ইরানের আশুরা সংস্কৃতি

মহররমের দিনগুলোতে ইয়াযদ শহরে উন্মুক্ত মঞ্চে প্রদর্শিত হয় বিয়োগান্ত কারবালার নাটক
মহররমের দিনগুলোতে ইয়াযদ শহরে উন্মুক্ত মঞ্চে প্রদর্শিত হয় বিয়োগান্ত কারবালার নাটক

ইরানি জনগণ তথা বিশ্ব মুসলিম সংস্কৃতিতে মহররম মাসের গুরুত্ব অত্যন্ত অপরিসীম। বিশেষত ৬১ হিজরি কামারি সনে কারবালার ঐতিহাসিক প্রান্তরে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনাই এর অন্তরালে নিহিত। ১০ মহররম শিয়া মতাবলম্বীদের তৃতীয় ইমাম হজরত হোসেইন (রা) ও তাঁর পরিবার-পরিজন শাহাদাতবরণ করেন। এই বিয়োগান্ত ঘটনা বর্তমান ইরানের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এই প্রভাবগুলো মহররমের ১ তারিখ থেকে শুরু করে ১০ তারিখ পর্যন্ত ইরানের বিভিন্ন মসজিদ, হোসেইনিয়ে (সাধারণত আশুরার সময় মাতমের জন্য ব্যবহৃত হয়, প্রবেশ পথ দেখতে অনেকটা বড় আকারের মসজিদের ইমামের জন্য নির্দিষ্ট অংশের মতো), তাকিয়ে (সবুজ ও কালো কাপড়ে ঘেরা জায়গা, যেখানে শুধুমাত্র মহররমের প্রথম ১০ দিন রোনাজারি করা হয়), সাকা খানে (গম্বুজ আকৃতির মতো দেখতে পানি পানের জন্য সুনির্দিষ্ট জায়গা) ও অব আমবারসহ (পানি সরবরাহের ভূগর্ভস্থ জায়গা) সর্বত্র ফুটে ওঠে। এই ১০ দিন পুরো ইরানের বিভিন্ন অলি-গলি, পথ-ঘাট, বড় বড় বিলবোর্ড ও চৌরাস্তায় শোকের প্রতীক কালো কাপড়ে শোকগাথা দেখা যায়। এ ছাড়া সংগীত, কবিতা, গল্প, নাটক, প্রবাদ-প্রবচন, শপথ, অভিশাপ, প্রার্থনা, চিত্রাঙ্কন, ক্যালিগ্রাফি, বিভিন্ন রীতিনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে আশুরা। এমনকি কারবালা পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে মাজহাব ও রাজনৈতিককেন্দ্রিক অসংখ্য যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছে। তবে সবকিছুর মূলে ছিল শোক প্রকাশ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে হজরত ইমাম হোসেইন (রা) ও তাঁর পরিবারবর্গকে স্মরণ ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।

লোরেস্তান প্রদেশের একটি সিনেযানির দৃশ্য
লোরেস্তান প্রদেশের একটি সিনেযানির দৃশ্য

সাফাভি শাসনামলের (রাজত্বকাল ১৪৯৯-১৭২২ খ্রিষ্টাব্দ) পূর্ব-পর্যন্ত শোক প্রকাশ ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন সীমিত আকারে ছিল। প্রকাশ্যে প্রথমবার দেইলামি বাদশা (দেইলামিকে আলে বুয়ে রাজত্বকালও বলা হয়) মুইজ–উদ–দৌলার নির্দেশে ৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদে ইমাম হোসেইন (রা)–এর জন্য শোক প্রকাশ আনুষ্ঠানিকতা পায়। ইবনে আসিরের লেখনীতে জানা যায়, মুইজ–উদ–দৌলার নির্দেশে ওই বছরের আশুরার দিন জনগণ নিজেদের দোকান-পাট বন্ধ রাখেন, বাজারের যাবতীয় বেচাকেনা ত্যাগ করেন ও শোক প্রকাশে শামিল হন। ওই দিন লোকেরা লম্বা পশমি পোশাক তাঁদের কাঁধে নিক্ষেপ করেন, নারীরা তাঁদের চুলগুলো এলোমেলো করে চেহারা কৃষ্ণকায় করেন ও সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে মাতম ও রোনাজারি করেন।
অপরদিকে এই শোক প্রকাশে ফারসি সাহিত্যের কবি সাহিত্যিকেরাও অংশগ্রহণ করেছেন। সর্বাপেক্ষা প্রাচীন মর্সিয়া লেখক হচ্ছেন ষষ্ঠ শতকের কবি কাওয়ামি রাজি। ৫৭ পঙ্‌ক্তি বিশিষ্ট তাঁর কাসিদার শিরোনাম হচ্ছে—সাইয়্যেদুশ শোহাদার জন্য শোকগাথা ও হজরত ও তাঁর পরিবারবর্গের মুসিবতসমূহ। প্রথম পঙ্‌ক্তিটি ছিল—রুযে দাহোম যে মাহে মহররম বে কারবালা/যোলমি ছারিহ রাফত বার আওলা’দে মোস্তফা [মহররম মাসের ১০ তারিখ ছিল কারবালা/অত্যাচারীর ভয়াল ছোবলে ক্ষতবিক্ষত আওলাদে মোস্তফা]।
সাফাভি রাজত্বকালে শিয়া মতাবলম্বীগণ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। ফলে শোক প্রকাশের বিচিত্রতা ও এর সর্বজনীনতা পূর্ববর্তী যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক পরিলক্ষিত হয়।
নিচে ইরানে পালিত কিছু রীতিনীতি সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হলো।
সিনেযানি বা বুক চাপড়ানো: সিনেযানি বা বুক চাপড়ানো সমগ্র ইরানে শোক প্রকাশের অন্যতম একটি রীতি। গিলান ও দেইলামেস্তানের ইতিহাস গ্রন্থে সিনে যানিকে দেইলামিদের সময়কালের প্রথা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নাখল গারদানি মহররমের অন্যতম সংস্কৃতি
নাখল গারদানি মহররমের অন্যতম সংস্কৃতি


ইবনে বতুতা আতাবেকের পুত্রের মজলিশে শোক-মাতমের বর্ণনা করেছেন এভাবে: উপস্থিত জনতা দুই অংশে বিভক্ত ছিল, একটি অংশ অডিটোরিয়ামের উপরিভাগে ও অপর অংশ নিচেরভাগে ছিল, প্রত্যেকেই হাত দ্বারা বুকের ওপরে প্রচণ্ড আঘাত করতেন এবং বলতেন ‘খুন্দেগারে মা’ অর্থাৎ ‘আমাদের জনাব’।
এই শোক মাতমটি মহররমের ১০ তারিখে অনুষ্ঠিত হতো। তবে এখন মহররমের ১ তারিখ থেকে শুরু হয়ে ১০ তারিখ পর্যন্ত চলে। সিনেযানি সুবিন্যস্ত ও সুরেলা আকারে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা সাফাভি আমলের কোনো কোনো সফরনামায় তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে Pietro Della Valle, Silva Figueroa, Fedot Afanas Yevic Katof, Engelbert Kaemfer সফরনামা বা ভ্রমণকাহিনি উল্লেখযোগ্য। তবে এগুলোর মধ্যে কাম্পফের ভ্রমণকাহিনিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সিনেযানির বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে সিনেযানি অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে এবং মাদ্দাহ কর্তৃক (কারবালা ও হজরত ইমাম হোসেইন (রা)–এর শাহাদাতবরণ কাহিনি যিনি করুণ সুরে বর্ণনা করেন, তাকে মাদ্দাহ বা নোওহে খান বলা হয়, তবে পেশাদার প্রশংসা কীর্তনকারীও বলা হয়) নোওহে খানি (বিলাপ, আহাজারি, রোনাজারি, কান্নাকাটি) সিনেযানির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিচে করুন সুরে গাওয়া একটি নোওহের অংশবিশেষ তুলে ধরছি।
ওহে প্রিয় হোসেইন মুণ্ডবিহীন! হে মোহাম্মদ!/তবে কি তাঁর জননী নেই! হে মোহাম্মদ!/এই রজনী শোক রজনী ছিল/শোকের চাদরে কারবালা ঢাকা ছিল/এই রাতে হজরতে ফাতেমা/গ্রাস করেছে তাঁকে ভয় আর মানসিক অস্থিরতা/ছুটে আসছে কারবালার প্রান্তরে/কি হয়েছে হোসেইন আমার অন্তর!/আমার দু’চোখের আলোর কি হলো!/এই রজনী শোক রজনী ছিল!
মাদ্দাহ প্রতিটি ছত্র বলার পর উপস্থিত জনতা সমস্বরে বলে ওঠেন—হোসেইনাম ভোই হোসেইনাম (হোসেইন আমার হোসেইন) অথবা আফসোসমূলক শব্দ—ভো ভেইলা ভো ভেইলা বলে চিৎকার করে নোওহে খান শোকসংগীত গায়ককে উৎসাহিত করেন এবং নিজেরা বুক চাপড়াতে থাকেন। বর্তমান ইরানে এটি সবচেয়ে প্রচলিত শোক প্রকাশের প্রথা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আলাম বা জারিদেহ বহন
আলাম বা জারিদেহ বহন


নাখল গারদানি: আশুরার শোক পালনের পালনের অন্যতম একটি রীতিনীতি হচ্ছে নাখল গারদানি। নাখল হচ্ছে বিশাল আকারের একটি শবাধার বা কফিন। এটি প্রকৃতপক্ষে হজরত ইমাম হোসেইন (রা)–এর কফিনের একটি প্রতীকী প্রতিকৃতি। এটি মূলত তাসুআ (মহররমের ৯ম দিন) ও আশুরার (১০ মহররম) দিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন কাঁধে বহন করেন। এটি ইরানি জনগণের একটি প্রাচীন সংস্কৃতির অংশ। সাফাভি আমলে ইউরোপীয়রা ইরান ভ্রমণে আসেন এবং নিজেদের ভ্রমণকাহিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। নাখল বহনের আগে হোসাইনিয়া বা মসজিদ বা তাকিয়েতে এটিকে সুসজ্জিত ও অযিন বানদি বা বর্ণিল রূপ প্রদান করা হয়। যিনি বা যারা এই কাজটি করে থাকেন তাদের নাখল বান্দ, নাখল পেইভান্দ, নাখল অরা, বাবা, বাবায়ে নাখল বলা হয়। নাখল সজ্জিত করার উপকরণগুলো হলো কালো ও সবুজ কাপড়, যা দিয়ে পুরো নাখলকে ঢেকে দেওয়া হয়। বিভিন্ন ফুলের শাখা-প্রশাখা ও শামশাদ (Boxwood বৃক্ষ, কারণ এই বৃক্ষ সর্বদা সবুজ) বৃক্ষের গুল্ম, কিছু কিছু যুদ্ধের সমরাস্ত্র, যেমন তলোয়ার, খঞ্জর, চাকু, কিছু ফানুস ও হ্যারিকেন এবং শিয়া মাযহাবের ইমামদের কিছু উত্তম প্রতিমূর্তি। কখনো কখনো নাখলকে বদনজর থেকে রক্ষার জন্য চল্লিশটি বিসমিল্লাহসহ পবিত্র কোরআনের সুরা বেঁধে দেওয়া হয়।
আশুরা ও তাসুআ–এর দিন নাখলকে সবাই মিলে চার প্রান্ত ধরে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বহন করেন। নাখল সংরক্ষণ, সজ্জিতকরণ, বহন করা এগুলো বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন জনের জন্য সুনির্দিষ্ট। সাধারণত বংশ পরম্পরায় একটি পরিবার এটির সংরক্ষণ করেন। যেসব পরিবার এগুলোর উত্তরাধিকার থাকেন, তারা নাখলকে তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী সুসজ্জিত করেন।
আলাম বা জারিদেহ: শোকাবহ আশুরার শোকপালনের আর একটি মাধ্যম হচ্ছে আলাম বা জারিদেহ সজ্জিতকরণ ও বহন। এটি সাধারণত কাঠের তৈরি পাঁচ ছয় মিটার, কখনো কখনো ১০ মিটার পর্যন্ত উচ্চতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। এতে ১১টি প্রতীকী ফলক বা বর্শা থাকে। মাঝখানের ফলকটি সর্বাপেক্ষা উঁচু হয়ে থাকে। প্রতিটি ফলকের মাথায় ব্রোঞ্জের তৈরি পাঁচটি আঙুল বা পাঞ্জা থাকে। ফলকগুলোর মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় ধাতুর তৈরি কবুতর, ময়ূর, টিউলিপ, মিনার হলঘরসহ বিভিন্ন প্রকার বস্তুর ছবির ভাস্কর্য জুড়ে দেওয়া হয়। পুরো কাঠটিকে রংবেরঙের দামি কাপড় দিয়ে মোড়ানো হয়। আলাম ধাতু দিয়ে তৈরি হয়, এটির ওজন সর্বনিম্ন ৫০ কেজি হয়ে থাকে।
তাসুআ ও আশুরার দিন যারা আলাম বহন করেন তারা চামড়ার তৈরি একটি খাপ কোমরে বেঁধে নেন। এরপর একজন শক্ত সামর্থ্য যুবক আলামের মাঝখানের মূল দণ্ডটি কোমরের চামড়ার খাপে গুঁজে ১০-১২ কদম বহন করেন, অতঃপর আরেকজন বহন করেন। এটি কখনো কখনো এত বেশি ওজনের হয় যে বহনকারীর আশপাশে সবাই সতর্ক অবস্থান নেন, যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। এভাবে একটি ময়দানে বেশ কয়েকবার চক্কর দেওয়া হয়। সাফাভি আমল থেকে এইভাবে শোক প্রকাশ রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অনেক পরিবার বংশ পরম্পরায় একটি আলামের অধিকারী হয়ে থাকে যা আলামের গাত্রে ঝোলানো ছবি দেখে সহজেই অনুধাবন করা যায়।
এ ছাড়া মহররমের প্রথম ১০ দিন পাড়া-মহল্লা, অলি-গলি, মসজিদ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কালো কাপড়ে ঘেরা বেষ্টনী তৈরি করে চা, কফি, শরবত, অশ বা স্যুপ, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন, খোরমা বিনা মূল্যে নজরানা হিসেবে লোকদের খাওয়ানো হয়। তবে মহররমের সময় দেওয়া আমাদের দেশের ফিরনির মতো শোলে যারদ সবচেয়ে মজাদার ও সুস্বাদু মিষ্টান্ন। এ ছাড়া তাসুআ ও আশুরার দিনে বিত্তবান ব্যক্তি বা বড় বড় কোম্পানির মালিকেরা ভেড়া বা উট জবাই করে আমাদের দেশের খিচুড়ি বা তেহারির মতো খোরেশত কিমে, অব গোশত বা কোরমে সাবযি বিতরণ করেন।
ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এই খাবার বা আমাদের দেশের ভাষায় তবারক গ্রহণ করাকে সওয়াব মনে করে থাকেন। এভাবেই মহররম বা আশুরা সংস্কৃতি ইরানের জনগণের ধর্মীয় আবেগ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে পিএইচডি গবেষক, তারবিয়্যাত মোদাররেস বিশ্ববিদ্যালয়, তেহরান, ইরান। ইমেইল: <[email protected]>