রদ্যাঁর মেটামরফোসিস

মন্ট্রিয়েল মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টসে রদ্যাঁর প্রদর্শনীর পোস্টার
মন্ট্রিয়েল মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টসে রদ্যাঁর প্রদর্শনীর পোস্টার

মন্ট্রিয়েলের মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টসে হয়ে গেল আধুনিক ভাস্কর্যের জনক, ফরাসি ভাস্কর আগুস্ত রদ্যাঁর (১৮৪০-১৯১৭) প্রদর্শনী মেটামরফোসিস। এটি চলেছে প্রায় পাঁচ মাস ধরে (৩০ মে-১৮ অক্টোবর ২০১৫)। এর আয়োজনে ছিল মন্ট্রিয়েলের মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস ও প্যারিসের ম্যুজে রদ্যাঁ। এই প্রদর্শনী ছিল এ যাবৎ কানাডায় রদ্যাঁর ওপর সর্ববৃহৎ প্রদর্শনী। এতে প্রদর্শিত হয় শিল্পীর তিন শর মতো কাজ। প্রদর্শনীতে ১৭১টি ভাস্কর্য

দ্য কিস
দ্য কিস
দ্য থিংকার
দ্য থিংকার

ছাড়াও ছিল স্কেচ, জলরং ও রদ্যাঁর সঙ্গে থেকে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা আলোকচিত্রী ইউজেন দ্রুয়ের তোলা ৭০টি রদ্যাঁর ছবি। এই প্রদর্শনীতে রদ্যাঁর অত্যন্ত বিখ্যাত ভাস্কর্যের
প্রত্যেকটিই ছিল। যেমন দ্য থিংকার, দ্য কিস, দ্য ওয়াকিং ম্যান, দ্য গেটস অব হেল, সেন্ট জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট প্রিচিং, দ্য এজ অব ব্রোঞ্জ, দ্য বার্গর্স অব কালাইস, দ্য শেড, দ্য থ্রি শেডস, মন্যুমেন্ট টু ব্যালজাক, ম্যান উইথ ব্রোকেন নোজ ইত্যাদি।
কাদামাটির কাজে, জটিল ও উদ্দাম ভাস্কর্য গড়বার ক্ষেত্রে রদ্যাঁ অনন্যসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তাঁর এ ধরনের কাজগুলো আলংকারিক, সূত্র মেনে চলা অথবা খুব বেশি রকম বিষয়ভিত্তিক কাজ অর্থাৎ সমসাময়িক প্রাধান্য বিস্তারকারী ফিগারেটিভ ভাস্কর্য ট্র্যাডিশনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। রদ্যাঁর মৌলিক কাজগুলো প্রচলিত পৌরাণিক ও প্রতীকাশ্রয়ী বিষয়বস্তুর বাইরে ছিল। তিনি বাস্তবতা ও ব্যক্তিচরিত্র দিয়ে মানুষের শরীরকে সাজাতেন। প্রচলিত প্যাটার্নের বাইরে বেরিয়ে আসার কারণে রদ্যাঁ সমালোচিত ছিলেন। তবে তিনি তাঁর কাজের সমালোচনা সম্পর্কে জ্ঞাত থাকলেও নিজস্ব ধরন পরিবর্তন করেননি। পরবর্তীতে অবশ্য রাষ্ট্রীয় পর্যায় ও শিল্পী সমাজের কাছ থেকেও তাঁর কাজের যথেষ্ট সাড়া মিলেছিল।
রদ্যাঁ ছিলেন একজন জন্মগত ও সহজাত শিল্পী। তিনি খেলতেন চরিত্র ও আবেগ নিয়ে। মনুমেন্টাল প্রকাশ নিয়ে তাঁর মাথা ব্যথা ছিল না। আর তাই তিনি শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী গ্রিক বাস্তববাদ এবং বারোক ও নিও-বারোকদের আলংকারিক সৌন্দর্যের ট্র্যাডিশন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।রদ্যাঁর ভাস্কর্যে গুরুত্ব পেত ব্যক্তি ও তার দেহের বলিষ্ঠতা। আরও উঠে আসত বিস্তারিত, টেক্সচার্ড সারফেস এবং আলো-আঁধারির যুগপৎ খেলার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত আবেগ। তাঁর সমসাময়িকদের চাইতে রদ্যাঁ ভিন্নভাবে বিশ্বাস করতেন যে, একজন ব্যক্তির চরিত্র তার দৈহিক গড়নের মাধ্যমেই যথাযথভাবে প্রকাশিত হয়।
রদ্যাঁর সারফেস মডেলিং এর অসাধারণ প্রতিভার কারণে ভাস্কর্যে ফুটে ওঠা একজন ব্যক্তির প্রতিটি অঙ্গ সামগ্রিক মানুষটির কথা বলতো। উদাহরণ হিসেবে তাঁর অতি বিখ্যাত কাজ দ্য থিংকারের কথা বলা যেতে পারে। দ্য

প্রদর্শনীতে দর্শক
প্রদর্শনীতে দর্শক

থিংকারে পুরুষের আবেগ মূর্তমান হয় পাথরে তার চেপে বসা পায়ের আঙুল, শরীরের পেছন দিকের অদম্য কাঠিন্য ও হাতের স্বতন্ত্র অবস্থানগত পার্থক্যের দ্বারা। দ্য থিংকার সম্পর্কে রদ্যাঁ নিজেই বলেন, ‘আমার চিন্তক শুধুমাত্র তার মস্তিষ্ক, বুনোট ভ্রুয়ের কুঞ্চন, স্ফীত নাসিকা ও অচঞ্চল ঠোঁট দিয়েই চিন্তা করে না, বরং একই সঙ্গে তার বাহু, পশ্চাৎ দেশ, পায়ের প্রতিটি মাংসপেশি, মুষ্টিবদ্ধ হাত এবং দৃঢ়ভাবে চেপে বসা পায়ের আঙুল দিয়েও চিন্তা করে।

পোস্টার
পোস্টার

রদ্যাঁর এক একটি ভাস্কর্যের খণ্ডিত অংশগুলোই এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কাজ এবং এই খণ্ডিত অংশগুলোকেই তিনি তাঁর শৈল্পিক বক্তব্যের মূল নির্যাস কিংবা উপাদান বলে মনে করতেন। তাঁর কাজগুলোর খণ্ডিত বা অসম্পূর্ণ অংশ, যেমন হাত, পা কিংবা মস্তকবিহীন কাজগুলোই, ভাস্কর্যগুলোর প্রতিরূপ বা সাদৃশ্যকে তুলে ধরার প্রথাগত বা সনাতন ভূমিকা থেকে মুক্তি দেয় এবং এমন একটি জগতে নিয়ে যায় যেখানে ফর্মগুলো তাদের নিজস্ব অস্তিত্বের জন্যই বিরাজমান। এ ধরনের কয়েকটি বিখ্যাত কাজ হচ্ছে দ্য ওয়াকিং ম্যান, মেডিটেশন উইদাউট আর্মস, আইরিস ও মেসেঞ্জার অব দ্য গডস।
রদ্যাঁ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তৈরি করেছেন কয়েক হাজার পোর্ট্রেট, ফিগার ও খণ্ডিত ভাস্কর্য। এ ছাড়াও তিনি বেশ কিছু তৈলচিত্র ও জলরঙের কাজ করেছেন। রদ্যাঁর ভাস্কর্যের অন্যতম বিষয়বস্তু ছিল পোর্ট্রেট বা প্রতিকৃতি। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় অন্তত ৫৬টি পোর্ট্রেটের কাজ করেন। প্রথম দিকে রদ্যাঁর মডেল ছিলেন তাঁরই সঙ্গী-ভাস্কর জুল দালো ও সঙ্গী কামিল ক্লাউদেল। পরবর্তীতে ভাস্কর হিসেবে সুনাম ছড়িয়ে পড়লে তিনি তাঁর সমসাময়িক বিখ্যাত মানুষদের ও আবক্ষ ভাস্কর্য বানান, যেমন ইংরেজ রাজনীতিবিদ জর্জ উইন্ডহ্যাম, আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ, অস্ট্রিয়ান কম্পোজার গুস্তাভ মাহলের ও আর্জেন্টিনার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোমিঙো ফাউস্টিনো সারমিয়েন্তো।

পোস্টার
পোস্টার
লেখিকা
লেখিকা

রদ্যাঁ ফরাসি রাষ্ট্রকে তাঁর স্টুডিওটি এবং তাঁর করা প্লাস্টার থেকে ছাঁচ বানাবার ক্ষমতা উইল করে যান। কারণ তিনি তাঁর কাজের ব্যাপ্তির ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। রদ্যাঁর কাজ অনেক পাবলিক এবং প্রাইভেট সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ম্যুজে রদ্যাঁ। ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরে রদ্যাঁর সর্বোচ্চ সংখ্যক কাজ সংগৃহীত আছে। এতে আছে ৬ হাজারের বেশি ভাস্কর্য এবং ৭ হাজারেরও বেশি রদ্যাঁর আঁকা ছবি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ফরাসি অর্ডার ‘লেগিও দনখ’ প্রাপ্তির মাধ্যমে কমান্ডার সম্মানপ্রাপ্ত ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রিপ্রাপ্ত এই শিল্পীর প্রাপ্তিযোগ অনেক।
রদ্যাঁর পরিচিতি ভিজ্যুয়াল আর্টস কমিউনিটি বাইরেও পৃথিবীময়, যা খুব কম ভাস্করের ভাগ্যেই জুটেছে। রদ্যাঁকে তাঁর জীবদ্দশায় তুলনা করা হতো পৃথিবীখ্যাত ইতালীয় ভাস্কর মিকেলাঞ্জেলোর সঙ্গে। তিনি তাঁর সময়কালের অন্যতম মহান শিল্পী হিসেবে পৃথিবীময় স্বীকৃত ছিলেন। ১৯১৭ সালে মৃত্যুর পরপর জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়লেও পঞ্চাশের দশক থেকেই তাঁর অবস্থান সুসংহত হয়ে উঠে আবার। তাঁর কাজে যে অপূর্ণতার বোধ, যেমন ওয়াকিং ম্যান—এ ধরনের কাজগুলো বিংশ শতকের বিমূর্ত ভাস্কর্যকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
মানুষের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিকে তুলে ধরার মাধ্যমে রদ্যাঁ ভাস্কর্যের প্রাচীন ভূমিকাকে পুনরুদ্ধার করেছেন। তিনি সনাতন প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি থেকে ভাস্কর্যকে মুক্ত করেছেন, যা বিংশ শতকের ভাস্কর্যে বিমূর্ততাসহ নানান নিরীক্ষার পথ খুলে দেয়। তাঁর জনপ্রিয়তার একটি অন্যতম কারণ ছিল সাধারণ নরনারীর আবেগমথিত রিপ্রেজেন্টেশন ও মানুষের ভেতরকার সৌন্দর্য ও উচ্ছ্বাস তুলে আনার ক্ষমতা। উদাহরণ হিসেবে তাঁর দুটি অতিবিখ্যাত কাজের কথা উল্লেখ করা যায় দ্য কিস ও দ্য থিংকার। মানবিক আবেগ ও চরিত্রের প্রতীক হিসেবে এই দুটি কাজের আবেদন শিল্পকলাকে ছাড়িয়েও বিস্তৃত।
ভাস্করদের একটি পুরো প্রজন্ম সরাসরিভাবে রদ্যাঁর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছেন। অনেকেই স্টুডিওতে তাঁর সঙ্গে থেকে কাজ করেছেন, শিখেছেন হাতে কলমে। অনেক ভাস্করের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ব্যাপারেও তাঁর ভূমিকা ছিল অনেকটাই পিতার মতো।
পৃথিবীর অন্যতম মহান ভাস্কর, একটি পুরো ভাস্কর প্রজন্মের পুরোধা, বিংশ শতকের বিমূর্ত ও নিরীক্ষামূলক ভাস্কর্যের পিতা এবং আধুনিক ভাস্কর্যের জনক আগুস্ত রদ্যাঁর দুনিয়াখ্যাত দ্য থিংকার, দ্য কিস ও গেটস অব হেল, এ কাজগুলোকে চাক্ষুষ দেখার সুযোগ আমাকে দর্শনার্থী হিসেবে ভালো লাগায় আচ্ছন্ন করেছে, শিহরিত করেছে; যে সুযোগের অপেক্ষায় আমি ছিলাম দীর্ঘ বছর।