প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

আমার বাবাটা বড্ড বেশি সেকেলে

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে বাবার সেই পুরোনো হাতঘড়ি
আর বাবা, দুজনকেই এক সাথে বৃদ্ধ হতে দেখলাম।
ঘড়িটার সাথে বাবার কেমন যেন এক অদৃশ্য আত্মিক টান!
বুঝতে পারি না। দুই একবার যদিও বা বন্ধ হয় ওই পুরোনো যন্ত্রটা, বাবা দুদিন বাদে আবারও ঠিক করিয়ে আনেন।
আমার নতুন ব্র্যান্ডের ঘড়িগুলো দেখেও বাবা কিচ্ছু শেখে না। বাবাটা বড্ড বেশি সেকেলে!

বাবার সেই মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটা? সেও বাবার অতি পুরোনো বন্ধু! আজও বাবার দুই কান ভর করে দিব্যি জগৎ সংসার দেখছে। আরে কত ফ্রেমের চশমাইতো এল গেল, বাবার চোখে কী কিছুই পড়ল না!

আমার আবার এসব একঘেয়ে জিনিস মোটেও ভালো লাগে না! আমার চশমাতো দুদিন পরপরই রূপ বদলায়।

জন্মদিনে একটা আইফোন চেয়েছিলাম। মায়ের সেকি কান্না! বাবার নাকি অত টাকা নেই। আমিও হাল ছাড়িনি। একমাত্র ছেলে বলে কথা। দুদিনের আমরণ অনশন! পেয়ে গেলাম আইফোন! আমি কী বাবার মতো স্কচটেপ পেঁচিয়ে পুরোনো মোবাইল ব্যবহার করব? আমিতো আর বাবার মতো সেকেলে নই!

বাবার পাঞ্জাবি, জামা, জুতো সব পুরোনো ধাঁচের
বড় বড় ফ্যাশন হাউসের ব্র্যান্ডের পোশাক ছাড়া আমার আবার চলে না। বাবার ঘরটাও সেই পুরোনো যুগের। ভাঙাচোরা আসবাব আর ওই নড়বড়ে খাট। কী করে যে বাবা ঘুমায়? এত কৃপণ হলে চলে? নতুন একখানা খাট, কতই বা দাম! আমার ঘরটাতো যেন অটবির শো রুম। যাক সে কথা, পুরোনো মানুষের সেকেলে রুচি!

আজ জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের উপার্জিত অর্থ হাতে পেলাম। মনটা বেশ ফুরফুরে! বাবার জন্য একটা দামি ঘড়ি আর আড়ংয়ের পাঞ্জাবি কিনলাম। ছেলেটার আবার বায়নার শেষ নেই! ছেলের আবদার পূরণে বউয়ের লিস্টটাও ছোট করলাম! এত দিন বাবার হোটেলে বসে বসে খেয়েছি। খরচটা টের পাইনি। ছেলেটার জন্য অনেক কিছু কিনতে হলো। ওর আবার সব দামি ব্র্যান্ডের জিনিস না হলে পোষায় না। আজ নিজের জন্য কেন জানি কিছু কিনতে ইচ্ছে হলো না। পরনের শার্টটা হেসেখেলে এক বছর পার করতে পারব। জুতো জোড়া? গেল বছরইতো কিনলাম! আর হাতঘড়ি? নষ্ট না হলে আরও পাঁচ-সাত বছর। নতুন ব্যাটারি লাগালে দিব্যি চলবে! তার চেয়ে বরং ছেলেটার জন্য আরও কিছু কিনি। আমার সবটুকু দিয়ে ছেলেটার হাসি আজ কিনতে ইচ্ছে হচ্ছে। আচ্ছা বাবাও কী ঠিক আমার মতো?

বুকের ভেতরে কোথায় গিয়ে যেন লাগল! দুমড়ে মুচড়ে গেল কিছু অনুভূতি! আত্মগ্লানি ততক্ষণে তাড়া করে ফিরছে। আমিও বাবার মতো সেকেলে বাবা হয়ে যাচ্ছি নাতো?

আকাশ ভেঙে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি! আমার চশমাটা ঘোলা হয়ে আসছে। আমি ভিজে যাচ্ছি। ভিজে যাচ্ছে আমার সমস্ত অস্তিত্ব! আমি অসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ মাথার ওপরে অতি পুরোনো কালো রঙের ছাতাটা আমায় আদুরে গলায় ডেকে বলল, ‘খোকা ভিজে যাচ্ছিসতো!’

আমার সেকেলে বাবা পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে! আজ অনেক দিন পর বাবার ভাঙা ডাটওয়ালা পুরোনো ছাতাটার নিচে নির্ভয়ে আশ্রয় নিলাম। ছোটবেলার মতো বাবার আঙুল চেপে ধরলাম! বাবা চমকে উঠল! বাবার চোখের দিকে তাকানোর সাহস ততক্ষণে হারিয়ে ফেলেছি। বাবাটা কেন যেন আমায় জড়িয়ে ধরল। হয়তো বাবা আমার বুকের ভেতরের ভাঙনের শব্দটা শুনে ফেলেছে? বাবারা বোধ হয় এমনই হয়! আমার সেকেলে বাবার বুকে মাথা রেখে আজ আমি অঝোরে কাঁদলাম বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে!
...

শাহীন আক্তার স্বাতী: কানাগাওয়া কেন, জাপান।