প্রবাসে কলেজজীবনে পাঁচ বন্ধুর গল্প
অপু প্রবাসের একটি কলেজে ভর্তি হয়। সেই কলেজে অন্যান্য দেশেরও ছাত্রছাত্রী ছিল। তাদের মধ্যে পাঁচজন বাঙালি ছাত্র ছিল। অপু, স্বপন, সোহাগ, মোল্লা এবং আলী ভাই। আলী ভাই বয়সে বড় ছিল। বয়সে বড় হলেও সবাই তার সঙ্গে বন্ধুর মতো চলাফেরা করত। অপুর তাদের সঙ্গে অনেক ভালো বন্ধুত্ব হয়। কলেজে ক্লাসের ফাঁকে অথবা ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে অনেক আড্ডা দিত। কলেজে তারা একে অপরের সঙ্গে সব ধরনের কথা শেয়ার করত। বন্ধুদের আড্ডা ভালোই জমত বলে কেউ কলেজ ছুটি নিত না। সব বন্ধু মিলে একদিন ছুটি নিত। ছুটির দিন তারা বোলিং খেলত। বোলিং খেলাটা তাদের অনেক পছন্দের খেলা ছিল। আর গরমকালে সৈকতে ঘুরতে যেত, সেখানে ফুটবল খেলত। তারপর সব বন্ধু মিলে রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া করত। পুরো এক দিন অনেক মজা করত।
অপু ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে। বড় ছেলে বলে পিছুটান বেশি ছিল। ক্লাসে অন্য বন্ধুদের চেয়ে পড়াশোনায় এগিয়ে ছিল। অন্য সব বন্ধু তাকে অনেক পছন্দ করত। বন্ধুদের মধ্যমণি ছিল। ছাত্র অবস্থায় একজন মেয়ের প্রেমে জড়িয়ে যায়। সব বন্ধু এই বিষয়টা নিয়ে অনেক দুষ্টুমি করত। সোহাগ তো সব সময় বলত, আমি অপুর প্রেমিকার ছোট বোনকে বিয়ে করব। কলেজ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতি ক্লাসের তিনজনকে বৃত্তি প্রদান করা হবে। যাদের রেজাল্ট এবং কলেজের উপস্থিতি ভালো, তাদের দেওয়া হবে। এর ভেতরে অপুর নামও ছিল। হঠাৎ অপু দেশে ছুটিতে চলে যায় এবং তার প্রেমিকাকে বিয়ে করে। নতুন বিয়ে করেছে, তাই কলেজও ছুটি কাটাতে হয়। এতে তার কলেজের উপস্থিতির পার্সেন্টেজ অনেক কমে যায়। তার রেজাল্ট ভালো হলেও পার্সেন্টিজ কম হওয়ার কারণে সে বৃত্তি পেল না। বন্ধুরা সবাই তাকে জামাই বলে ডাকত। সে পরিবার নিয়ে প্রবাসে বসবাস করছে।
স্বপন নামের বন্ধুটি খুবই সুদর্শন ছিল। কথাবার্তা, চলাফেরা অনেক স্মার্ট ছিল। খুবই শান্ত, ভদ্র ছেলে। তার বাবা নেই, তার ওপর পরিবারের অনেক দায়িত্ব ছিল। বড় বোনের অনেক আগে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। ছোট দুই বোন ছিল। অনেক টাকা খরচ করে ছোট এক বোনকে বিয়ে দেয়। ক্লাসে সব সময় হাসিখুশি থাকত। পড়াশোনায়ও ভালো ছিল। ক্লাসের উপস্থিতিও অনেক ভালো ছিল। তাই সে কলেজের বৃত্তিটা পেয়ে যায়।
বাংলাদেশের পাঁচ লাখ টাকার মতো তাকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। একবার দেশ থেকে প্রবাসে আসার সময় পাসপোর্ট হারিয়ে বিপাকে পড়ে যায়। এয়ারপোর্ট থেকে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। অপু কলেজ থেকে কাগজপত্র নিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। সে নতুন পাসপোর্ট করে এবং কলেজের কাগজপত্র জমা দিয়ে নতুন করে ভিসা নিয়ে প্রবাসে আবার চলে আসে। কয়েক বছর থাকার পর সে বিয়ে করে এবং একেবারের জন্য দেশে চলে যায়।
সোহাগ নামের বন্ধুটি চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। ক্লাসে সব সময় দুষ্টুমি করত। দুষ্টুমি বেশি করত বলে ক্লাসের একজন ইয়াং শিক্ষিকা তাকে পছন্দ করত। সেই ব্যাপারটা নিয়ে বন্ধুরা তার সঙ্গে অনেক মজা করত। তাকে বন্ধুরা বিশ্বপ্রেমিক বলে ডাকত।
খেলাধুলাতে ছিল সব বন্ধুর চেয়ে এগিয়ে। বোলিং খেলাতে সে সব সময় প্রথম হতো। ছুটির দিনে বোলিং খেলার আয়োজন করা হতো এবং প্রাইজের ব্যবস্থা ছিল। যারা প্রথম, দ্বিতীয় হতো, তাদের প্রাইজ দেওয়া হতো। প্রথম পুরস্কারটা তার হাতেই উঠত। মা–বাবার একমাত্র ছেলে। দেশে বিয়ে করে এবং পরিবারসহ প্রবাসে বসবাস করে। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে ভালোই আছে। সে অপুর এখন সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
আলী ভাই বলে তাকে সব বন্ধুরা ডাকত। বয়সে একটু বড় ছিল অন্য বন্ধুদের চেয়ে। কিন্তু সবার সঙ্গে বন্ধুর মতো চলাফেরা করত। সব বন্ধু তার কথা মানত। ছুটির দিনে বন্ধুরা তার বাসায় আড্ডা দিত। রুটি আর গরুর মাংস রান্না করা হতো। তাস খেলার আয়োজন করা হতো, যারা হারবে তারা গরুর মাংস রান্নার করার দায়িত্ব পড়ত। সে খুবই ভালো মনের মানুষ ছিল। সব সময় হাসিখুশি থাকত। দেশে গিয়ে বিয়ে করে। কয়েক বছর প্রবাসে থেকে দেশে একেবারে চলে যায়। বউকে অনেক ভালোবাসত। বন্ধুরা মজা করে তাকে বউপাগল বলে ডাকত। দেশে গিয়ে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করে।
মোল্লা নামের বন্ধুটি সব সময় চুপচাপ থাকত। শান্ত মেজাজের ছেলে ছিল। মুভি দেখা তার শখ ছিল। সব সময় হিন্দি তামিল ছবি দেখত। অপুও তার সঙ্গে থেকে হিন্দি তামিল ছবির ভক্ত হয়ে যায়। অপুকে সে তামিল হিরো বলে ডাকত। দেশে খালাতো বোনের সঙ্গে তার প্রেম হয় এবং তাকে বিয়ে করে। কিন্তু তার মা এই বিয়েটা মেনে নেননি। সে বিদেশে থাকত বলে তার বউকে অনেক অত্যাচার করা হতো। সে লেখাপড়া শেষ করে একটি কোম্পানিতে জব নেয়। বউকে তার কাছে নিয়ে আসার জন্য কাগজপত্র রেডি করে। এমন সময় সে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে যায়। পরীক্ষা -নিরীক্ষা করার পর তার ক্যানসার ধরা পড়ে। এক বছরের মতো প্রবাসে ট্রিটমেন্ট করার পর তাকে দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশে গিয়ে কিছুদিন ট্রিটমেন্ট করানো হয়। দিন দিন তার স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। পরে তাকে ইন্ডিয়াতে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে ট্রিটমেন্ট করতে থাকে। কিছুদিন ট্রিটমেন্ট করার পর তার স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। কিছুদিন পর সে না ফেরার দেশে চলে যায়। তখন তার স্ত্রী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। তার স্ত্রী কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়।
বন্ধুরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। বন্ধুদের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই…