সমস্যা না থাকলে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনাকে না বলেছি আমাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।
আমি তো আপনার বাসার সামনে দাঁড়াইনি। আমি রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়েছিলাম।
শোনেন, এটা বাংলা সিনেমা না যে বাসার সামনে দাঁড়ালেই প্রেম হয়ে যাবে। যান, আপনি আমার বাসার সামনে বা রাস্তার ওপর পাশ—কোথাও দাঁড়াবেন না।
ঠিক আছে। আর দাঁড়াব না।
ধন্যবাদ। এখন সোজা বাসায় চলে যান।
যাচ্ছি। শোনেন, খুব চা পান করতে ইচ্ছে হচ্ছে। এক কাপ চা হবে?
ভাইজান, আপনে চা খাইবেন? বসেন আমাগো আফায় খুউব সুন্দর চা বানায়।
ময়না খুবই উৎসাহ নিয়ে বলল।
ময়না, তোকে চালাকি করতে হবে না। যা উনাকে গেটের বাইরে দিয়ে আয়।
আফা, ভাইজানরে এক কাপ চা দেই। অনেকক্ষণ রাস্তায় খাড়াইয়া আছিল। দেখেন, মুখটা কেমন হুকাইয়া আছে।
ময়না, তোকে আমি কী বলেছি?
ভাইজান, চলেন। ইতারা আমনেরে চা দিত না।
ময়নার সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নামছি। এ সময় ময়না বলে উঠল,
ভাইজান, মনে কষ্ট নিয়েন না। আমাগো আফার মাথায় বুদ্ধি একটু কম আছে।
তা–ই নাকি? কী করে বুঝলেন?
তা না হইলে আমনের মতো ভালা পোলারে এইভাবে কেউ অবহেলা করে। আমি হইলে তো আপনারে মাথায় তুইল্লা রাখতাম।
আপনার কি বুদ্ধি অনেক বেশি?

জি ভাইজান, আমার অনেক বুদ্ধি। আল্লাহ যেমন রূপ দিছে, তেমন বুদ্ধিও দিছে। মা কয় আমার যা বুদ্ধি, আমি নাকি দ্যাশ চালাইতে পারমু। ভাইজান, আমনের কি মনে হয়, পারমু?
অবশ্যই পারবেন। আপনি কি আসলেই দেশ চালাতে চান?
অবশ্যই চাই। গরিবের শখ বইলা কথা।
ময়না আপা, যদি কিছু মনে না করেন, আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
অবশ্যই পারেন। ভাইজান, জিগান কী জিগাইবেন।
আপনার আপা কি কারও সাথে প্রেমট্রেম করে?
না ভাইজান। আমি এ বাড়িতে হেই ছোট্টবেলা থুন আছি। কোনো দিন এমুন কিছু হুনি নাই।
তাহলে আপনার আপা আমাকে এত অবহেলা করে কেন?
ভাইজান, আমার ধারণা, হে পেম কী, হেইটাই বোঝে না। হারাটা দিন তো বই লইয়াই পইড়া থাহে।
পরের দিন একইভাবে ময়না আমাকে রাস্তা থেকে আবার ছাদে ডেকে নিয়ে গেল। আজও ইতি দোলনায় বসে আছে। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সরাসরি জিজ্ঞাসা করল,
আমি কি গতকাল আপনাকে বলেছিলাম আমার বাসার নিচে, সামনে বা রাস্তার ওপারে কোথাও দাঁড়িয়ে থাকবেন না?
জি বলেছিলেন।
তাহলে আপনি আজও রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?
আপনি বলেছিলেন রাস্তায় না দাঁড়াতে, আমি দাঁড়াইনি। আমি শুধু ফুটপাতে বসেছিলাম।
আপনি কি আমার সাথে ফান করছেন? করবেন না। আমি ফান পছন্দ করি না।
সরি।

শোনেন, এটা ভদ্রলোকের এলাকা। আপনি যদি প্রতিদিন এভাবে আমাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে কি আমাদের মানসম্মান থাকবে?
দেখুন, আমি তো আপনার বাসার সামনে আসতে চাই না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আপনাকে না দেখে থাকা অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে আসতে হয়।
কিন্তু আমাকে দেখার কী দরকার?
প্রশ্নটা বোকার মতো হয়ে গেল না? আপনি জানেন আমি আপনাকে ভালোবাসি।
আচ্ছা, সত্যি কি আপনি আমাকে ভালোবাসেন?
অবশ্যই। নিজের চেয়েও বেশি।
প্রমাণ দিতে পারবেন?
অবশ্যই। আপনি যেকোনো পরীক্ষা নিয়ে দেখতে পারেন। যদি পরীক্ষায় ফেল করি, তাহলে আপনার সামনে আর আসব না। বলুন কী করতে হবে?
কথা দিচ্ছেন, আমি যা–ই বলব, তা–ই করে দেখাবেন?
অবশ্যই। এটা প্রেমিকের জবান।
ঠিক আছে, তাহলে আজকের পর আমাকে আর ফলো করবেন না। আমার বাসার আশপাশে আসবেন না। শুধু এখানে না, আমি যেন বাংলাদেশের কোনো প্রান্তে আমার আশপাশে আপনাকে না দেখি।
আপনাকে না দেখে থাকা সম্ভব না। এর পরিবর্তে আপনি যা চান, আমি করব। এমনকি চাইলে আমার জানটা বের করে আপনার সামনে রেখে দেব।
না, আপনার জান আমার লাগবে না। ওটা আপনার কাছেই থাক। যদি সত্যি আপনি আমাকে ভালোবাসেন, তা হলে আমি যা বলেছি, সেটা করবেন।
এক কাজ করুন, আমার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে আনুন।
চা দিলে আমার চাওয়াটা মেনে নেবেন।
সেটা এখন বলতে পারছি না। আগে চা আনুন। চা খেতে খেতে একটু ভাবি, তারপর। শোনেন, চা কিন্তু আপনাকেই বানাতে হবে।
ময়না, যা চুলায় পানি গরম দে। আমি আসছি।
ময়না আনন্দের সঙ্গে দৌড় দিল।

আমি চা নিয়ে আসছি। চা শেষ হওয়ামাত্র আপনি চলে যাবেন।
কথাটি ঝাঁজের সঙ্গে বলেই ইতি ছাদ থেকে নিচে চলে গেল।
মিনিট দশেক পরে ময়না ট্রেতে করে এক কাপ চা নিয়ে এল।
পেছন পেছন ইতিও এল। ইতি আমার দিকে না তাকিয়েই বলল,
নিন, তাড়াতাড়ি চা–টা খেয়ে ফেলুন। তারপর বিদেয় হন।
আফা, এটা কী বললেন? ভাইজান গরম চা তাড়াতাড়ি কেমতে খাইব? মুখ তো পুইড়া যাইব। হেরে একটু মজা কইরা খাইতে দেন।
ময়না, তুই চুপ করবি!
আমি চা–টা পিরিচে ঢেলে এক চুমুকে খেয়ে ফেললাম। বুঝলাম জিহ্বা অলরেডি পুড়ে গেছে। ময়না অবাক হয়ে বলল,
ভাইজান, এটা আমনে কী করলেন? আমনে তো সব পুড়াই ফেললেন।
ময়না, তুই চুপ কর। তা আপনার চা খাওয়া শেষ? এখন বলেন, আমি যা বলেছি, তাতে রাজি কি না।
সম্ভবত এ মেয়ে জীবনে মধু খায়নি। যে কারণে এত ঝাঁজালোভাবে কথা বলে। পরিবেশটা হালকা করার জন্য বললাম,
চায়ের জন্য ধন্যবাদ। আপনি আসলেই সুন্দর চা বানান। আপনি চাইলেই একটা চায়ের দোকান দিতে পারেন। আপনি যদি রাজি থাকেন, তাহলে এই ব্যবসায় আমি আপনার পার্টনার হতে পারি।
ভাইজান, আমারে নিবেন না।

অবশ্যই নেব। আপনি হবেন দোকানের ক্যাশিয়ার। টাকা গুনতে পারবেন তো?
ভাইজান, কী যে বলেন। আমি ফাইভ পাস দিছি।
মাশা আল্লাহ। এতেই চলবে। তা ইতি ম্যাডাম, আপনি কি আমার সাথে চায়ের দোকান দেবেন?
শোনেন, আপনি মনে হয় খেয়াল করেছেন, আমি ফালতু কথা পছন্দ করি না। তাই ফালতু কথা রেখে এবার আসল কথায় আসেন। আপনি কি আমার কথায় রাজি?
আপনি ভালোবেসে আমার কাছে একটা জিনিস চেয়েছেন। আমি তো না বলতে পারব না। আমি রাজি। তবে একটা শর্ত আছে।
কী শর্ত?
আমি ওই দোলনায় আপনার পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকব। তারপর আপনার সাথে একটা ছবি তুলব।
আমার পাশে বসতে হবে কেন?
ওটা আপনি বুঝবেন না। ওটা বোঝার মতো রোমান্টিক মেয়ে আপনি নন।
আমি গিয়ে দোলনায় ইতির পাশে বসলাম। ময়না আপা, আমার ফোনে আমাদের একটা ছবি তুলে দিলেন। ছবি তোলার পর আমি বাঁ পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ আমার ভালোবাসার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,
ভালো থাকবেন।
কথাটি বলেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম। ময়না আপা আমার পিছু পিছু এলেন। গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় ময়না আপা আমাকে প্রশ্ন করলেন,
ভাইজান কি হাছাই আর আইবেন না?
না আসব না।

পকেট থেকে একটু কাগজ বের করে আমার ফোন নম্বরটা লিখলাম। তারপর ফোন নম্বরের নিচে লিখলাম,
‘আমৃত্যু তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকব। যদি কখনো ইচ্ছে হয় আর নিজেকে একা লাগে, তো কল দিয়ো। দেখবে, আমি উড়ে চলে আসব।’
কাগজটা ময়না আপাকে দিয়ে বললাম,
ময়না আপা, এখানে আমার ফোন নম্বর লেখা আছে। কাগজটা আপনার আপাকে দিয়েন। আমি জানি উনি এটা ফেলে দেবেন। তবু দিয়েন।
বলেই গেট দিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেলাম। অনুভব করলাম, বুকের মধ্যে জানি কেমন কেমন করছে।
বি. দ্র.
যে কাউকে আপনার ভালো লাগতেই পারে। যে কাউকে আপনি ভালোবাসতেই পারেন। যে কাউকে আপনি ভালোবাসি বলতেই পারেন। এটা আপনার অধিকার। তবে মানুষটি যদি আপনার ভালোবাসায় সাড়া না দেন, তবে তাকে বিরক্ত করবেন না। কারণ, আপনার যেমন ভালোবাসার অধিকার আছে, তেমনি ওই মানুষেরও, আপনাকে ভালো না বাসার অধিকার আছে।


*লেখক: ইমদাদ বাবু, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র। [email protected]