ক্রিকেটের কালো এক দিন

বাংলাদেশ-ভারত খেলার দৃশ্য
বাংলাদেশ-ভারত খেলার দৃশ্য

১৯ মার্চ (২০১৫) ক্রিকেট ইতিহাসের এক কালো দিবসের নাম। এই দিনটির নাম মনে পড়লেই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। এ রক্তক্ষরণ আরও বাড়ছে কারও কারও মন্তব্যে। আমার এক ফেসবুক বন্ধু রীতা রায় (মিঠু দিদি), তার কিছু উক্তি দিয়ে শুরু করব। তার কিছু উক্তি ফেসবুক থেকে সরাসরি কোড করছি:
‘ফেসবুকে বিচরণ করার সুবাদেই ক্রিকেট নিয়ে একটু উৎসাহিত হয়েছিলাম। বেশি উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে উঠায়। উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েছে যখন জেনেছি কোয়ার্টার ফাইনাল হবে ভারতের সাথে। আমি সবকিছু খুব গভীরে গিয়ে ভাবি। ভারতের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন বেশ আন্তরিকতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কাছে হার মেনেছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর একগুঁয়েমী। মাত্রই বাংলাদেশ সফর করে গেলেন মমতা দিদি। তিস্তার জল বণ্টন নিয়ে আগেকার শীতলতা কেটে বন্ধুত্বের উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছিল। এর মধ্যে কেন বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট খেলা হতে গেল!’
‘বাংলাদেশ পরাজিত হয়েছে তবে পরাজয়টা স্বাভাবিকভাবে হয়নি। ভারত ভাল খেলে জিতলেও এই জয়ে এবং বাংলাদেশের পরাজয়ে মাঠের আম্পায়ারের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের কালিমা লেগে গেছে। খেলা চলাকালে তো এত কিছু বুঝিনি, কোথায় কী কলকাঠি নড়েছে, ভারতীয় খেলোয়াড়দের খেলা ভালো লেগেছে, তাই স্ট্যাটাসে আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে যেমনি স্ট্যাটাস দিয়েছি, বিজয়ী দল হিসেবে।’

‘গোল বেঁধেছে সেখানেই, আম্পায়ারের পক্ষপাতদুষ্টতা নিয়ে। যে দুটি স্ট্যাটাস দিলাম তাতে কারো নজর পড়েনি, সমস্ত নজর গিয়ে পড়েছে বিজয়ী দল হিসেবে ভারতকে অভিনন্দন জানানো স্ট্যাটাসে।’
‘মিথিলা জিজ্ঞেস করেছে, মা কে জিতেছে? আমি বলেছি, ইন্ডিয়া। মিথিলা বলেছে, কেন, ইন্ডিয়া কেন? আমি বলেছি, কারণ ইন্ডিয়া ভাল খেলেছে। জবাবে মিথিলা আবার বলেছে, আচ্ছা, নেক্সটটাইম বাংলাদেশ ভালো খেলবে, মন খারাপ করো না।’
‘আম্পায়ার যে কয়টি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দিয়েছে, ওগুলো যদি সঠিক সিদ্ধান্তও হতো, তবুও ইন্ডিয়ানদের ভাল বোলিং, ব্যাটিং ও ফিল্ডিং মিথ্যে হয়ে যেত না। অবশ্যই ইন্ডিয়ার রান ৩০০ হতো না, আবার হতেও পারতো। রোহিত ৯০ করে আউট হতো, রায়না ৩০ করে আউট হতো, পরের ব্যাটসম্যানরা যদি ৩০০ তুলে ফেলতো! এ তো গেল ইন্ডিয়ার কথা। বাংলাদেশের বোলিং প্রথম ২৬ ওভারে যেমন তুখোড় হয়েছিল, পরের ওভারগুলো তো তার বিপরীত হয়েছে। ব্যাট করতে এসে কেউ জুটি বাঁধতেই পারেনি। রিয়াদের ক্যাচটি যদি আম্পায়ার ভুল না করতো, তাহলেই কি ধরে নেয়া যায় রিয়াদ ১০০ করতো? করতেও পারতো, না-ও করতে পারতো। বাংলাদেশের ফিল্ডিং এত খারাপ হয়েছে যা থেকে ইন্ডিয়া অতিরিক্ত ৩০ পেয়েছে।’
‘বিশেষ করে খুবই খারাপ লেগেছে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক বলে দাবিদার বন্ধুদের উগ্রতা দেখে, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক অথচ আচারে ব্যবহারে বঙ্গবন্ধুর গুণের ছিটেফোঁটাও নেই!’
ওপরের কোড করা সবগুলি উক্তি মিঠুদির। শুধু মিঠুদি কেন, আরও অনেকে এমন উক্তি করেছেন। আমি দিদির কথার রেশ ধরে কিছু কথা বলব।
বন্ধু রীতা দিদি,
আমি ভারত-পাকিস্তানের দালালি পছন্দ করি না। যদি বাইরের দেশে না থাকতাম, বুঝতে পারতাম না, আমাদের কষ্টে ভারতীয়রা কেমন উল্লাস করে। আমি দেখেছি বাংলাদেশিদের চোখের বারিধারা, দেখেছি হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। দেখলাম ওরা মেকি জয়ের উল্লাসে কেমন আনন্দে মাতে! দেখলাম, ওরা খেলার নামে কেমন করে কোটি কোটি দর্শকদের হৃদয় ভাঙে। দেখলাম, ওরা কীভাবে আসিসি নামের অন্তরালে স্পষ্ট দিবালোকে ক্রিকেটকে কী করল। আমি মনে করি এমন জয়ে সমর্থন করা মানে নিজেই নিজের সঙ্গে ভণ্ডামি করা। দিদি, আপনি ভারতের জয়ে সমর্থন করেই ক্ষান্ত হননি, পর্বতসম যার জনপ্রিয়তা, আমার পরম শ্রদ্ধেয় নেতা , বাঙালির মুক্তির কান্ডারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের প্রসঙ্গও টেনেছেন। দিদি, আপনি ভারতের জয় সমর্থন করেন, আমার কিছু বলার নাই, কিন্তু জেনে রাখেন, বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন অপরাধীদের ক্ষমা না করতেন (আমি বলব, বঙ্গবন্ধু এখানে ভুল করেছিলেন) তাহলে সপরিবারে এমন নির্মম পরিণতির শিকার হতেন না।
আমাদের এই দেশে যে শুধু ভারতের শুভাকাঙ্ক্ষী-হিতাকাঙ্ক্ষী আছে তা নয়, এর চেয়ে বেশি আছে পাকিস্তানের শুভাকাঙ্ক্ষী। আমি যেখানে বর্তমানে বাস করছি এখানে এমন কিছু পতঙ্গ আছে, তারা বাংলাদেশ-পাকিস্তান খেলার দিন এমন কথা উচ্চারণ করল যে, বুঝলাম না, সেকি বাংলার না পাকিস্তানের রক্তে তৈরি। বাংলাদেশ-পাকিস্তান খেলার দিন যখন বাংলাদেশ হারে পতঙ্গগুলি হাত তুলে মোনাজাত করে, ‘আল্লাহ তুমি সম্মান বাঁচিয়েছ, নইলে শেখ হাসিনার কথার তোরে থাকা যেত না।’ এসব পতঙ্গ যদি কোনো দেশে থাকে তাহলে কী করে সেই দেশ উন্নতি করবে? কী করে সেই দেশে শান্তি বজায় থাকবে?