দূর প্রবাসের ঈদ

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর সমগ্র মুসলিম জাহানের আকাশে ঈদের চাঁদ বয়ে আনে হাসি-খুশি আর আনন্দের বার্তা। ধনী-গরিব সব ভেদাভেদ ভুলে সবাই শামিল হন এক কাতারে। ঈদ যেন সবার হৃদয়ে এঁকে দেয় ভালোবাসার বন্ধন!
দূর প্রবাসের আকাশেও প্রতি বছর ঈদের চাঁদ ওঠে। ঈদের আনন্দে মেতে ওঠেন প্রবাসী বাঙালিরাও। তবে এ আনন্দের পেছনে স্বজনদের ছেড়ে আসার যে তীব্র যন্ত্রণা বিরাজ করে তা কেবল প্রবাসীরাই বলতে পারবেন। তবুও থেমে থাকে না ঈদ উৎসব। ভিনদেশের মাটিতেই সকল প্রবাসী এক হয়ে পালন করেন ঈদ। ঈদের আনন্দের মাঝে প্রতিটি প্রবাসীর স্মৃতির অ্যালবামে কেবলই ভেসে ওঠে বাংলাদেশের মানচিত্রের ছবি। একেকটি স্মৃতি যেন একেকটি গল্প।
২০১২ সালে সূর্যোদয়ের দেশে আমার প্রথম আগমন। বাবা-মা, ভাইবোনকে ছেড়ে এত দূরে, এটাই আমার প্রথম যাত্রা। সেবারের রমজান মাসের স্মৃতি আমার আজীবন মনে থাকবে। দেশে পরিবারের সবাইকে ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিনদেশে ও অচেনা পরিবেশে একাকী রমজান কেবল হৃদয় ভাঙা জলই উপহার দিয়েছিল। কাজের সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই ইফতারের সময় বাইরে কাটাতে হতো। সে সময়টা যে কত কষ্টের! ছোটবেলা থেকে রমজান মাসে পরিবারের সবার সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার করেছি। কী যে আনন্দের ছিল সেই সময়টা! আর এখানে আসার পর যখন একা বসে ইফতার করতাম তখন কেন জানি কোনো খাবারই গলা দিয়ে নামতে চাইত না। এমন নিঃসঙ্গ মুহূর্ত যে এর আগে কখনোই পাইনি! ঈদকে সামনে রেখে সবাই মিলে কেনাকাটার যে ধুম, জাপানে আসার পর তাও হারিয়ে গেল!
ওই বছরের ঈদুল ফিতর, জীবনের প্রথম ব্যতিক্রম ঈদ। প্রথম আনন্দহীন কষ্ট। সেবারে চাঁদ রাতে বোনের হাতের মেহেদি লাগানো হয়নি, ঈদের দিন মায়ের হাতের সেমাই খাওয়া হয়নি, হয়নি বাবা আর ভাইয়ের ঈদের নামাজে পড়তে যাওয়া দেখা। বাবা-মার পাঠানো ঈদের পোশাক একলা ঘরে পরে অঝোরে কেঁদেছি। আয়োজন ছিল সবই কিন্তু পাশে ছিল না প্রিয় মুখগুলো। এমনকি পাশে ছিল না নতুন বিবাহিত জীবনে নতুন সঙ্গীটিও। তারও সেদিন ছুটি ছিল না। এভাবেই কেটেছে আমার প্রবাস জীবনের প্রথম ঈদ।
এরপর কেটে গেছে অনেকটা সময়। এরই মাঝে আমার ঘর আলো করে এসেছে দুটি ফুটফুটে সন্তান। বাংলাদেশ কী, সেটা বোঝার মতো বয়স এখনো তাদের হয়নি। আর কদিন পর ঈদ। আমার সন্তানেরা জানে না বাংলাদেশের ঈদ কেমন। তারা জানে না মাতৃভূমির প্রতি টান কেমন। দেশ থেকে নানা-নানু আমার মেয়ের জন্য লাল টুকটুকে জামা আর ছেলের জন্য পাঞ্জাবি পাঠিয়েছেন। ঈদের দিন ওরা এই পোশাকগুলো পরে স্কাইপে নানা-নানু, দাদা-দাদুর সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবে। ওদের কাছে নানা-নানু, দাদা-দাদু মানে চারকোনা ল্যাপটপের ভেতরে সদা হাস্যোজ্জ্বল কিছু মানুষ যারা কেবল দূর থেকেই ভালোবাসে, ছুঁয়ে দিতে পারে না! মাঝে মাঝে আমার অবুঝ সন্তানেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে ল্যাপটপের ওপর। ভাবে এই বুঝি ওদের কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরবে! এই স্পর্শহীন ভালোবাসা যে কী করুণ তা কেবল স্বদেশ ছেড়ে আসা মানুষগুলোই বলতে পারবে।
তারপরও জীবন থেমে থাকে না। ঈদ আসে ঈদ যায়। কাজের টানে, অর্থের টানে যারা দেশ ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি জমান কেবল তারাই জানেন দেশ কী! দেশের প্রতি ভালোবাসা কেমন। শুধু পরিবারের সুখের জন্য বছরের পর বছর তারা কাটিয়ে দেন অজানা দেশে। বাবা-মা, ভাই-বোনের সুন্দর একটা ঈদ উপহার দেওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান। ঈদের ছুটি কী তা বেশির ভাগ খেটে খাওয়া প্রবাসীরাই জানেনই না। তারপরও ঈদের দিন মুখে হাসি, হৃদয়ে কষ্ট লুকিয়ে পরিবারের সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তারা বুঝি প্রিয়জন পাশে থাকা কী, প্রিয় মাতৃভূমি কী! তাই কামনা করি যারা দেশে আছেন তারা যেন কাছের মানুষগুলোকে ভালোবেসে আঁকড়ে রাখেন। তাহলেই আমাদের দূর প্রবাসের ঈদ সার্থক হবে।
সবাইকে সূর্যোদয়ের দেশের সকল প্রবাসীদের পক্ষ থেকে ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা!
ঈদ মোবারক।