প্রবাসে বাণী অর্চনা

সরস্বতী বিদ্যা এবং ললিত কলার দেবী। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী দেবীর পূজা হয়ে থাকে। এ বছর দিনক্ষণ লগ্ন বিবেচনায় তারিখটি পড়ে ২৪ জানুয়ারি। দেশের মতো এই দিনে সনাতনধর্মীরা সংযুক্ত আরব আমিরাতেও এই পূজার আয়োজন করেছিলেন।
তাঁদের উৎসাহ ছিল বিপুল। এরই প্রতিফলন আবুধাবি, দুবাই ও আলআইন নগরে। পূজার দিনে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের পদচারণে এসব স্থানের পূজামণ্ডপ ও এর আশপাশে ছিল দৃষ্টিকাড়া প্রাণচাঞ্চল্য। পূজারিদের আনন্দ একই কারণে এখানকার পরিবেশকে ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে যায়।
সরস্বতী স্বেত শুভ্র বসনা। তার এক হাতে বেদ, অন্য হাতে বীণা। এ জন্য তাকে বীণাপাণিও বলা হয়। সরস্বতী বাগ দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে দেবীর ক্ষেত্র ও আরাধনার মাধ্যমে বেদধ্বনি হতো বলে এই নদী বাগ দেবীর বাসস্থান বলে অভিহিত। নদী হচ্ছে প্রকৃতির একটি শক্তিশালী অনুষঙ্গ। সেই অর্থে তিনি নিসর্গের মতো সংগীতময় এবং সুন্দর ক্ষেত্রের উদ্বোধনকারী। বাগ দেবী অর্থে তিনি ললিত বাণীর মধ্য দিয়ে মানব হৃদয়কে পবিত্র করেন।
এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদ আবুধাবির সাধারণ সম্পাদক ফজলুল কাদের আজিমের সঙ্গে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, বেদ ও পুরাণতন্ত্র মতে, জ্ঞানদেবীর প্রতীক সরস্বতী। দেশের ঘটমান পরিস্থিতিকেও এড়িয়ে যেতে চান না তিনি। এ প্রসঙ্গে এবারকার বাণী অর্চনায় আজিম সবার মধ্যে বিশুদ্ধ চিন্তার উন্মেষ কামনা করেন।
প্রবোধ কুমার সরকার আবুধাবির পূজা আয়োজনের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ‘জয় জয় দেবী’ মন্ত্রের মধ্য দিয়ে পরিচালিত অঞ্জলি পর্বটি ছিল মন কাড়ার মতো।
দুবাই স্কলারসের ও লেভেল পরীক্ষার্থী নদী। তিনি অঞ্জলিকে সবার হাতে ফুল তুলে দেওয়া এবং তা মন্ত্র পাঠের পর দেবীর বেদিতে সমর্পণের মধ্যে নতুন এক ভালো লাগা খুঁজে পান। তিনি বলেন, এ ভালো লাগা অবর্ণনীয়।

এই প্রজন্মের সন্তানেরা পূজাকে দারুণভাবে উপভোগ করেন। অঞ্জলিতে পূজা তালুকদার, পুষ্পিতা, ঊর্মি, মৌমি, দেবব্রত, জ্যোতি, বনশ্রী, জয়শ্রী-মন্ত্র উচ্চারণে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। তাঁরা সতর্ক ছিলেন মন্ত্রের সঠিক সুরে। এ সময় পূজাস্থলে ভিন্ন এক আবহের সৃষ্টি হয়।
বিজয় কৃষ্ণ মণ্ডলের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, দুবাইতে এবার সরস্বতী পূজা হচ্ছে সম্মিলিত উদ্যোগে। আয়োজনের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়েছে রঞ্জন-চন্দন সাহা দম্পতির বাসভবন। পূজায় প্রতিমার দায়িত্ব নেন শিবানী রায়। মূলপর্বে আনুষ্ঠানিক জোগাড় গোছানোর কাজে অবদান রাখেন সুমনা হালদার, চৈতি তালুকদার, ইতি রায় চৌধুরী ও মিতা সাহা।
চন্দনা সাহা বলেন, তাঁর বাসগৃহে বিদ্যাদেবী এসেছেন, এ বড় আনন্দের কথা! প্রচণ্ড উৎসাহে আন্তরিকতা নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। চন্দনা জানান, এ এক পুণ্যকর্ম এবং এর পুরোটাই আজকের শিক্ষার্থী সন্তানদের জন্য।
পূজায় পৌরহিত্য করেন অজয় চক্রবর্তী। পারিবারিকভাবে নারী উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করেছেন অলোক মজুমদার, বিধান রায়, বিশ্বনাথ হালদার, বিধান সাহা, বিনয় রায় চৌধুরী, দীনবন্ধু তালুকদার, শ্যামল বিশ্বাস প্রমুখ। তাঁরা সবাই দুবাইয়ের আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।
ছিল প্রীতিভোজ। এ পর্বে সবজিসমৃদ্ধ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এর ব্যয়ভার বহন করেন অলোক রায়-ব্রততি সরকার দম্পতি। তাঁরা প্রায় একই কণ্ঠে বলেন, তাঁদের সন্তুষ্টির কথা। বাণী অর্চনায় ভূমিকা রাখতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে করেন এই দম্পতি।

ব্রততি বলেন, নতুন প্রজন্মকে দেশ মাটির টান অনুভব করানোর জন্য চাই নিরলস প্রয়াস। পৌষমেলা, বৈশাখ, একুশের অনুষ্ঠান, বাণী অর্চনার মধ্য দিয়ে সেটা সম্ভব বলে মনে করেন এই তরুণী মা। সন্তানদের সরস্বতী পূজায় সম্পৃক্ত করতে পেরে তিনি তাঁর তৃপ্তি প্রকাশ করেন।
প্রধানত শিক্ষার্থীরাই এই পূজার আয়োজন করেন বলে অন্য ধর্মের সহপাঠীরা এর আনন্দ থেকে বাইরে থাকেন না। এটাই সরস্বতী দেবীর বিশেষত্ব।
সুব্রত মজুমদার আরও ভিন্নভাবে বলেন। মনের শুদ্ধতা আর শান্তির জন্য আমরা ছুটছি প্রতিনিয়ত। বাণী অর্চনায় আমরা যেন তেমন কিছুর ঠিকানা খুঁজে পাই।
পূজার অন্যতম সংগঠক পলি পোদ্দার বলেন, দুবাইতে বাঙালি জানাশোনা ছাত্রের কমপক্ষে চারজন ও লেভেল পরীক্ষার্থী। এ কাতারে নদী, সুস্মিতা, দেবব্রত, বনশ্রীর নাম উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, সে কারণে এবারকার বাণী অর্চনা আরও বেশি বর্ণাঢ্য হয়ে উঠেছে।
প্রীতিভোজে পায়েস, বাঁধাকপির ঘন্ট, বেগুনি, ফুলকপির বড়ার আয়োজন ছিল। এসব বড় তৃপ্তির উপাদান। মহিলারাই তৈরি করেছেন—বলেন পলি। পলি জোর দিয়ে বলেন, আগামী বছর বাণী অর্চনার আয়োজন করা হবে তাঁর বাসভবনে। সেই প্রকাশে ছিল একরাশ আনন্দ। তিনি এও বলেন, বাণী অর্চনার আজকের উদ্যোগও নারীদের।

চন্দনা মজুমদার বাণী অর্চনায় চেনা-অচেনা, জানা-অজানা বিশ্ব চরাচরে সবার জন্য সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করেন। ‘তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে’ গানে তিনি সুরের সঙ্গেই তাঁর প্রার্থনা জানান।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদ আবুধাবির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ খোরশেদ। তিনি তাঁর ছাত্রজীবনের বাণী অর্চনার চিত্র তুলে ধরেন। খোরশেদ এই দিনে সবার জন্য শুভ কামনা করেন।
দুবাই, আবুধাবি ও আলআইন—তিন শহরেই বাণী অর্চনা করা হয় বেশ তোড়জোড়ের সঙ্গে। সবারই প্রার্থনা শুভময় হয়ে উঠুক চরাচর।
আমরাও প্রার্থনা করি, বাণী অর্চনার মধ্য দিয়ে সবার অন্তরের কালিমা দূর হোক, বিবেক জাগ্রত হোক, জ্ঞানের উন্মেষ ঘটুক।