বিজ্ঞান বনাম শিল্প
বিজ্ঞান (Science) ও শিল্পের (Art) দ্বন্দ্ব চিরদিনের। শুধু বাংলায়ই নয়, অন্য সব ভাষায় ও জাতিতে এ দ্বন্দ্ব চলমান। আমি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছাত্র হয়েও শিল্প ও সাহিত্যে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করি বলে এরূপ দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হই প্রতিনিয়ত। পেশাগত জীবনেও এ দ্বন্দ্ব তাড়া করে বেড়ায় সর্বদা। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে এ বিষয়টির কিছু বিশ্লেষণ এখানে উপস্থাপন করছি।
বাংলায় ‘বিজ্ঞান’-এর একটি সংজ্ঞা রয়েছে, ‘বিশেষ জ্ঞান’, যা আমার বিবেচনায় মোটেও সঠিক নয়। ‘বিশেষ জ্ঞান’ বলে বিজ্ঞানকে আসলে পৃথক করে রাখা হয়, অনেকটা সমাজচ্যুত হওয়ার মতো। আমাদের সাধারণের ধারণা, বিজ্ঞান মানেই কলকবজা-যন্ত্রপাতি, অর্থ্যাৎ কর্কষ ও প্রাণহীন একটি বিষয়। অন্যদিকে শিল্প হচ্ছে সৃজনশীল, অনুভূতিসম্পন্ন ও আবেগপূর্ণ। ছাত্রাবস্থায় অধিকতর মেধাবীরা (‘মেধা’র সংজ্ঞা নিয়ে অবশ্য মতবিরোধ রয়েছে, তবে তা অন্য আলোচনার জন্য তুলে রাখা হলো) বিজ্ঞানের দিকে ধাবিত হয়। সম্ভবত নিশ্চিত ও উচ্চ বেতনের চাকরি পাওয়ার লক্ষ্যে। কিন্তু পেশাগত জীবনে দেখা যায়, শিল্প ও সাহিত্যের মানুষেরা সমাজে মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর বিজ্ঞানের জনেরা খানিকটা একঘরে হয়ে থাকে। এটি মোটেও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নয়, যার পেছনে বিজ্ঞান ও শিল্প সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণার অভাব ও অহেতুক দ্বন্দ্বই দায়ী বলে আমার বিশ্বাস।
বিজ্ঞানের অধিকতর উপযোগী সংজ্ঞা হচ্ছে ‘পদ্ধতিগত শিক্ষা’। বিজ্ঞান যেকোনো বিষয়কেই নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসারে বিশ্লেষণ করে। প্রতিটি বিষয় বা ঘটনার পেছনে রয়েছে কিছু কার্যকারণ এবং সেখান থেকে আমরা কিছু ফলাফল লাভ করি। এ ফলাফল ও কার্যকারণের মাঝে যে সম্পর্ক, তার একটি গাণিতিক কিংবা যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করাই বিজ্ঞানের প্রধান লক্ষ্য। যেহেতু একটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে এ জ্ঞান লাভ করা হয়, সেহেতু তা আপেক্ষিক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং সর্বজনীন। অন্যদিকে শিল্প হচ্ছে একটি বিষয় বা ঘটনার ব্যক্তিগত অনুভূতিতে ধারণ এবং অতঃপর তার বহিঃপ্রকাশ। যেহেতু ব্যক্তিগত উপলব্ধিই এখানে প্রধান নিয়ামক, তাই এ জ্ঞান কখনোই সর্বজনীন হবে না। একই বিষয়কে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে উপলব্ধি করবে। আবার উপলব্ধি কাছাকাছি হলেও তার প্রকাশ ভিন্ন হতে বাধ্য। কারণ সেখানে ব্যক্তির আবেগ, রুচিবোধ ও সৃজনশীলতা কাজ করে। একই বিষয়ের ওপর নির্মিত দুটো চিত্রকর্ম কখনো এক হবে না, দুটো সাহিত্যকর্ম ভিন্ন হবেই।
উপরিউক্ত সংজ্ঞা অনুসারেও আমাদের মনে হতে পারে, বিজ্ঞান শুধুই নিয়মে বাধা ও রুক্ষ, যেখানে আবেগ ও সৃজনশীলতার কোনো স্থান নেই। অন্যদিকে শিল্প একেবারেই ব্যক্তিগত খামখেয়ালির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে কোনো নিয়মের বালাই নেই। বিজ্ঞানী মানেই রোবট, আর শিল্পী মানেই এলোমেলো চুল ও পাগল পাগল স্বভাব। সনাতন এ ধারণাগুলো একেবারেই ভুল। মজার ব্যাপার, এ ধারণা শুধু সাধারণের মাঝেই নয়, যাঁরা জ্ঞানচর্চা করছেন, তাঁদের মাঝেও বিদ্যমান। বিজ্ঞানী ভাবেন, পৃথিবীর তাবৎ কঠিন জ্ঞান তাঁর মস্তিষ্কে, আর তাই সাধারণ কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা বা মাথা ঘামানো তাঁর কাজ নয়। অন্যদিকে শিল্পীদের কেউ কেউ মনে করতে পারেন, সৃজনশীলতার জন্য একটু পাগলামি, চরিত্র স্খলন ইত্যাদি জরুরি, যা সাধারণের বোধগম্য নয়।
বিজ্ঞানের অপরিহার্য অংশ হচ্ছে আবিষ্কার। এ আবিষ্কার নতুন তথ্যের, নতুন পদ্ধতির, নতুন যন্ত্রের, এমনকি নতুন ভাবনার। আগামী দিনের পৃথিবী কেমন হবে তা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মানুষেরাই বলে দিচ্ছেন। এর চেয়ে সৃজনশীল কাজ আর কী হতে পারে? সৃজনশীল না হলে একজন বিজ্ঞানী বা প্রযুক্তিবিদের পক্ষে ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ে গবেষণা করা মোটেও সম্ভব নয়। আবার শুধু আবিষ্কারই নয়, সে নতুন ভাবনাকে বাস্তবায়নে প্রয়োজন হয় রুচিবোধের, আবেগ ও অনুভূতির। একটি নতুন প্রযুক্তি যদি দৃষ্টিনন্দন না হয় তবে তা বাজার পাবে না যতই সে কার্যকরী হোক না কেন।
অন্যদিকে শিল্প ও সাহিত্যে নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতির প্রয়োগও অপরিহার্য। চিত্রকর্মে রঙের বিন্যাস ও ব্যবহারে নির্দিষ্ট রীতি মানতে হয়। সাহিত্যেও রয়েছে নিয়মকানুন, যেমন, কবিতার ছন্দ, মাত্রা ও উপমার প্রয়োগ। সংগীতে সাত স্বরের বিন্যাস, স্কেল, তাল, রাগ, ইত্যাদি না মেনে কেউ গাইতে পারবেন? শিল্পের সব শাখায়ই আমরা সচেতনভাবে হোক বা অবচেতনভাবেই হোক, নির্দিষ্ট নিয়ম ও রীতি ঠিকই মেনে চলি। আর আধুনিক যুগে শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে প্রচুর। চিত্রকর্ম শুধু ক্যানভাসেই নয়, কম্পিউটার পর্দায়ও আঁকা হয়। নতুন গানের সুর শুধু হারমোনিয়ামেই নয়, কম্পিউটার সফটওয়্যারেও তৈরি হচ্ছে। আর এ প্রযুক্তির ব্যবহার করতে গেলে নিয়ম না মেনে উপায় আছে?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে নবম শ্রেণি থেকে ছাত্রছাত্রীদের ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বিভাজন করা বিজ্ঞান, শিল্প ও বাণিজ্য। ফলে বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা আর কখনো সুযোগ পায় না ইতিহাস পড়ার, চিত্রকর্ম বোঝার কিংবা সংগীতের রস আস্বাদনের। অন্যদিকে শিল্পের ছাত্রছাত্রীদের অজানাই থেকে যায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের কোনো আগামী দিনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থায় এ ধরনের বিভাজন নেই। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত একজন ছাত্রছাত্রী তার পছন্দমতো বিজ্ঞান, শিল্প ও বাণিজ্য থেকে যেকোনো বিষয়ই পড়তে পারে। তার আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী কোনো বিশেষ শাখায় পারদর্শিতা অর্জনের জন্য বেশি বিষয় নিতে পারে, কিন্তু অন্য শাখাগুলো একেবারে বাদ দিয়ে নয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সে একটি বিশেষ বিষয়ের ওপর বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করে। কিন্তু সেখানেও সব বিষয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞান ও শিল্প উভয় শাখায়ই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কোর্স নিয়ে তাদের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করতে হয়। বিজ্ঞান ও শিল্পের যথাযথ সমন্বয় না ঘটিয়ে সুশিক্ষিত নাগরিক গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
আমরা এখন বাস করছি তথ্যপ্রযুক্তির যুগে। যেকোনো জ্ঞানই এ প্রযুক্তির আওতায় এসে যাচ্ছে। বিজ্ঞান ও শিল্পকে আর পৃথকভাবে দেখা যাবে না। বিজ্ঞানের ভেতরে শিল্প ঢুকছে, শিল্পের ভেতরে বিজ্ঞান ঢুকছে। সনাতনী শিক্ষা ও বিশ্বাস নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়বে। ইন্টারনেট প্রযুক্তি এখন সারা বিশ্বকে সংযুক্ত করে দিয়েছে। অতিসত্বরই আসছে আরও ব্যাপক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট অব থিংস। বর্তমান ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে কেবল মানুষে মানুষে যোগাযোগ হচ্ছে, ইন্টারনেট অব থিংস প্রযুক্তিতে মানুষের পাশাপাশি আমাদের চারপাশের সব সরঞ্জামই যুক্ত হবে। যেমন আসবাব, যন্ত্রপাতি, এমনকি পোশাকপরিচ্ছদ। আগামী দিনের সে প্রযুক্তির ব্যবহার ও উৎকর্ষ সাধনে আমাদের চাই সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী, যাদের বিজ্ঞান ও শিল্পের সব শাখায় সম্যক জ্ঞান থাকবে। সনাতনী বিশ্বাস ও সংকীর্ণ ধারণার কোনো স্থান নেই আগামী দিনের প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র