আমি চুপচাপ কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে এলাম। এজাজ বেঁচে আছে, এর চেয়ে আনন্দময় সংবাদ আর কী হতে পারে। এই প্রথম অনুভব করলাম, একজন সঙ্গীহারা মানুষের বিষাদগ্রস্ততা কত কঠিন।

এজাজের করোনা হয়েছে শুনে প্রথমে স্তব্ধতায় বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। প্রায়ই রাতে ভীষণ ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম। এরপরে আবারও একদিন রাতে স্বপ্ন দেখলাম আমার স্বামী এজাজ মারা গেছে।

আমি অসহায়ের মতো বোবা কান্নায় গোঙরাচ্ছি, আর বলছি, ‘এখন আমার আর রোদেলার কী হবে? আমাদের কে দেখবে?’
পরে ঘুম ভেঙে আমার মনে হলো, আমি কি স্বার্থপর? একজন মানুষ যার সঙ্গে জীবনের অর্ধেক সময় কাটালাম, তার জন্য কাঁদছি না, কাঁদছি আমার নিজের জন্য?
তবে ঘুম ভাঙতে স্বস্তিও পেলাম এই ভেবে, এটা দুঃস্বপ্ন। তবে এই দুঃস্বপ্ন আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে প্রতিনিয়ত ১৪ দিন। এজাজ ভালো না হওয়া পর্যন্ত। প্রথম কয়েক রাত ভয়ে ঘুমাতাম না। রাতে কিছুক্ষণ পরপর উঠে পাশের রুমে চেক করতাম এজাজ ঠিকমতো শ্বাস নিচ্ছে কি না।

এজাজ একদিন বলল, তুমি ঘুমাও না, প্রবলেমটা কী?
আমি বলি কিছু না, ঘুম আসে না।
সে বিরক্তি নিয়ে বলে ঘটনা কী? ঘুমাও তো, আমি ভালো আছি।
আমি বলি ঘটনা আবার কী? ঘুম না এলে কী করব।
সে আরও বিরক্তি নিয়ে বলে, তাহলে এ দরজা বারবার খোলো কেন? আমি দরজাটা পুরোটা খুলে দিয়ে বলি, ‘দরজা খোলা থাক। রাতে করোনা বের হবে না রুম থেকে।’
এজাজ ঘুমের ঘরে তর্ক করে, ‘করোনার ভয়াবহতা তুমি বুঝতে পারছ না।’ আমি ওর সঙ্গে তর্ক করি না।

এমন ভয়ংকর স্বপ্ন কার কাছে বলব বুঝতেও পারছিলাম না। এজাজকে বলব, সে নিজেই রোগী। বোন শীলার কাছে বলব, সে ছোট মানুষ। দেখা যাবে প্রচণ্ড মন খারাপ করবে। আসলে কিছু কথা থাকে, যা শুধু নিজের ভেতরই রাখতে হয়। আমি সেটি করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলাম। স্পষ্ট ছবি আঁকতে শুরু করলাম এজাজকে ছাড়া আমাদের মা-মেয়ে দুজনের জীবন কতটা দুর্বিষহ হতে যাচ্ছে। প্রথমেই আমার নিজের হাতে সাজানো-গোছানো এ বাড়িটা ছেড়ে ছোট একটা বাড়িতে উঠতে হবে। একা সংসার টানার নিজের ক্লান্তিকর চেহারাও দেখে ফেললাম একঝলক। মনে হচ্ছিল অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি মা-মেয়ে।

যতই এসব ভাবি প্রচণ্ড বিষণ্নতা আমাকে গ্রাস করে ফেলছিল। এ ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন যখন তাড়া করছিল, আমি সারা দিন এজাজকে সুস্থ করার উপায় ভাবছিলাম। রান্না করা আমার পছন্দ না। তারপরও প্রতিদিন শুধু মাছ, মাংস, সবজি রেঁধেছি। পুষ্টিকর খাবারে নাকি শরীর দুর্বল হয় না। যদি ফ্রেশ খাবারে তার একটু রুচি হয়। কিন্তু সে বারোমাসি রোগীর মতো ঘ্যানঘ্যান করতে লাগল ‘খাবার সব ছোবড়ার মতো লাগে। একটুও মজা না।’
‘কী বলো মাত্র রাঁধলাম।’

‘মজা হয় নাই, কিছু না।’ রাগ হলেও মেজাজ ঠান্ডা করে চুপ থাকলাম। এখন মাথা ঠান্ডার সময়, গরম নয়। পরে এসবের জবাব দেওয়া যাবে। করোনা তো সারা জীবন থাকবে না। নিজেকে সান্ত্বনা দিই এই বলে।

default-image

আসলে অনেক চেষ্টা করছি সবকিছুই পজিটিভভাবে নিতে। এ ভয়ংকর অসুখ যখন হয়েছেই, তাকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করাটাই উত্তম। কিন্তু মন একটা আজিব জিনিস, এ বুঝ মানে তো, ক্ষণিকেই অবুঝ হয়ে যায়। মনকে স্থির রাখা এখন ভীষণ কঠিন কাজ। কারণ, মনের অবস্থা যার সঙ্গে শেয়ার করব, সেই তো অসুস্থ। এখন মনে হচ্ছে এই জীবনের ফাঁকে ফাঁকে কত না সময় হেলায় নষ্ট করেছি। কত দিনই দুজনে কথা না বলে কাটিয়েছি। এখন এমন ভয়ংকর রোগে তার সঙ্গে কোনো কথা নেই, এমনকি দেখাও নেই। জীবনে কখনো ভেবেছিলাম এমন দুঃসময় আসবে আমার জীবনে?
মৃত্যু মানেই সবকিছু অর্থহীন, মৃত্যুর দোরগোড়ায় না দাঁড়ালে বোঝা যায় না। এই নতুন উপলব্ধি আমাকে অন্য মানুষে পরিণত করল যেন। আমার চারদিকের বস্তুগত সম্পদ আমাকে প্রতিনিয়ত আঙুল তুলে শাসাতে লাগল। আমি অপরাধীর মতো অসহায় মুখে নিজেকে তিরস্কার করতে লাগলাম। কেন ক্লোজেট ভর্তি এত কাপড় আমার? কেন ড্রেসিং টেবিলে এত প্রসাধনী? ঘরে কত অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। কী প্রচণ্ড ভোগবাদিতায় মেতেছি আমরা এই পৃথিবীর মানুষ।

বাইরের চাকচিক্যময় পৃথিবী, ভেতরে বন্দী মানুষ। সঙ্গে থাকে এক কৌটা প্যারাসিটামল, এক ফ্লাক্স প্রাকৃতিক রেমিডি, এক জগ গরম পানি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে থার্মোমিটার, আর অক্সিমিটার। মানুষের তৈরি আর কোনো ওষুধে এখন কাজ হবে না। শুধু দরকার প্রকৃতির ভালোবাসা। এই যে করোনা নামের ভয়ংকর জীবাণুটা একদম গিয়ে বাসা বাঁধে ফুসফুসে। এরপর তারে আঁকড়ে ধরে খেয়ে ফেলতে শুরু করে। মানুষের দম বন্ধ হয়ে পড়ে। অক্সিজেনের অভাবে সবকিছুই তারপর শেষ হয়ে যায়।

প্রকৃতির মাঝেই অক্সিজেন আছে, বিনা পয়সায় তা পাওয়া যায়, কিন্তু সেটি কত মূল্যবান বোঝা যায়, যখন করোনাভাইরাসটি ঢুকে গেল ভেতরে। এরপর শুরু হয় যুদ্ধ, সেটি প্রথমে শারীরিক যুদ্ধ, কখনো মানসিক। যাদের মনোবল হাওয়াই মিঠার মতো নরম, একটু ছুঁলেই গলে যায়, তারাই হেরে যায়। আর যারা যুদ্ধংদেহী তারা লড়ে, লড়েই যায়। এখন আপনাকেই ঠিক করতে হবে, আপনি কোনটি। চলবে...

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন