মেয়ে মানেই কি শুধু বিয়ে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘হৈমন্তী’ গল্পের শুরুটা করেছিলেন এভাবে-‘কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিতেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না। তিনি দেখিলেন, মেয়েটির বিবাহের বয়স পার হইয়া গেছে, কিন্তু আর কিছুদিন গেলে সেটাকে ভদ্র বা অভদ্র কোনো রকমে চাপা দিবার সময়টাও পার হইয়া যাইবে। মেয়ের বয়স অবৈধ রকমে বাড়িয়া গেছে বটে, কিন্তু পণের টাকার আপেক্ষিক গুরুত্ব এখনো তাহার চেয়ে কিঞ্চিৎ উপরে আছে, সেই জন্যই তাড়া।’
হৈমন্তীর বাবা গৌরীশংকর তাঁর মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন বটে, কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে তিনি মেয়ের আত্মিক মর্যাদাবোধকে মূল্যায়ন করেননি। শ্বশুরালয়ে গল্পের হৈমন্তীর কী পরিণতি হয়েছিল সেটা কিন্তু লেখক স্পষ্ট করে বলেননি। তবে অনুমান করা সহজ। গল্পের শেষে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, হৈমন্তীর বর অপুর মা ছেলের জন্য নতুন করে পাত্রী খুঁজতে শুরু করেছেন।
হৈমন্তী গল্পটি প্রকাশের ১০৩ বছর পরে এসে বাঙালি সমাজে নারীর অবস্থানের কতটুকু পরিবর্তন এসেছে? বলা যায় যথেষ্ট ইতিবাচক পরিবর্তন আছে। তবে এসব পরিবর্তনের বেশির ভাগই কাগুজে ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে। যে কারণে এখনো গণমাধ্যমে পড়তে হয়, প্রবাসে বিয়ের যোগ্য বাঙালি মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারেন না মা-বাবা। কারণ মেয়ের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ উপযুক্ত পাত্র মিলছে না। এখনো মা-বাবারা প্রতিযোগিতার সব স্তরে সন্তানকে প্রথম হওয়ার দীক্ষা দিয়ে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে সন্তানের আগ্রহ বা ইচ্ছাকে মূল্যায়ন করার মানসিকতা মা-বাবার নেই। কারণ তাঁরা মনে করেন, সন্তান যত বড়ই হোক না কেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। বিশেষ করে মেয়েদের প্রতি বাঙালি বাবা-মায়ের এই বিধিনিষেধ একেবারে সমর্থনযোগ্য নয়। পায়ে দড়ি বেঁধে পাখিকে আকাশে উড়তে বলার কোনো অর্থ হয় না। বরং শৃঙ্খলহীনভাবে উন্মুক্ত আকাশে নিজের মতো বিচরণ করতে পারাটাই তার জীবনের সার্থকতা।
কিন্তু সভ্যতার কল্যাণে আজকের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মানুষ বুঝতে শুরু করেছে ব্যক্তির চিন্তার স্বাধীনতা থেকেই তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। তৈরি হয় আত্মমর্যাদাবোধ। আর আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষ মাত্রই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বা প্রাইভেসিতে অন্য কারও হস্তক্ষেপ পছন্দ করেন না এবং নিজেরাও একই কাজ থেকে বিরত থাকেন। সচেতন মা-বাবা মাত্রই বুঝতে পারেন, তাঁদের সদ্য কথা বলতে শেখা শিশুসন্তানটিরও আত্মসম্মানবোধ প্রখর।
সুতরাং প্রবাসে থাকা বাঙালি বাবা-মায়েদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। মেয়ে বিয়ের যোগ্য হওয়া মানে তাঁর চিন্তার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অধিকারী হওয়া। সেই স্বাধীনতাকে সম্মান করা ও স্বীকৃতি দেওয়ার মানসিকতা সব মা-বাবার মধ্যে থাকতে হবে। তাতে করে মেয়ের জন্য বর খোঁজার দুশ্চিন্তা থেকে তাঁরা রেহাই পাবেন। তা না হলে অবিরাম হৈমন্তীর পরিণতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।