলের ঘড়িটির রিটেইল দাম (রোলেক্স ওয়েবসাইট অনুযায়ী) ১০,৬০০ ডলার। এই দামেই আপনি পাবেন, যদি অথরাইজড ডিলারের কাছ থেকে কেনেন। কিন্তু ২০২১ মডেলের এ ঘড়ি আসার পর একেকটি এডি দুই বা তিনটির বেশি কেউ পায়নি। অথচ তাদের ব্রাঞ্চগুলোতে এ মডেলের ক্রেতার সংখ্যা হাজারের ওপরে। ফলে এডিকে সামান্যসংখ্যক এই ঘড়ি কার কাছে বিক্রি করবে, সে জন্য কাস্টমার বাছাই করতে হয়। ফলে এডিগুলোর হাতে চলে যায় বিরাট ক্ষমতা। এ বাছাই প্রক্রিয়ায় পাস করার জন্য ক্রেতাদের করতে হয় নানান কসরত।

যেমন আপনাকে হয়তো অজনপ্রিয় বা অচল কিংবা প্রেশাস মেটালের (স্বর্ণ/হিরে) ঘড়ি কিনতে হবে কয়েকটি। কিংবা রেগুলার ক্রেতা হতে হবে এবং নিয়মিত জুয়েলারি কেনার রেকর্ড থাকতে হবে। আর রেকর্ডবিহীন নতুন ক্রেতা হলে, আপনাকে ‘ওয়েটিং লিস্ট’-এ ফেলে দেওয়া হবে। এ ওয়েটিং লিস্ট হলো ভদ্র ভাষায় আপনার নাম-ঠিকানা লিখে নিয়ে অপেক্ষা করতে বলা। বর্তমানে রোলেক্স GMT Master 2 (Ref. 126710) মডেলের ওয়েটিং লিস্ট প্রায় ৫ বছর। তা-ও বেশির ভাগ এডি এখন আর ইন্টারেস্ট রেজিস্টার করে না। আপনার যদি প্রতিবছর দু-একটি জুয়েলারি কেনার রেকর্ড না থাকে, সরাসরি না করে দেবে। এর আরেকটি কারণ হলো, সত্যিকার ক্রেতা এবং ব্যবসায়ীর পার্থক্য করতে না পারা।

রিটেইল বনাম গ্রে মার্কেট
এটা তো গেল কেবল রিয়েল কাস্টমারদের কথা, যাঁরা সত্যিই রোলেক্স কিনতে চান নিজেদের ব্যবহারের জন্য (রোলেক্সের একমাত্র টার্গেট এসব ক্রেতা)। কিন্তু রি–সেল ভ্যালুর কারণে প্রচুর ইনভেস্টর আছে এই মার্কেটে, যারা মূলত রিটেইলে কিনে গ্রে মার্কেটে সেল করে দেয় (এই কারণেই ডিলাররা নতুন কাস্টমার দেখলে মনে করে ব্যবসায়ী)। এর পাশাপাশি আইকনিক কিছু মডেল লংটার্ম ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে কালেক্ট করে। রোলেক্স আইকনিক মডেলগুলোর মধ্যে সাবমেরিনার, ডেটজাস্ট, ডেটোনা, স্কাই ডুয়েলার ইত্যাদি ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে হটকেক। ফলে এসব ঘড়ির রি–সেল ভ্যালু অনেক বেশি এবং ওয়েটিং লিস্টও বেশ লম্বা। নিচের লিস্টটি দেখলেই ঘড়িগুলোর প্রকৃত দামের সঙ্গে বিক্রীত দামের পার্থক্যটা বোঝা যাবে।

Deloitte-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ সালে ৩২টি ব্র্যান্ড ২ বিলিয়ন ডলারের ঘড়ি বিক্রি করে। কিন্তু আরেক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে (পুরোনো জিনিস বিক্রির বাজার) বিক্রি হয় ২৫ বিলিয়ন ডলারের ঘড়ি। লাক্সারি ওয়াচ মার্কেট যে সাধারণ ক্রেতার হাতের বাইরে গ্রে মার্কেটের কন্ট্রোলে, এই রিপোর্টই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

অন্যান্য ব্র্যান্ড
অন্যান্য ব্র্যান্ডের মধ্যে পাটেক ফিলিপের (Patek Philippe Nautilus 5711/1A-001), অডেমার্স পিগের (Audemars Piguet Royal Oak Ref. 15500ST.00.1220ST.01), ভাসোরোন কোন্সটাটার (Vacheron Constantin Overseas 4500V), এফপি জর্নের (F.P.Journe Centrigraphe Souverain), আ লাঙ্গা অ্যান্ড জোনার (A lange & Sohne Lange 1 এবং Datograph), জেজের লা’কুলট্রার (Jaeger-LeCoultre Master Perpetual, Reverso Dueface Moon), এই মডেলগুলো মার্কেটে বেশ জনপ্রিয় এবং রিটেইলের কয়েক গুণ বেশি দাম দিতে হয় সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে।

তবে এটাও উল্লেখ্য, সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটেও এসব টাইমপিস চাহিবামাত্র মেলে না। এগুলো পেতে চেনাজানা থাকা লাগে, ঘড়ি সম্পর্কেও বেশ ভালো ধারণা দরকার। কারণ, চাহিদা এবং দামের কারণে মার্কেটে প্রচুর রেপ্লিকা থাকে এবং এগুলো এতই নিখুঁতভাবে কপি করা হয়, প্রফেশনাল ছাড়া খুঁত বের করা মুশকিল। তাই সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেট আসলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এক ভয়ংকর ফাঁদ। এ ছাড়া এডির বাইরে অন্য যেকোনো সোর্স থেকে কেনা ঘড়ির কোনো গ্যারান্টি রোলেক্স দেয় না। সাধারণ ক্রেতাদের ভরসা তাই রোলেক্স অথরাইজড ডিলার। ন্যায্য রিটেইল দাম, নির্ভরযোগ্য।

খুব ডেসপারেট না হলে রিটেইলের তিন গুন দাম দিতে কোনো ক্রেতাই আগ্রহী নন। ফলে ঘুরেফিরে সেই রিটেইলেই হুমড়ি খেয়ে পড়া, সেই এডির মনভোলানোর কসরত, সেই ওয়েটিং লিস্ট। ঘুরেফিরে তাই একই গল্প। টাকা দিয়েও কেনা যায় না যে ঘড়ি!
*লেখক: লিয়াকত হাসান, ম্যানচেস্টার, ইংল্যান্ড