জনবিস্ফোরণ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা

প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

‘Human population, Global warming and consumption patterns are inextricably linked in their collective global environment impact,' (Global population and Environment program report). পরিবেশের ওপর প্রভাব সৃষ্টিতে জনসংখ্যা, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও মানবজাতির ভোগবাদিতার ধরন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এই প্রতিফলনের সমষ্টিগত ফলাফল বর্তমান পৃথিবীর বিশ্বপরিবেশ। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে এরাই একসঙ্গে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে জলবায়ুকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে সংকটাপন্ন অবস্থার দিকে। আবহাওয়া মণ্ডলে তাপমাত্রা বেড়ে চলার মূলে কার্বন অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও মিথেন গ্যাসের অধিকতর নিঃসরণ। শেষোক্ত গ্যাস দুটি অবশ্য আবহাওয়া মণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের মতো দীর্ঘস্থায়িত্ব পায় না। গবেষকেরা প্রথমোক্ত গ্যাসটিকেই তাই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই গ্যাস অতিমাত্রায় নিঃসরিত হচ্ছে গ্রিনহাউস গ্যাসের অতি উৎসারণে। যার ৭৭ শতাংশ থেকে ৮২ শতাংশ নিয়মিত তৈরি হচ্ছে শিল্পবিপ্লবের অবদানে গড়ে ওঠা আধুনিক মানুষের শিল্প দ্রব্যের অতি ব্যবহারে আর উন্নয়নশীল বিশ্বের বিপুল জনসংখ্যার বিশাল আতিশয্যে। গবেষকদের তাই মন্তব্য: ‘Global Environment is being destroyed by excessive consumptions in the industrial countries, combined with rapid population growth in developing nations.’ বৈশ্বিক পরিবেশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতিমাত্রায় শিল্প দ্রব্য ব্যবহারে ফলে এবং একই সঙ্গে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোয় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে।

এখানে যে কথাটি শুরুতে পরিষ্কার করা প্রয়োজন সেটি হলো, ভূমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের অস্তিত্ব প্রাকৃতিক নিয়মেই রয়েছে। রয়েছে বলেই পৃথিবীতে যথাযথ তাপমাত্রা বজায় থাকায় প্রাণের অস্তিত্ব বর্তমান। এই গ্যাসের উপস্থিতি না থাকলে বরফ হয়ে থাকত পুরো জগৎ। মানবজাতি ও অন্যান্য প্রাণিকুলের নিশ্বাস প্রশ্বাস, তাদের পরিপাক ক্রিয়ার প্রসেস, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বহুবিধ কর্মধারা থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস স্বাভাবিক কারণেই তৈরি হয়ে চলেছে। মানুষের পরিসংখ্যান যত বড় হবে, এই গ্যাসের পরিমাণও পারিপার্শ্বিকতায় বৃদ্ধি পাবে ততটাই। তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি যে জনবিস্ফোরণের কারণেই এই সম্বন্ধে আজ আর তাই সংশয় নেই কোনো। কিন্তু কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ তখনই দ্রুতগতিতে অপরিমিতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বিপর্যয় ঘনিয়ে তুলেছে, যখন বন কিংবা অরণ্যভূমি ধ্বংস করে জনবিস্ফোরণের কারণে গড়ে তুলতে হয়েছে জনবসতি আর কৃষিক্ষেত্রে। অর্থাৎ বিশাল জনসংখ্যার আকার যতই বিশালতর হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রতিযোগিতা অনমনীয় গতিতে চলেছে বিশ্বব্যাপী। প্রযুক্তি সভ্যতায় ব্যবহার বেড়েছে ফসিল ফুয়েলের। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অগ্রগতিতে ড্রিল করে তোলা হয়েছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ। কৃষিকাজের জন্য মাত্রাতিরিক্ত টেনে তোলা হয়েছে ভূগর্ভস্থ জল। বৈশ্বিক উষ্ণতা ততই ঘনিয়ে তুলেছে মারাত্মক পরিস্থিতি। পরিণতিতে জলবায়ু বিপর্যয়। ঘন ঘন সাইক্লোন, বন্যা, টর্নেডো, অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি। কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা। বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব। বায়োডাইভারসিটির অবলুপ্তিসহ আরও হাজারো দুর্যোগের ঘনঘটা।

প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত


অথচ গত শতাব্দীর মধ্যভাগে যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পেতে শুরু করেন বিজ্ঞানীরা, তখনো বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল অগ্রসরতাকে তারা পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে চাননি। বরং কেউ কেউ ধরেই নিয়েছিলেন, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে সেটা হবে ব্যালান্স অব নেচার। এই ধারণা অধিকাংশ সচেতন মানুষের মনেও বিদ্যমান ছিল যে, ভবিষ্যতে আরও ভালো আর ভারসাম্যময় আবহাওয়ার মধ্যেই বসবাস করতে যাচ্ছে পৃথিবীর মানুষ। কিন্তু বিগত শতাব্দীর শেষভাগে কয়েক গবেষক যখন ক্লাইমেটকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে বিশেষ গুরুত্বসহকারে লক্ষ করতে আরম্ভ করলেন তখনই উদ্‌ঘাটিত হলো এক চরম সত্য, পৃথিবীর পরিবেশে মারাত্মক পরিমাণে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। যার পরিণাম মোটেই কল্যাণকর ও শুভদায়ক ফল বয়ে আনবে না পরিবেশের জন্য।
এই গবেষণা শেষে টাইম ম্যাগাজিনে গবেষক রজার রেভিলের ক্লাইমেট থিওরি প্রকাশিত হলো। সেখানে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের বৃদ্ধি প্রাপ্তি সম্পর্কে মন্তব্য করা হলো: ‘A Violent effect on the Earth's climate' বলে। রজার লিখলেন, ভূপৃষ্ঠের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিক আইস ক্যাপকে বিগলিত করবে সম্পূর্ণ। সমুদ্র লেভেল উঁচু হতে হতে নিমগ্ন করবে পৃথিবীর সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চল। একুশ শতকের শেষভাগে উত্তপ্ত বায়ুর নিঃসরণে বিশ্বজুড়ে রচিত হবে মরুকরণের তীব্রতা। সবশেষে লিখলেন, অতীতের জিওলজিক্যাল ইতিহাসে এমন সর্বগ্রাসী জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতার খবর কখনোই জানা যায়নি। এর পরিণতি সম্পর্কে রজার যে মন্তব্যটি করলেন সেটা ছিল আরও ভয়াবহ আর মানব সভ্যতার প্রতি অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত। তিনি বললেন,‘Perhaps it will bring up the downfall of entire civilization in the ancient world.’
গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব একুশ শতকের পৃথিবীতে আজ সর্বত্রই দৃশ্যমান। ইতিমধ্যেই আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল জুড়ে মরুকরণের চেহারা প্রকাশিত হচ্ছে। আমাজন বেসিন, অস্ট্রেলিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ধরে ঊষরতার তীব্র পরশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলও মুক্ত নয় এই বাস্তবতা থেকে। প্রচণ্ড গ্রীষ্মে উত্তাপের সুতীব্র প্রবাহ এরই মধ্যে অনুভব করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষ। কেননা, কুড়ি শতকের মাঝামাঝি থেকে আজ অবধি পৃথিবীর পরিমণ্ডলে এই গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ১২ গুণ। বর্তমানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়াতেই ভারসাম্যহীন পৃথিবীর ইকোসিস্টেম। কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে মেটিওরোলজিস্টরা দেখিয়েছেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস শতাব্দীর শেষপাদে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করবে আরও আট ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখনকার চেয়ে দশ মিটারেরও বেশি স্ফীত হয়ে উঠবে সাগর মহাসাগরের বুক। অবশ্য এই তথ্যকে সংখ্যাহীন মানুষ এখনই গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করতে আগ্রহী নন। বিশ্বাস করতে অনিচ্ছুক, এমন ভয়াল দুর্যোগ শতাব্দীর শেষ প্রান্ত প্রকৃতপক্ষেই দৃশ্যমান হবে বলে। বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যায়েও গবেষক বিজ্ঞানীদের সতর্ক উচ্চারণকে বেশির ভাগ মানুষ অবিশ্বাস করেছিলেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন, এর সবই হলো বিজ্ঞানীদের কল্পিত অনুমান। আজ অবশ্য অর্থনীতিবিদ থেকে সমাজবিজ্ঞানীরা পর্যন্ত গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবতে বসেছেন। কিন্তু তাপমাত্রা প্রবৃদ্ধির মাত্রাকে এখানেই যাতে থামিয়ে রাখা যায় সে প্রচেষ্টা এখনো প্রবলভাবে অনুপস্থিত পৃথিবীর সবখানেই। ১৯৯৭ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত কিয়োটো চুক্তির বাস্তবতা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এখনো পায়নি। ফসিল ফুয়েলের পরিবর্তে বায়োফুয়েল এনার্জি তৈরিতে গুরুত্ব আরোপের কথা যদিও ভাবছে বিশ্বের গুটিকয়েক দেশ। কিন্তু বায়োফুয়েল এনার্জির ব্যবহার পরিবেশ বিপর্যয়ে সত্যিই প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হবে কিনা, সে সম্বন্ধেও রয়েছে নানা মুনির নানা মত।

প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

তথ্যপ্রমাণ জানিয়ে দিচ্ছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যান্ত্রিক সভ্যতার অগ্রযাত্রায় এগিয়ে থাকায় এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য তারাই দায়ী। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র পাঁচ ভাগের ধারক হয়েও ব্যবহার করে চলেছে সারা বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির এক চতুর্থাংশ। উন্নত দেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রেও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত। সম্প্রতি অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষ্যে জ্বালানি ব্যবহারে ব্যাপক ভূমিকা রেখে যাচ্ছে চীন (বিশাল জনসংখ্যার কারণে)। ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতকেও একই পথ অবলম্বন করতে হবে। কিন্তু অন্যান্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রেও গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বাড়তেই থাকবে ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যার আকারের ওপর নির্ভর করে। কারণ প্রাকৃতিক নিয়মেই জনসংখ্যার আকার যত বড় হবে, ততই তার প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা পেতে থাকবে ঊর্ধ্বগতি। ইলেকট্রিসিটির ব্যবহার যত বাড়বে, যত বেশি তৈরি হবে বাড়িঘর, শিল্পকারখানা, উজাড় হবে সবুজ বনভূমি, কৃষিক্ষেত্রে বাড়াতে হবে উৎপাদনের প্রসার প্রক্রিয়া, পরিবেশ এবং পারিপার্শ্বিকতায় গ্রিনহাউস গ্যাস ততই বাড়িয়ে যাবে তার উষ্ণতার তীব্রতাকে।
২০১১ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদ্‌যাপন করতে গিয়ে জাতিসংঘ বিশেষভাবে তাই গুরুত্ব দিয়েছিল জনবিস্ফোরণের বিষয়টির দিকে। সেখানে বলা হয়েছিল-খুব শীঘ্রই পৃথিবীর জনসংখ্যা সাত শ কোটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং পৃথিবীর সবখানে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি যথাযথ গুরুত্ব সহকারে এখনো অনুসরণ করা হচ্ছে না। সেই বাস্তবতা ২০১৫ সালেও একইভাবে দৃশ্যমান। কারণ বিশ্বে বর্তমান জনসংখ্যা সাত শ ৫০ কোটিতে দাঁড়িয়ে। সত্তরের গোড়ায় এই সংখ্যা ছিল তিন শ ৬৯ কোটির মতো। পাঁচ দশকের কম সময়ে প্রায় চার শ কোটির বিরাট পরিসংখ্যান সংযুক্ত হয়েছে মোট জনসংখ্যার সঙ্গে। অথচ এক শ বছর আগেও এই প্রসঙ্গ কখনো উত্থাপিত হয়নি, পৃথিবীর বুকে কতটা জনসংখ্যা থাকা স্বাভাবিক কিংবা থাকা বাঞ্ছনীয়। কত বড় আকারের জনভার বহনের ক্ষমতা রয়েছে মানব গ্রহ পৃথিবী দেহের। আজ প্রতি মুহূর্তেই পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিকেশ চলছে প্রাকৃতিক সম্পদের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে। পৃথিবীর ওপরে এই বৃহত্তর জনসংখ্যাটি কতখানি চাপ সৃষ্টি করেছে, শুরু হয়েছে তারও সব রকম গাণিতিক হিসাব। জনবিস্ফোরণ প্রকৃতি আর পরিবেশের ওপরে বয়ে আনছে কোন কোন গভীর সংকট, চলছে তারও চুলচেরা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। এমন কথা আজ সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, ক্লাইমেট পরিবর্তনে মানুষ কতখানি মানিয়ে চলতে সক্ষম হবে। কিন্তু এ কথা স্পষ্টতই বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর অসংখ্য অঞ্চলেই বয়ে আনবে মারাত্মক রকমের ক্ষতিসাধন। অঞ্চলবিশেষে সেই ক্ষতির মাত্রায় হয়তো বা তারতম্য হবে সামান্য কিছু।
তখন পরিবেশবিদদের উচ্চারিত এই কথাগুলো মর্মে মর্মে সকলেরই উপলব্ধি হবে, 'If we cannot stabilize climate and we cannot stabilize population, there is not an ecosystem on earth that we can save.’