শান্তিরক্ষার নামে বিভিন্ন দেশে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করছে। নিরাপত্তার নামে লুটপাট চলছে। শান্তি আলোচনার নামে দ্বন্দ্বকে উস্কে দেওয়া হচ্ছে। শত্রু দ্বারা শত্রু ধ্বংস করা হচ্ছে। আর এসব অপকর্মের বৈধতার জন্য বিশ্বায়নকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন জঙ্গিদের হাতে অস্ত্র দিয়ে বিশ্বায়নের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনে জঙ্গিদের সুবিধা দিচ্ছে। জঙ্গিদের মাধ্যমে বিশ্বরাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে অন্য দেশে হস্তক্ষেপের বৈধ উপায় তৈরি হচ্ছে। আর সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো এ থেকে নিজেদের মতো সুবিধা নিচ্ছে। বিশ্বায়নের ধারণাটা পুঁজিবাদী ও ধনী শাসকশ্রেণির, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জি-২০, নিরাপত্তা পরিষদ, ন্যাটো প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন তৈরি করে ধনী রাষ্ট্রগুলো তাদের সুবিধার জন্য বিশ্বায়নকে ব্যবহার করছে। এসব দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক খুবই ভালো। এসব দেশের মধ্যে তারা ভিসা ছাড়াই চলাচল করতে পারে। একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসে। এসব রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করে। আর সব অসুবিধা ভোগ করতে হয় গরিব ও অনুন্নত দেশগুলোকে।

বিশ্বে অস্ত্রের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সশস্ত্র জঙ্গিদের তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু এর ভুক্তভোগী এত দিন ধরে পুঁজিবাদী দেশগুলো হচ্ছিল না, হচ্ছিল শুধু গরিব উন্নয়নশীল দেশগুলো। আবার সমস্যা সমাধানের নাম দিয়ে এসব পুঁজিবাদী দেশ বিশ্বের অনেক দেশের সরকার ও জঙ্গিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব টিকিয়ে রাখছে, আর তারা তৃতীয় পক্ষ হয়ে দুই পক্ষ থেকে সুবিধা নিচ্ছে। সরকারকে বলছে জঙ্গিদের ধ্বংস করতে, আবার জঙ্গিদের বলছে সরকারকে ধ্বংস করতে।

সাম্রাজ্যবাদী এসব দেশ দুই পক্ষকেই ধ্বংস করে রাষ্ট্রকে বেসরকারি খাতে নিয়ে যেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জঙ্গিদের লুটপাটের অবৈধ অর্থের স্বীকৃতি দিয়ে সভ্য রাষ্ট্রের নামধারী রাষ্ট্রগুলো প্রমাণ করে, তারা বিশ্বায়নের নামে সন্ত্রাসীদের লালন করছে। এ সময় বিশ্বব্যাপী সামরিক খাতে ব্যয়ের মাত্র এক শতাংশ অর্থ দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি শিশুকে ব্লাকবোর্ডের সামনে দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু তা কি হচ্ছে? বিশ্বায়নের কারণে বেড়েছে বৈষম্য, ক্ষুধা, দারিদ্র্য। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ। সমাজে বাড়ছে বিভেদ, হানাহানি।

গত দুই বছর বিশ্ব কম-বেশি করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে হারিয়েছে প্রিয়জনকে। বিশ্ব যখন হতাশা কাটিয়ে একটু আশার আলো দেখতে শুরু করেছে, ঠিক তেমন সময় ইউরোপ শত বছর আগের জায়গায় ফিরে এসেছে। জার্মানির হিটলার ইতিহাসের পাতায় শত বছর বিরাজ করবে, তা কি হয়? প্রযুক্তির যুগের ভয়ংকর চরিত্র পুতিন, যাকে একদিন বিশ্ব বরণ করেছিল ফুলের মালা দিয়ে। সোভিয়েতকে ভেঙে চুরমার করেছিল যে দেশগুলো, আজ সেসব দেশ কিছুটা হতভম্ব হয়ে দেখছে পুতিনের খেলা। যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ, তা আর বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না। তবে পুতিনের কুরুক্ষেত্র বিশ্বকে বড় আকারে নাড়া দিয়েছে, এখন সে বিষয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। আমি সুইডেনে সুইডিশদের মনমানসিকতা লক্ষ করছি। স্বাভাবিকভাবে কেউই কোনোভাবে ইউক্রেন হামলাকে সাপোর্ট করছে না। পুরো বিষয়টির নিন্দা করছে সবাই। ছোট–বড় সবাই বেশ চিন্তিত। কারণ, ঘটনা ঘটে চলেছে বাড়ির পাশে। করোনায় ইউরোপের অনেক ক্ষতি হয়েছে, অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় শত বছর আগের হিটলারের চরিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, এটা কেউ ভাবতে পারেনি।

তবে ইউরোপ, আমেরিকার কূটনৈতিক কাজকর্ম গোটা বিশ্বকে দৌড়ের ওপর রেখেছে এত বছর ধরে। এবার তাদের নিজেদের দৌড়ানোর পালা, যা আমি দেখছি।
আমার এ কথায় অনেকে প্রথমে একটু হোঁচট খাবে; পরে পুরো লেখা পড়ার পর মত-দ্বিমত হবে। হলেই ভালো, তা না হলে ধরে নেব আমরা ভাবতেও ভুলে গেছি। যাহোক, ইউরোপে যুদ্ধ শীতের সময় যখন তেল, গ্যাস ও বৈদ্যুতিক জ্বালানির দাম বাজারে চড়া। জার্মান তার প্রয়োজনের অর্ধেকের বেশি গ্যাস কিনে থাকে রাশিয়ার থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ নানাভাবে জব্দ করতে চেষ্টা করছে রাশিয়াকে। কিন্তু রাশিয়াও জানে, গ্যাস বন্ধ হলে জার্মানিসহ পুরো ইউরোপের অর্থনৈতিক বিশাল ক্ষতি হবে ইত্যাদি।

এই যুদ্ধে চীন হয়তো জয়ী হবে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে। যেমন হয়েছে করোনার সময়। আমি বেশ ভাবতে শুরু করেছি! বিশ্বের অনেক দেশেই কিন্তু যুদ্ধ বিরাজমান, অথচ টিভির পর্দায় সেসব আলোচনা হয়-ই না বললে চলে। যুগে যুগে এই ইউরোপ, আমেরিকাই কিন্তু অস্ত্র বিক্রি করে আসছে বিশ্বের মানুষের কাছে। সেই অস্ত্রে পৃথিবীর মানুষ একে অপরকে ধ্বংস করছে! পুতিনের ইউক্রেন হামলার আগে যেভাবে সবাই কথা বলেছিল বা ওয়াদা করেছিল, সেটা এখন পুরোপুরি কার্যকর হবে বলে মনে হচ্ছে না। ইউক্রেনকে নিজেই সামলাতে হবে এই ঠেলা। সবাই এখন বুঝতে শুরু করেছে, পুতিন যেকোনো অঘটন ঘটাতে দ্বিধাবোধ করবেন না। অতএব, অন্য কেউ নাক গলাতে এলে খবর আছে। আমি যে বিষয় বেশি লক্ষ করছি সেটা হলো, সুইডেনের ভূমিকা?

সুইডেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি। আলফ্রেড নোবেলের ডিনামাইট ব্যবহার করা হয়েছে তৎকালীন বিশ্বযুদ্ধে। সুইডিশ জাতি তার ট্র্যাডিশন ভাঙবে না। তবে ইউক্রেনকে মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করবে, এমনটি ধারণা ছিল। কিন্তু না, সে ধারণা ঠিক না, সুইডিশ রাজনীতিকদের চিন্তা এক হয়ে গেছে এবং তারা সরাসরি যুদ্ধের অস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করছে।

গত দুই বছর করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব বেশ পিছিয়ে পড়েছে এবং সেই ধাক্কা কাটিয়ে না উঠতেই নতুন ধাক্কা এই যুদ্ধ, যা গোটা বিশ্বের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে আমি মনে করছি। তবে পুঁজিবাদীরা মনে করছে এর বিপরীতটা। কারণ, তাদের কাজ হচ্ছে ভাঙ্গা ও গড়া। যুদ্ধে জয়–পরাজয় বড় কথা নয়, বা কত মানুষ মারা গেল, সেটাও কোনো ব্যাপার নয়। এ যুদ্ধে মানুষে মানুষে ঘৃণা বেড়ে যাবে অতীতের চেয়ে বেশি। যে সোভিয়েতকে ভেঙে চুরমার করেছিল, সেই সোভিয়েত কি আবার পুনরুজ্জীবিত হতে চলেছে? পুতিনের কথায় সে রকমই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, পুতিন ন্যাটো জোট একেবারেই পছন্দ করছে না, এ বিষয় নিশ্চিত। অন্যদিকে বিশ্বের সব জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহাদুরি, এটাও তো ভালো কথা নয়।

চীন ইদানীং বিশ্বায়নে ভালোমতো প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের আর আগের মতো একচেটিয়া বাহাদুরির দিন নেই, সব মিলে পৃথিবীর অবস্থা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। সবশেষে বলতে চাই, স্বৈরশাসক এবং পুঁজিবাদীরা ইউরোপ তথা গোটা বিশ্বের শান্তি ধ্বংস করতে শুরু করেছে। অতীতে অনেক দেশ যেমন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অনেক দেশকে টুকরো করে তিলে তিলে ধ্বংস করেছে। বাস্তবে প্রায় সর্বত্রই অধিকাংশ শাসক নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক এবং তাদেরকে যারা ইন্ধন দিচ্ছে, তারা হচ্ছে পুঁজিবাদী।

প্রতিদিন সেই শাসকেরা তাদের নিজ দেশে, তাদের নিজস্ব নাগরিকদের টুকরো টুকরো করে শান্তি ধ্বংস করে চলেছে! অতএব, বর্তমানে প্রতিদিনই একটি দুঃখের দিন মানবজাতির জন্য এবং এর জন্য দায়ী বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশগুলো। কারণ, তারা বিচারক হয়ে হুকুম করছে, দরকারে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ মরছে, ধর্ষিত হয়ে দেশ ছেড়ে ভিনদেশে আশ্রিত হচ্ছে, কেউ দুখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে ক্ষয় হচ্ছে। এই হচ্ছে বর্তমান পৃথিবী আর এর মধ্যে বসত করছে যে স্বৈরশাসক দলটি, তার নাম বিশ্বায়নে পুঁজিবাদী।